সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই সুখী! আপনিই কি কেবল অসুখী?
একসময় মানুষ গল্প জমাত ডায়েরিতে, আর সে ডায়েরি হয়তো কখনোই অন্য কারও নাগালে আসত না। শুধুমাত্র পেশাদার লেখকরাই জনসাধারণের জন্য তাদের লেখা প্রকাশ করতেন। কিন্তু এখন বদলে গেছে পুরো প্রেক্ষাপট। এখন আমাদের স্মৃতির ডায়েরিটা হয়ে গেছে সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইন, আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত চলে যাচ্ছে শত শত ভার্চুয়াল নাগরিকের কাছে। নিজের প্রতিটা মুহূর্ত যেমন সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করতে আমরা উচ্ছ্বসিত থাকি, ঠিক তেমনি নজর রাখি অন্যরা তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় কীভাবে নিজেদের জানান দিচ্ছে। পার্থক্য শুধু একটাই— আগে ডায়েরির পাতায় মানুষ নিজের সত্যিটা লিখত, আর সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইনে দেখায় নিজের সবচেয়ে সুন্দর দিকটা।
এখন ফেসবুকে ঢুকলেই মনে হয় পৃথিবীর সবাই খুব সুখে আছে। কেউ কক্সবাজারে সূর্যাস্ত দেখছে, কেউ নতুন গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, কেউ ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে ক্যাপশন লিখছে—“Alhamdulillah for everything.” চারদিকে যেন আনন্দের এক ডিজিটাল উৎসব। স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ নিজের জীবনটাই কেমন যেন পানসে মনে হতে শুরু করে। আমরা ভুলে যাই এগুলোর সবই "ডিজিটাল" আনন্দ, মানুষের লোকদেখানো কালচার।
আরও পড়ুন: নিষ্পাপ মুখগুলোর নীরব আর্তনাদ ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
কিন্তু নিজের অজান্তেই নিজেকে প্রশ্ন করি —“সবাই এত ভালো আছে, শুধু আমি কেন এত অগোছালো?”
এই প্রশ্নটাই আসলে আজকের প্রজন্মের সবচেয়ে নীরব কষ্টগুলোর একটি।
আরও পড়ুন: নাম পরিবর্তনের কবলে দেশ
সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন দুনিয়া আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, এখন মানুষ নিজের বাস্তবতার চেয়ে অনলাইনে নিজেকে কেমন দেখাচ্ছে, সেটি নিয়েই বেশি চিন্তা করে। আমরা এখন মুহূর্ত উপভোগ করার আগে সেটি পোস্ট করার কথা ভাবি। কোথাও ঘুরতে গেলে প্রকৃতির চেয়ে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খাবারের স্বাদের আগে দরকার পড়ে একটি “পারফেক্ট ছবি”। বাস্তবের সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করার চেয়ে আমাদের মনোযোগ বেশি থাকে ক্যামেরার কিছু ভালো ছবির প্রতি।
কিন্তু এই ছবিগুলোর বাইরেও তো একটি জীবন আছে, সেটি হলো বাস্তব জীবন। সেই জীবনে আছে ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ, সম্পর্কের দূরত্ব, না-বলা ভয়—যেগুলো খুব কম মানুষই প্রকাশ করে। কারণ এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সবাই সুখী দেখাতে চায়। কেউ নিজের ভেঙে যাওয়া দিকগুলো প্রকাশ করতে চায় না।
এর ফলে একজন মানুষ অন্যজনের জীবনের “হাইলাইট রিল” দেখে নিজের জীবনের “পর্দার পেছনের গল্প”-এর সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাত জেগে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছে, অথচ ফেসবুকে ঢুকে দেখে তার বন্ধুরা কেউ বিদেশে, কেউ সম্পর্কে, কেউ নতুন সাফল্যে ব্যস্ত। একজন চাকরিপ্রার্থী প্রতিদিন অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুদ্ধ করছে, অথচ টাইমলাইনে চারদিকে শুধু “সাকসেস স্টোরি”। তখন ধীরে ধীরে নিজের জীবনটাকেই ব্যর্থ মনে হতে থাকে।
অথচ আমরা ভুলে যাই, মানুষ সাধারণত তার কান্নার ছবি পোস্ট করে না। কেউ তার একাকীত্ব আপলোড দেয় না। রাতভর মানসিক চাপ নিয়ে কাটানো মানুষটিও সকালে হাসিমুখে একটি সেলফি পোস্ট করতে পারে।
এটাই সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় বিভ্রম—এখানে সবাইকে সম্পূর্ণ সুখী মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনো অদৃশ্য যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
জার্মানির বোহুম ইউনিভার্সিটির গবেষক ফিলিপ ওজিমেক (Phillip Ozimek) ও তার দল ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, যারা জাগতিক সম্পদ ও সামাজিক স্ট্যাটাসকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেন, তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি তুলনা করেন। এই গবেষণায় ১,২০০‑র বেশি অংশগ্রহণকারীর ওপর অনলাইন জরিপ করা হয়। গবেষকদের মতে, যখন মানুষ শুধু স্ক্রল করে (passive scrolling) অন্যের সাজানো সুখের ছবি ও সাফল্যের পোস্ট দেখে, তখন এই তুলনা স্ট্রেস বাড়ায় এবং জীবন‑সন্তুষ্টি কমিয়ে দেয়। এ কারণে তারা সোশ্যাল মিডিয়াকে “অসুখী হওয়ার ছয়টি ধাপের মধ্যে একটি সিঁড়ি (one of six stepping stones to unhappiness)” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই অদৃশ্য তুলনার সংস্কৃতি মানুষকে নিজের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আমরা এখন নিজের ছোট ছোট অর্জনেও আনন্দ পাই না, কারণ সঙ্গে সঙ্গে অন্য কারও বড় অর্জনের সঙ্গে সেটিকে তুলনা করে ফেলি। ফলে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় হতাশা, অস্থিরতা এবং এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতা।
তবে বাস্তবতা হলো, সুখ কখনোই নিখুঁত একটি ছবির নাম নয়। সুখ মানে হয়তো পরিবারের সঙ্গে নির্ভার কিছু সময় কাটানো, বন্ধুর সঙ্গে প্রাণ খুলে হাসা, কিংবা দীর্ঘ ব্যস্ত দিনের শেষে একটু মানসিক শান্তি পাওয়া। কখনো সুখ মানে নিজের পছন্দের লেখকের বই পড়া, কখনো প্রিয় গায়কের গান শোনা। এই সাধারণ মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় খুব একটা ধরা পড়ে না, কিন্তু জীবনের সত্যিকারের আনন্দ অনেক সময় লুকিয়ে থাকে এই সাধারণ কাজের মধ্যেই।
তাই হয়তো এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিজের জীবনের দিকে একটু মমতা নিয়ে তাকানো। মনে রাখা, মানুষের সোশ্যাল মিডিয়া টাইমলাইন তার পুরো জীবন নয়। প্রতিটি হাসির ছবির পেছনেও থাকে না-বলা কিছু গল্প, অদেখা কিছু কষ্ট এবং নীরব কিছু যুদ্ধ।
হয়তো আমরা সবাই একটু কম তুলনা করতে শিখলে, একটু বেশি বাস্তব হতে পারলে—এই ডিজিটাল পৃথিবীতেও আবার খুঁজে পাব সত্যিকারের সুখ। শৈশবের ঝিঁঝি পোকার পেছনে ছুটে বেড়ানো কিংবা নতুন রং পেন্সিলের বাক্স পাওয়ার মুহূর্তগুলোকেই আশ্রয় দিতে পারব আমাদের সুখের অ্যালবামে।





