চার দিনে ২১টি পুশ-ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি

সীমান্তে ৬০ হাজার বিজিবির সর্বোচ্চ সতর্কতা, দিল্লির বৈঠকে বিএসএফের পুশ-ইন ও হত্যাকাণ্ডের জবাব চাইবে ঢাকা

Sanchoy Biswas
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৭:৪৩ অপরাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৯:৪২ অপরাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কথিত ‘পুশ-ইন’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্ত দিয়ে শিশু, নারী ও পুরুষদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর একের পর এক প্রচেষ্টার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দেশের ২৬টি সীমান্ত জেলায় প্রায় ৬০ হাজার বিজিবি সদস্যকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। সীমান্তজুড়ে চার পালায় ২৪ ঘণ্টা টহল, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।

এদিকে এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিজিবি ও বিএসএফের ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবারকার বৈঠক শুধু আনুষ্ঠানিক সীমান্ত সম্মেলন নয়; বরং সাম্প্রতিক পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বিনিময়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন, ১৯৬ অপহরণ: টিআইবি

বিজিবি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত মাত্র চার দিনে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে ২১টি পৃথক পুশ-ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় দুই শতাধিক নারী, শিশু ও পুরুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থান এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় কোনো ঘটনাই সফল হয়নি।

সীমান্তজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়: 

আরও পড়ুন: রামিসা হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকরে উদ্যোগ, ডেথ রেফারেন্স এগিয়ে আনার কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার ৪৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে বর্তমানে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। সীমান্তের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করে অতিরিক্ত টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুর, যশোর, সাতক্ষীরা, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও খাগড়াছড়িসহ ২৬টি জেলার সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে।

সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, দিনের পাশাপাশি রাতেও টহল উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক এলাকায় বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও সাধারণ মানুষও সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করছেন। সীমান্তের বিভিন্ন প্রবেশপথ, চোরাপথ ও অরক্ষিত অংশে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।

বিজিবির একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, সীমান্তে কোনোভাবেই অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশ-ইন সফল হতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক আইন ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল অনুসরণ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

চার দিনে বিএসএফের ২১টি পুন ইন প্রচেষ্টা ব্যর্থ: 

বিজিবির তথ্যমতে, সর্বশেষ শনিবার মেহেরপুরের তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে সাতজন, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্ত দিয়ে ১১ জন এবং দিনাজপুরের বিরামপুর সীমান্ত দিয়ে পাঁচজনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়।

এর আগে ৩ জুন থেকে বিভিন্ন সীমান্তে আরও ১৮টি পৃথক ঘটনায় মোট ১৮৬ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজিবি তা প্রতিহত করে।

সীমান্তের স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভারতীয় সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় নারী, শিশু ও পুরুষদের দলবদ্ধভাবে অবস্থান করতে দেখা গেছে। অনেককে দিনের পর দিন সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। পুশ-ইনের চেষ্টা ব্যর্থ হলে কাউকে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও অনেককে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

শূন্যরেখায় মানবিক সংকট: 

পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো নারী-শিশুসহ ১০ জন ব্যক্তির দীর্ঘ সময় ধরে শূন্যরেখায় অবস্থান।

গত শুক্রবার ভোরে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বিজিবির কড়া অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশে ঢুকতে পারেননি। অপরদিকে বিএসএফও তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেয়নি।

ফলে পাঁচজন পুরুষ, দুইজন নারী ও তিন শিশু নিয়ে গঠিত দলটি দুই দেশের মাঝামাঝি এলাকায় খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বজ্রবৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও তারা সেখানে অবস্থান করেছেন।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোম্পানি কমান্ডার ও ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে দুই দফা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।

দিল্লির বৈঠকে কঠোর বার্তার প্রস্তুতি: 

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় চার দিনের মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্ট মহল।

বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। এর মধ্যে রয়েছে; অবৈধ পুশ-ইন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ, মানবপাচার প্রতিরোধ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান রোধ, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন মেনে চলা, সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অননুমোদিত স্থাপনা ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ বন্ধ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বাংলাদেশের জন্য শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ নয়; বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত: 

পুশ-ইন ইস্যুর পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান।

এর আগে ২০২৪ সালে ৩০ জন এবং ২০২৩ সালে ৩১ জন বাংলাদেশি সীমান্তে নিহত হন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের ঘটনা দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর করছে। ফলে সীমান্ত হত্যার বিষয়টি এবার দিল্লির বৈঠকে অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অনড় অবস্থান: 

বিজিবি সদর দপ্তর ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, বিদ্যমান আইন এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থী কোনো ধরনের পুশ-ইন প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

বাহিনীটির দাবি, ৩ জুনের পর কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশে পুশ-ইন হতে পারেনি। সীমান্তে প্রতিটি প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সীমান্ত পরিস্থিতি এখন শুধু নিরাপত্তা ইস্যু নয়; এটি কূটনৈতিক সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ফলে দিল্লির বৈঠকে বাংলাদেশের প্রত্যাশা—অবৈধ পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে সুস্পষ্ট ও কার্যকর প্রতিশ্রুতি পাওয়া।

তবে সীমান্তের বর্তমান বাস্তবতা বলছে, কূটনৈতিক আলোচনা চললেও মাঠপর্যায়ে সতর্কতা শিথিল করার সুযোগ নেই। সে কারণেই ৪ হাজার ৪৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে বিজিবি সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রেখেছে। কারণ সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, ‘সীমান্ত নিরাপত্তা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই।