শেরে বাংলায় ঐতিহাসিক জয়: অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ, সিরিজে এগিয়ে টাইগাররা
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া ছিল বাংলাদেশের জন্য এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। ২০০৫ সালের ঐতিহাসিক কার্ডিফ জয়ের পর কেটে গেছে ২১ বছর। এই সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট বদলেছে, এসেছে অসংখ্য স্মরণীয় জয়, বিশ্বের প্রায় সব বড় দলকেই হারিয়েছে টাইগাররা। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় যেন অধরাই থেকে গিয়েছিল।
অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। চার বছর পর জাতীয় দলে ফেরা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের অলরাউন্ড নৈপুণ্য, পেসার রানার বিধ্বংসী বোলিং এবং দলীয় সমন্বিত পারফরম্যান্সে অস্ট্রেলিয়াকে ডিএল মেথডে ৮৬ রানে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া প্রথম ওয়ানডে: টসে জিতে বোলিংয়ে অজিরা
মঙ্গলবার (৯ জুন) সিরিজের ম্যাচে টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমে ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৮৪ রান তোলে বাংলাদেশ। জবাবে অস্ট্রেলিয়া ৪২.২ ওভারে ৯ উইকেটে ১৯১ রান করার পর বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। পরে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন (ডিএলএস) পদ্ধতিতে ৮৬ রানের জয় পায় টাইগাররা।
শান্ত-তামিমের ভিত্তি, মোসাদ্দেকের ঝড়:
আরও পড়ুন: আইসল্যান্ড ম্যাচে ফিরছেন মেসি, আর্জেন্টিনার একাদশে আসছে পরিবর্তন
বাংলাদেশের শুরুটা অবশ্য খুব একটা সুখকর ছিল না। দলীয় ১১ রানের মাথায় মাত্র ৫ রান করে ফিরে যান ওপেনার সাইফ হাসান। এরপর নাজমুল হোসেন শান্ত ও তানজিদ হাসান তামিম ইনিংস মেরামতের দায়িত্ব নেন।
দ্বিতীয় উইকেটে দুজনের ৯৬ রানের জুটি বাংলাদেশকে শক্ত ভিত এনে দেয়। তামিম ৬৪ বলে ৫৪ রান করে আউট হলেও অপর প্রান্তে আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং চালিয়ে যান শান্ত। টাইগার অধিনায়ক ৭২ বলে ৬৭ রানের পর ইনিংস বড় করতে গিয়ে বিদায় নেন।
তবে এরপর হঠাৎ ব্যাটিং ধস নামে। লিটন দাস মাত্র ৭ রান করে ফেরেন। মিডল অর্ডারের ব্যাটাররাও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে দলের ভরসার নাম হয়ে ওঠেন চার বছর পর ওয়ানডে দলে ফেরা মোসাদ্দেক হোসেন।
তাওহীদ হৃদয়কে সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়েন গুরুত্বপূর্ণ ৭৫ রানের জুটি। হৃদয় ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে ৫১ বলে ৩১ রান করলেও মোসাদ্দেক ছিলেন পুরোপুরি আক্রমণাত্মক।
ক্যারিয়ারের চতুর্থ ওয়ানডে ফিফটির দিনে তিনি খেলেন নিজের সেরা ইনিংস। মাত্র ৭০ বলে ৮৬ রানে অপরাজিত থাকেন এই অলরাউন্ডার। তার ইনিংসে ছিল একাধিক দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি ও সময়োপযোগী আক্রমণ। শেষ দিকে তাসকিন আহমেদের ১৬ বলে ২০ রানের ঝোড়ো ক্যামিও বাংলাদেশের সংগ্রহকে ২৮৪ রানে নিয়ে যায়।
প্রথম বলেই তাসকিনের আঘাত:
২৮৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দুঃস্বপ্নের সূচনা হয় অস্ট্রেলিয়ার। ইনিংসের প্রথম বলেই ম্যাথু শর্টকে বোল্ড করে উল্লাসে মাতান তাসকিন আহমেদ।
পরের ওভারেই মুস্তাফিজুর রহমান ফিরিয়ে দেন মার্নাস ল্যাবুশেনকে। মাত্র ২ রানেই দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে সফরকারীরা।
এরপর জশ ইংলিস ও কুপার কনোলি কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও রানা সেই জুটি ভেঙে দেন। ২৫ বলে ১৯ রান করা ইংলিসকে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে দেন তিনি।
মোসাদ্দেকের জোড়া আঘাত, রানার আগুনঝরা স্পেল
ব্যাট হাতে নায়ক হওয়ার পর বল হাতেও আলো ছড়ান মোসাদ্দেক হোসেন। নিজের দ্বিতীয় ওভারেই উইকেট তুলে নেন তিনি। সেট হয়ে যাওয়া কুপার কনোলিকে ৩৫ রানে বোল্ড করার পর ম্যাট রেনশকেও এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলেন।
অন্যদিকে পেসার রানা ছিলেন একেবারেই অপ্রতিরোধ্য। গতি, বাউন্স আর নিখুঁত লাইন-লেংথে অস্ট্রেলিয়ার মিডল অর্ডারকে গুঁড়িয়ে দেন তিনি। অ্যালেক্স ক্যারি, লিয়াম স্কট ও জাভিয়ার বার্টলেটকে ফিরিয়ে ৪১ রানে ৪ উইকেট শিকার করেন এই ডানহাতি পেসার।
সবাই যখন আসা-যাওয়ার মিছিলে, তখন একপ্রান্তে লড়াই চালিয়ে যান ক্যামেরন গ্রিন। ৬৬ বলে ৫২ রানে অপরাজিত থাকলেও তাকে কেউ যোগ্য সঙ্গ দিতে পারেননি।
৪২.২ ওভারে ১৯১/৯ অবস্থায় বৃষ্টি নামলে খেলা আর মাঠে গড়ায়নি। ফলে ডিএলএস পদ্ধতিতে ৮৬ রানের ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের ব্যাটার রান স্কোরকার্ড:
সাইফ হাসান-৫
তানজিদ হাসান তামিম-৫৪
নাজমুল হোসেন শান্ত-৬৭
লিটন দাস-৭
তাওহীদ হৃদয়-৩১
মোসাদ্দেক হোসেন-৮৬
মেহেদী হাসান মিরাজ-৪
তানভীর ইসলাম-২
তাসকিন আহমেদ-২০
অতিরিক্ত-৮
মোট-২৮৪/৮ (৫০ ওভার)
অস্ট্রেলিয়ার বোলার উইকেট:
নাথান এলিস-৩
ম্যাট রেনশ-২
লিয়াম স্কট-২
জাভিয়ার বার্টলেট-১
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটার রান স্কোরকার্ড:
ম্যাথু শর্ট-০
মার্নাস ল্যাবুশেন-১
জশ ইংলিস-১৯
কুপার কনোলি-৩৫
ম্যাট রেনশ-১২
অ্যালেক্স ক্যারি-১৮
লিয়াম স্কট-১৪
ক্যামেরন গ্রিন-৫২
জাভিয়ার বার্টলেট-৮
নাথান এলিস-৭
অতিরিক্ত-২৫
মোট-১৯১/৯ (৪২.২ ওভার)
বাংলাদেশের বোলার উইকেট:
রানা-৪/৪১
মোসাদ্দেক হোসেন-২/৩৭
তাসকিন আহমেদ-১
মুস্তাফিজুর রহমান-১
অন্যান্য-১
মিরপুরের রাতটা তাই শুধুই একটি জয়ের গল্প নয়; এটি ২১ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নতুন ইতিহাস লেখার রাত। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন প্রত্যাবর্তনের নায়ক মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত ও আগুনঝরা পেসার রানা।





