এপিসি ত্রয়ে যান্ত্রিক বিশেষজ্ঞ কেউ নেই
এপিসির ফ্যাক্টরি টেস্টে আইজিপিসহ ৪ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নানা প্রশ্ন
পুলিশের জন্য ক্রয়কৃত ৪টি এপিসির ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট (Factory Acceptance Test-FAT)-এ অংশগ্রহণের জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরসহ চার কর্মকর্তা ৯ জুন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। এদের মধ্যে কোনো কর্মকর্তাই সংশ্লিষ্ট যান্ত্রিক বা কারিগরি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কেউ নেই। আইজিপি ছাড়াও এপিসির ফ্যাক্টরি টেস্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের বর্তমান কমিশনার ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সাবেক ডিআইজি ইকুইপমেন্ট ও ট্রান্সপোর্ট আশিক সাঈদ, অতিরিক্ত ডিআইজি ট্রান্সপোর্ট মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ এক শাখার উপসচিব তৌসিফ আহমদ। আইজিপিসহ এই কর্মকর্তাদের সরকারি দরপত্রে কেনা এপিসি টেস্টের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের অনুমোদন দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৫ শাখা থেকে ১৬ এপ্রিল জারি করা এক সরকারি আদেশে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সফরটি আগামী ২২ এপ্রিল থেকে ২৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে উল্লেখ করলেও প্রয়োজনে নিকটবর্তী সুবিধাজনক সময়েও সফর সম্পন্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এ সময়সীমার মধ্যে ভ্রমণ ও ট্রানজিট সময় অন্তর্ভুক্ত থাকবে না।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণকারীরা ৯ জুন সকাল ছয়টায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। আগামী ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরবেন।
আরও পড়ুন: দিল্লিতে পুশ-ইন নিয়ে কড়া আপত্তি ঢাকার, বিজিবির দাবি ২০২৬ সালে একজনও ঢুকতে পারেনি
সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, সফরসংক্রান্ত সব ব্যয় আয়োজক কর্তৃপক্ষ বহন করবে এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা থাকবে না। সফরের সময়কাল, ভ্রমণ ও ট্রানজিট সময়সহ দাপ্তরিক কর্তব্য হিসেবে গণ্য হবে।
এছাড়া অনুমোদিত সময়ের বেশি বিদেশে অবস্থান করা যাবে না। সফর শেষে দেশে ফেরার ১৫ দিনের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে সফর-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
আরও পড়ুন: হাইতির ‘গ্যাং সাপ্রেশন ফোর্স’-এ অংশ নেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পুলিশ: সেনাপ্রধান
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এ সরকারি আদেশ জারি করেন।
প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের ব্যবহৃত সাজোয়া যান এপিসির ফ্যাক্টরি টেস্টে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনো বিশেষজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ তালিকায় না থাকা বিষয়ে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যয় সংকোচন ও কাজের গতি বাড়াতে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বিষয়ে অনুৎসাহিত করার বেশকিছু নির্দেশনা জারি করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এবং কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক নাকচ ও কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়ার বিষয়ে আলোড়ন তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বা প্রকৌশলীদের পাঠাতে পরামর্শ দিয়েছেন। এই আলোচিত সময়ের মধ্যেই এপিসির ফ্যাক্টরি টেস্টে আইজিপিসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, অনেক আগে থেকেই অস্ত্র, যানবাহন ও লজিস্টিক ক্রয় সংক্রান্ত ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্টে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারাই বিদেশ ভ্রমণ করে থাকেন। ঠিকাদার পক্ষ এটির ব্যয় বহন করায় এটি প্লেজার ট্যুর হিসেবে পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে লোভনীয় হয়ে উঠেছে। বিদেশ প্রশিক্ষণ বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনফারেন্সে অংশগ্রহণের চেয়ে কেনাকাটা সংক্রান্ত ফ্যাটে ভ্রমণ দিয়ে পুলিশ ও মন্ত্রণালয় কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা হয়। সরকার এই ভ্রমণের কোনো ব্যয় গ্রহণ করবে না মর্মে মন্ত্রণালয়ের চিঠির নির্দেশনা একটি কৌশল। কারণ ক্রয় সংক্রান্ত দরপত্রের মধ্যে ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্টের ব্যয়ের বিষয়টিও ঠিকাদার বহন করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশ ভ্রমণ সংক্রান্ত ফ্যাটের অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন করেই ঠিকাদার কার্যাদেশ গ্রহণ করেছে।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, টিমে একাধিক সদস্য থাকলে অবশ্যই পুলিশের বাইরে অথবা পুলিশের ভেতর থেকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ নেওয়া উচিত। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ক্রয় ও টেস্ট সংক্রান্ত বিষয়ে এক্সপার্ট নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে অবশ্যই নৈতিকভাবে দায়িত্ব পালন করা উচিত। আবার কেনাকাটার বিষয়বস্তু সংক্রান্ত অস্ত্র, যানবাহন বা লজিস্টিক বিষয়ে এক্সপার্টের প্রয়োজন আছে কিনা তাও বিবেচনা করা উচিত। কারণ মূল্যবান জিনিস বিদেশ থেকে ব্যবহার করতে না পারলে রাষ্ট্রের বিপুল ক্ষতি হবে।





