বেসরকারিকরণ হোক, বেসরকারি আধিপত্য নয়
দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ নতুন নয়। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, আর চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোথাও কোথাও বাড়ছে লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা। একদিকে সাধারণ মানুষ প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎহীনতার কষ্ট ভোগ করছেন, অন্যদিকে শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, হাসপাতাল ও শিক্ষা কার্যক্রমও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিদ্যুৎ এখন আর কেবল একটি নাগরিক সুবিধা নয়, এটি দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই বাস্তবতায় বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার সরকারের পরিকল্পনা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা দিলেই কি দেশের বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হবে? নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার কিছু দুর্বলতা দূর করতে গিয়ে আমরা এমন এক নতুন ব্যবস্থার দিকে এগোব, যেখানে জনগণের বিদ্যুৎ পরিণত হবে কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মুনাফার অন্যতম উৎসে?
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি খাতে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে এবং এ বিষয়ে বেসরকারি খাতের কাছ থেকে প্রস্তাবও আহ্বান করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বিতরণব্যবস্থার দক্ষতা বাড়বে, বিল আদায় উন্নত হবে, সিস্টেম লস কমবে এবং গ্রাহকসেবার মান বাড়বে। উৎপাদন ও পাইকারি পর্যায়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, আর বিতরণ ও গ্রাহক পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা হবে। একটি দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য থাকলে এই উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে, আমরা যেন বেসরকারিকরণকে নিজেরাই সমাধান হিসেবে ধরে না নিই।
আরও পড়ুন: আপসহীন সংগ্রামের জীবন ও রাজনীতি: বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
কারণ বেসরকারিকরণ কোনো জাদুর কাঠি নয়। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান অদক্ষ হলে সেটিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিলেই সেটি রাতারাতি দক্ষ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা পৃথিবীর কোথাও নেই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ভুল করতে পারে, অদক্ষ হতে পারে, দুর্নীতিতে জড়াতে পারে এবং সর্বোপরি মুনাফার স্বার্থকে জনস্বার্থের ওপর স্থান দিতে পারে। পার্থক্য হলো, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে রাষ্ট্রের জবাবদিহি থাকে, কিন্তু একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব তার বিনিয়োগকারী বা মালিকের কাছে। তাই জনসেবার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বরং আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে। বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে? কোনো বিশেষ কোম্পানি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের হাতে যদি কোনো একটি অঞ্চলের বিতরণব্যবস্থার একক নিয়ন্ত্রণ চলে যায়, তাহলে সেটি কীভাবে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে? বিদ্যুৎ এমন কোনো পণ্য নয় যে একজন গ্রাহক আজ একটি কোম্পানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ নিলেন, পরদিন আরেকটি কোম্পানির কাছ থেকে নিলেন। একটি নির্দিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক কার্যত একটি প্রাকৃতিক একচেটিয়া অবকাঠামো। ফলে যে কোম্পানি একটি অঞ্চলের বিতরণব্যবস্থা পাবে, সেই এলাকার গ্রাহকের সামনে বাস্তবে তার বিকল্প থাকবে না। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে শুধু বেসরকারি খাতের দক্ষতার কথা বললে সেটি হবে অসম্পূর্ণ আলোচনা।
আরও পড়ুন: হুমায়ুন আজাদ ও আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়
রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার জায়গায় বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি করা কোনো সংস্কার হতে পারে না। বরং সেটি হতে পারে আরও ভয়ংকর। কারণ সরকারি ব্যবস্থার অদক্ষতার বিরুদ্ধে অন্তত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে। কিন্তু কোনো বেসরকারি কোম্পানি যদি একটি অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণের একক নিয়ন্ত্রণ পায় এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সাধারণ গ্রাহকের দরকষাকষির ক্ষমতা প্রায় শূন্য হয়ে যাবে। তখন বিদ্যুৎ বিল, সংযোগ, মিটার, সেবা, অভিযোগ কিংবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো প্রতিটি বিষয়ে কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হবে গ্রাহককে। এই পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়, সেটিই সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত।
বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই, এমন কথা বলার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের পক্ষে একা সব ধরনের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেওয়া সবসময় সম্ভবও নয়। আধুনিক প্রযুক্তি, স্মার্ট মিটার, ডিজিটাল বিলিং, গ্রাহকসেবা, বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন এবং সিস্টেম লস কমাতে বেসরকারি খাতের দক্ষতা কাজে লাগানো যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই দক্ষতা জনগণের জন্য ব্যবহার হবে, নাকি কোম্পানির মুনাফা বাড়ানোর জন্য? এই পার্থক্যটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো বেসরকারি কোম্পানি বিনিয়োগ করলে তার মুনাফা করার অধিকার অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেই মুনাফার নিশ্চয়তা যদি জনগণের বিদ্যুৎ বিল বাড়িয়ে দিতে হয়, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের খরচ বাড়লে তার প্রভাব শুধু একজন গ্রাহকের মাসিক বিলের ওপর পড়ে না। শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, কৃষির সেচ ব্যয় বাড়ে, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামও বাড়তে থাকে। ফলে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি শুধু বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় বা বিতরণ কোম্পানির বিষয় নয়, এটি সরাসরি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো চুক্তি। কোনো বেসরকারি কোম্পানিকে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব দেওয়ার আগে সরকারের সঙ্গে তার চুক্তির প্রতিটি শর্ত জনস্বার্থের দৃষ্টিতে যাচাই করা দরকার। কত বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্ব পাবে, কত টাকা বিনিয়োগ করবে, কী পরিমাণ সিস্টেম লস কমাতে হবে, গ্রাহকসেবার মান কী হবে, নির্ধারিত মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে কী শাস্তি হবে, গ্রাহকের অভিযোগ কত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে, কোম্পানি কী পরিমাণ মুনাফা করতে পারবে এবং চুক্তি ভঙ্গ হলে সরকার কীভাবে সেই দায়িত্ব পুনরুদ্ধার করবে, এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এসব চুক্তি জনগণের কাছ থেকে গোপন রাখা যাবে না।
আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন সময়ে এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেগুলোর আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা থাকলেও সেটি ব্যবহার না করে অর্থ পরিশোধ, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, জ্বালানি আমদানি এবং ভর্তুকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত ব্যয় ও আর্থিক চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে নতুন করে বিতরণব্যবস্থাকে বেসরকারি হাতে দেওয়ার সময় অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষ করে কোনো একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে একাধিক স্তরে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দেওয়া যাবে না। যে গোষ্ঠী বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, সেই একই গোষ্ঠী যদি জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ ক্রয় এবং বিতরণের বড় অংশও নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে সেখানে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। একটি কোম্পানি যদি উৎপাদন থেকে গ্রাহকের ঘর পর্যন্ত পুরো চেইনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে বাজারে প্রতিযোগিতা এবং স্বচ্ছতা দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই বিদ্যুৎ খাতে মালিকানার কেন্দ্রীভবন ঠেকানো এবং ক্রস-ওনারশিপ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারকে এটিও নিশ্চিত করতে হবে, বেসরকারি কোম্পানি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক প্রভাব যেন কাজ না করে। দরপত্রের শর্ত এমন হওয়া উচিত, যাতে প্রকৃত যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য শর্ত তৈরি করা হলে পুরো উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে। বিনিয়োগ সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, আর্থিক সামর্থ্য, গ্রাহকসেবার অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে হবে। দরপত্রের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বাধীন নিরীক্ষা থাকতে হবে এবং চূড়ান্ত চুক্তি জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত।
এর পাশাপাশি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো ছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণে বেসরকারিকরণ করা উচিত নয়। বিদ্যুৎ খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত করে কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে। কোনো কোম্পানি নির্ধারিত সেবার মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে তাকে জরিমানা করা, ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা কিংবা প্রয়োজনে চুক্তি বাতিল করার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রকের থাকতে হবে। গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্যও স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করলেই হবে না, সেই চুক্তির প্রতিটি শর্ত বাস্তবে পালন হচ্ছে কি না, সেটি নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
তবে বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ হিসেবে শুধু বিতরণব্যবস্থাকে দায়ী করাও ঠিক হবে না। দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সঙ্গে উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ, গ্যাস, এলএনজি, কয়লা, ডলার সংকট, সঞ্চালন অবকাঠামো, গ্রিড সক্ষমতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সবকিছুই যুক্ত। কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি না থাকলে সেটি চালানো যাবে না। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও সঞ্চালনব্যবস্থা দুর্বল হলে সেই বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছাবে না। তাই বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি করলেই দেশের মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেয়ে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
বরং বিদ্যুৎ খাতকে একটি সমন্বিত সংস্কারের আওতায় আনা দরকার। উৎপাদন থেকে জ্বালানি, জ্বালানি থেকে সঞ্চালন, সঞ্চালন থেকে বিতরণ, প্রতিটি পর্যায়ের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। কোথায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হচ্ছে, কোথায় সিস্টেম লস বেশি, কোথায় দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা রয়েছে, কোথায় বিনিয়োগ দরকার এবং কোথায় পুরোনো অবকাঠামো বদলানো প্রয়োজন, এসব বিষয় তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। বেসরকারি খাত এই সংস্কারে অংশীদার হতে পারে, কিন্তু সংস্কারের একমাত্র অর্থ বেসরকারিকরণ হতে পারে না।
বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হচ্ছে জনগণ। অথচ অনেক সময় বড় বড় প্রকল্প, বিনিয়োগ ও চুক্তির আলোচনায় জনগণের বিষয়টি সবচেয়ে কম গুরুত্ব পায়। আমরা যদি সত্যিই বিদ্যুৎ খাতকে জনবান্ধব করতে চাই, তাহলে প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে একটি প্রশ্ন করতে হবে, এর ফলে সাধারণ গ্রাহকের কী লাভ হবে? বিল কমবে কি? বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে কি? লোডশেডিং কমবে কি? অভিযোগের দ্রুত সমাধান হবে কি? শিল্প ও কৃষি উপকৃত হবে কি? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকে, তাহলে শুধু বেসরকারি বিনিয়োগ এসেছে বলেই কোনো উদ্যোগকে সফল বলা যাবে না।
সরকারের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বিদ্যুৎ খাতকে নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ। কিন্তু সেই সংস্কারের কেন্দ্রে থাকতে হবে জনগণকে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অদক্ষতা দূর করতে গিয়ে কোনো বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে জনগণের বিদ্যুৎব্যবস্থার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া যাবে না। কারণ সরকারি একচেটিয়ার সমস্যার সমাধান যদি বেসরকারি একচেটিয়া হয়, তাহলে সমস্যার চরিত্র বদলাবে, সমাধান হবে না।
আমরা চাই বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা আসুক। আমরা চাই বেসরকারি বিনিয়োগ আসুক। আমরা চাই আধুনিক প্রযুক্তি আসুক, সেবার মান বাড়ুক, সিস্টেম লস কমুক এবং গ্রাহকের হয়রানি বন্ধ হোক। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা এটাও চাই, বিদ্যুৎ খাত কোনো বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মুনাফার সাম্রাজ্যে পরিণত না হোক। জনগণের অর্থে তৈরি অবকাঠামো, জনগণের প্রয়োজনের বিদ্যুৎ এবং রাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পদকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে এর সুফল সবার কাছে পৌঁছায়।
বিদ্যুৎ বেসরকারিকরণ করা হবে কি না, সেটি হয়তো শেষ পর্যন্ত সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কী শর্তে করা হবে এবং কার স্বার্থে করা হবে। বেসরকারিকরণ যদি দক্ষতা বাড়ায়, সেবা উন্নত করে এবং জনগণের খরচ কমায়, তাহলে সেটি স্বাগত জানানো যায়। কিন্তু যদি এর ফলে কয়েকটি কোম্পানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেয়, জনগণের ওপর বাড়তি খরচ চাপায় এবং রাষ্ট্রকে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত করে, তাহলে সেই বেসরকারিকরণ কোনোভাবেই জনস্বার্থের সংস্কার নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ কোনো সাধারণ পণ্য নয়। এটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত, অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। তাই বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার করতে হবে অনেক বেশি সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে। জনগণের ভালো করতে গিয়ে যেন এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি না হয়, যেখানে জনগণই শেষ পর্যন্ত অসহায় গ্রাহকে পরিণত হয়।
বিদ্যুৎ খাতে সংস্কার হোক, বেসরকারি বিনিয়োগ হোক, দক্ষতা বাড়ুক। কিন্তু বেসরকারি আধিপত্য যেন তৈরি না হয়। রাষ্ট্রীয় অদক্ষতা দূর হোক, কিন্তু তার জায়গায় নতুন কোনো মুনাফাকেন্দ্রিক একচেটিয়া ব্যবস্থা যেন জন্ম না নেয়। জনগণের বিদ্যুৎ জনগণের স্বার্থেই পরিচালিত হতে হবে। কারণ আলো জ্বালানোর নামে যদি অন্ধকারের নতুন দরজা খুলে দেওয়া হয়, তাহলে সেই আলো শেষ পর্যন্ত কার ঘরে জ্বলবে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট





