এআই দিয়ে বানানো পুলিশের বক্তব্য প্রত্যাখান
প্রকৌশল শিক্ষার্থীকে মুখ চেপে ধরা ডিসি মাসুদের অপসারণ দাবি, ছবিতে আগুন
প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে রমনার পুলিশের ডিসি মাসুদ এক শিক্ষার্থীকে মুখ চেপে ধরে নির্যাতনের ছবিটি ভাইরাল হওয়ায় তার অপসারণ দাবি করেছে শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর বুয়েট শিক্ষার্থীরা মৎস্যভবন অবরোধ করে ডিসি মাসুদের ছবিতে আগুন ধরিয়ে তার বিচার দাবি করে। এদিকে ঘটনার জন্য ঢাকা পলিটন পুলিশ কমিশনার দুঃখ প্রকাশ করলেও ছবিটি আই দিয়ে বানানো বলে দাবি করেছে। তবে ঢাকার ফটো সাংবাদিক ও প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা এটি প্রত্যাখ্যান করে পুলিশের মিথ্যাচার বলে দাবি করেছে।
প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় এক বিক্ষোভকারীর মুখ চেপে ধরার যে ছবিটা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, সেটি ‘এআই জেনারেটেড’ বলছে পুলিশ।
আরও পড়ুন: নির্বাচনী বেইজ ক্যাম্প পরিদর্শনে বিজিবি মহাপরিচালক
পুলিশের ভাষ্য, ‘জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির জন্য’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে এ ছবি তৈরি করা হয়েছে। আদতে এরকম কোনো ‘ঘটনা ঘটেনি’।
তবে ঢাকার তিনটি দৈনিকে বৃহস্পতিবার এই ছবিটি চাপা হয়েছে। তিনজন ফটো সাংবাদিক বলছেন, তারা প্রত্যেকেই ঘটনাস্থলে থেকে ওই ঘটার ছবিটি তুলেছেন।
আরও পড়ুন: বিজিবির বিশেষ অভিযান,বড়লেখা সীমান্ত থেকে বিপুল বিস্ফোরক ও অস্ত্র উদ্ধার
তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত প্রকৌশলের শিক্ষার্থীরা বুধবার দুপুরে শাহবাগে জড়ো হন। তাদের সামনের কাতারে ছিলেন মূলত বুয়েট শিক্ষার্থীরা। এক পর্যায়ে তারা মিছিল নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে যেতে থাকলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘাত বাঁধে।
পুলিশ লাঠিপেটা করে, টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
ওই সময় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পুলিশ ঘিরে ধরে মারধর করছে–এমন কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
আর পুলিশের রমনা বিভাগের উপ কমিশনার মাসুদ আলম এক শিক্ষার্থীর মুখ চেপে ধরেছেন– এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল সমালোচনার জন্ম দেয়।
বুধবারের এই ছবিটির সঙ্গে ২৪’ এর জুলাই আন্দোলনের সময়কার একটি মুখ চেপে ধরা ছবি জোড়া দিয়ে বা দুটো ছবির তুলনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন অনেকে।
অভ্যুত্থানের আগের সময়কার পুলিশের মত এখনকার পুলিশও ‘মুখ চেপে কণ্ঠরোধের চেষ্টা চালাচ্ছে’ বলে অভিযোগ করেন কেউ কেউ।
গত বছরের জুলাই আন্দোলনের সময়কার আলোচিত ওই ছবিটিতে শাহবাগ থানার এক পুলিশ কর্মকর্তার। তিনি হাই কোর্টের সামনে এক আন্দোলনকারীর মুখ চেপে ধরেছিলেন। সেই ছবিটি গ্রাফিতি, কার্টুন, মিমসহ অনেকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ায়, কণ্ঠরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
বুধবারের মুখ চেপে ধরার ছবি নিয়ে বিব্রত পুলিশ এখন পুরো ঘটনা অস্বীকার করে পাল্টা অভিযোগ তুলছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সম্প্রতি ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলমকে নিয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এক ছাত্রের মুখ চেপে ধরার একটি ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
“কে বা কারা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলকভাবে উক্ত ছবিটি তৈরি করে জনমনে অহেতুক বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। ছবিটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বোঝা যায় তা সম্পূর্ণ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এবং বাস্তবতা বিবর্জিত।”
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির উদ্দেশে তৈরি ছবি ও তা প্রচারের সাথে জড়িতদের এহেন কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানায় ডিএমপি। একইসাথে এ ধরনের মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বসাধারণকে অনুরোধ করা হল।৷৷ এদিকে ‘সাইট ইঞ্জিন’ নামের একটি অ্যাপ দিয়ে ছবিটি যাচাই করা হয়। অ্যাপটি বলছে, এই ছবিটি এআই জেনারেটেড নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাবিদকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী পুলিশের দাবি খণ্ডন করতে সাইট ইঞ্জিন অ্যাপের ফলাফল ফেইসবুকে তুলে ধরেছেন।
তিনি লিখেছেন, “পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে বুয়েটের এক শিক্ষার্থীর মুখ চেপে ধরা ছবিটি এআই জেনারেটেড। … পুলিশ কোন সফটওয়্যার দিয়ে, মেটাডেটা এনালাইসিস করেছে, কী দেখে মনে হল ছবিটা এআই জেনারেটরেড–তার কোনো ব্যাখ্যা নাই।
“এআই জেনারেটেড ছবি কী না তার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হল মেটা ডেটা এনালাইসিস করা। আমার জানা মতে, পুলিশের মধ্যে এ ধরনের অ্যানালিস্ট নেই।”
এই শিক্ষক বলেন, “খুব ক্রুশিয়াল না হলে এখন আর ফ্যাক্ট চেক করি না। কিন্তু পুলিশের দাবির পর ছবিটার একটা গ্রামার দেখেই মনে হয়েছে এই ছবি এআই জেনারেটেড নয়। এআই ছবিতে যদি একাধিক হাত থাকে, তাহলে হাতগুলো একসাথে ৯০ এবং ১২০ ডিগ্রি এঙ্গেলে থাকতে পারে না। সেজন্য ছয়টা টুলস দিয়ে পরীক্ষা করলাম। ফলাফল ছবিটা রিয়েল।
বুধবারের বিক্ষোভে পুলিশের বল প্রয়োগের আরও অনেকগুলো ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে। শিক্ষার্থীরা রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলমের শাস্তিও দাবি করেছেন। এদিকে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন দাবি আদায়ের প্রধান মাঠ রমনাথ ডিসি মাসুদ আলমের সাম্প্রতিক প্রতি উৎসাহী কর্মকান্ড হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। যেকোনো বিক্ষুভ সমাবেশে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হয়েও তিনি অতি উৎসাহী হয়ে কনস্টেবল ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। নিজেকে জাহির করতে গিয়ে তার অতি উৎসাহী ভূমিকা লক্ষ্য নিয়। অনুসন্ধানে জানা যায় বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম ব্যাচ হিসাবে বিসিএসে নিয়োগ পাওয়া ২৮ তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা বিগত ১২ বছরেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান সময় দেশের বৃহত্তর জেলা পাবনার আলফা টু দায়িত্বে ছিলেন। গণ আন্দোলন দমনে মুখ্য ভূমিকা একইভাবে মাঠে রাখলেও গণঅভ্যুতনের পর তড়িঘড়ি করে ছাত্রদের পক্ষে যোগ যুগ দিয়ে রক্ষা পান।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বুধবার রাতে শাহবাগে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে দুঃখ প্রকাশও করেন।





