নরসিংদীতে হাত বাড়ালেই মিলে বাবা

Sadek Ali
আশিকুর রহমান, নরসিংদী
প্রকাশিত: ৩:০৪ অপরাহ্ন, ০৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৩:২৮ পূর্বাহ্ন, ১০ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নরসিংদী জেলা জুড়ে বাবা'র (ইয়াবা) ছড়াছড়ি একটি চরম উদ্বেগের বিষয়। শহর থেকে শুরু প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে হাত বাড়ালেই  মিলছে বাবা। এটি মাদকসেবীদের কাছে ‘বাবা’ নামে পরিচিত। পছন্দণীয় ও অতিসহজ হওয়ায় দিন দিন এই ভয়ংকর মাদকের প্রতি মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছেন তরুণ প্রজন্ম। শহরের ছোট-বড় বিভিন্ন বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অনেকটা প্রকাশ্যেই চলছে বাবার (ইয়াবা) কেনাবেচা। বিশেষ করে শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় মাদকের কারবার অনেকটা প্রকাশ্য। এমনকি শহরের পাশ্ববর্তী ইউনিয়ন গুলো ঘিরে গড়ে উঠেছে মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্য। স্থানীয়রা বলছেন, মাদক এখন আর গোপন কিছু নয়, বরং প্রকাশ্যেই চলছে এসব কারবার। মাঝে মধ্যে পুলিশের দুই-একটা অভিযানে অল্পসংখ্যক মাদক উদ্ধার হলেও তা অপ্রতুল। 

শহরের বিভিন্ন অলিগলি ও পাশ্ববর্তী কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, চিহ্নিত মাদক কারবারিরা স্ব স্ব এলাকায় মাদকের পসরা নিয়ে সড়ক ও অলিগলির মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। একে একে মাদকসেবীরা আসছেন তাদের কাছ থেকে সেবা নিতে। এসময় মাদকসেবীরাও তাদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা নিয়ে যাচ্ছেন প্রকাশ্যে। আর এসব সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে বেশির ভাগই তরুণ। 

আরও পড়ুন: কবীর আহমেদ ভূঁইয়ার উদ্যোগ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্পোর্টস ভিলেজ স্থাপনের দাবী

বাবা (ইয়াবা) কিনতে আসা এক তরুণ মাদকসেবী বলেন, তিন ধরনের বাবা (ইয়াবা) থাকলেও বর্তমানে লালচে-গোলাপি এবং কালো রংয়ের বাবা পাওয়া যায়। তবে লালচে-গোলাপি রংয়ের বাবা (ইয়াবা) সবচেয়ে বেশি চলে এবং জনপ্রিয়। ১পিস লালচে-গোলাপি রংয়ের বাবার (ইয়াবা) দাম ৫০০ টাকা আর কালো রংয়ের ১পিস বাবার (ইয়াবা) দাম ৩০০-৩৫০ টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী মাদক বিক্রেতা বলেন, স্বামী ও ছেলে বাবা খায়। প্রতিদিন তাদেরকে বাবা কিনার টাকা দিয়ে হয়। তাদের চাহিদা পূরণের জন্য নিজও বিক্রি করি এবং তাদেরকেও দেই। পুলিশে ধরলে কয়েকদিন পর জেল থেকে জামিনে বের হয়ে আসি।

আরও পড়ুন: সাভারে আসামি ধরতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা, আহত ২

আরেক মাদক বিক্রেতা বলেন, সিগারেটের প্যাকেটে একসাথে একশত বড়ি রাখা যায়। আপনি শরীরের যেকোনো জায়গায় এটা লুকিয়ে রাখতে পাবেন। কেও বুঝতে পারবে না যে আপনারা কাছে অবৈধ জিনিস আছে। সেই সাথে বহন করাও সহজ। এছাড়া পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সহজে নেওয়া যায়। তাই সবাই এখন অন্যসব বেচা বাদ দিয়ে বড়ি বিক্রি করে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, মাদক বিক্রেতারা অনেক প্রভাবশালী। তাদের ব্যাপারে প্রতিবাদ তো দূরের কথা, তাদের বিরুদ্ধে কেও মুখেই খুলতে সাহস পায় না। অলিগলিতে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে বাবা নামক ইয়াবা। 

সরকারি এক চাকরিজীবি বলেন, নরসিংদীতে এখন ইয়াবা, গাঁজা ও ডান্ডির মতো মারণঘাতী মাদকে সয়লাব হয়ে গেছে। এখন বেশির ভাগ উঠতি বয়সের মাদকসেবীরা মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হচ্ছে। এতে করে  সাধারণ মানুষের চলাচল চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এই শহর ও শহরের পাশ্ববর্তী ইউনিয়ন গুলো দীর্ঘদিন মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত। নদী, সড়ক ও রেলপথকে কাজে লাগিয়ে মাদক বিক্রেতারা একপ্রকার বাঁধাহীনভাবে মাদক বিকিকিনি করছেন। এতে করে উঠতি বয়সের তরুণরা এসব মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে পারিবারিক সৌহার্দ্য ও শিক্ষার অভাব, বেকারত্ব এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক তরুণ সহজেই মাদক সাথে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে দিন দিন মাদকসেবীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন অপরাধ বাড়ছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সমাজে যতগুলো ক্রাইম হচ্ছে তার অধিকাংশই মাদকের কারণে। পাশাপাশি মাদককাণ্ডে নানান বিচারহীনতার উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। ফলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। অপরাধ দমন বা রোধ হলে আগে মাদক রোধ করতে হবে। তা না হলে ছোঁয়াচে রোগের মতো সমাজে ছড়িয়ে পড়বে। যত দ্রুত মরণব্যাধি মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলতে পারবে তাহলে আগামী প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অবস) সুজন চন্দ্র সরকার বলেন,  মাদক বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ জিরো টলারেন্স। মাদকের বিষয়ে কোনো আপোষ নয়। প্রতিনিয়ত মাদক বিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি মাদক কারবারিদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে। এছাড়াও আমরা মাদকের বিরুদ্ধে অন্যান্য সংস্থা যেমন র‍্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাথে যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছি।