ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আস্থার আড়ালে শিশু সুরক্ষার প্রশ্ন, নীরবতা ও জবাবদিহির ঘাটতি

বন্ধ দরজার ওপারে; রাত যত গভীর হয় ভয় তত সন্নিকটে

Shahrier Islam Pallab
মেহেদী হাসান সজীব
প্রকাশিত: ১০:০২ অপরাহ্ন, ১২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:০২ অপরাহ্ন, ১২ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সন্ধ্যা নামলেই অন্য সব শহরের মতো নবাবগঞ্জের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। দোকানের শাটার নামে, রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে আসে। অথচ কোথাও কোথাও তখনও জেগে থাকে ছোট ছোট মুখ। কেউ ধর্মীয় পাঠ নেয়, কেউ কোরআন পড়ে, কেউ আবার বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে আবাসিক ব্যবস্থায় রাত কাটায়। সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর পেছনে অভিভাবকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা; সন্তান ভালো মানুষ হবে, নৈতিকতা শিখবে এবং নিরাপদ থাকবে। কিন্তু পরিবারের চোখের আড়ালে থাকা সেই শিশুটি কতটা নিরাপদ? এই প্রশ্ন কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। কোনো মাদরাসা, মন্দির কিংবা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করাও নয়। বরং প্রশ্নটি শিশু সুরক্ষার। কারণ শিশু নির্যাতনের ঝুঁকি কোনো একটি ধর্ম, প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যেখানে শিশু দীর্ঘ সময় পরিবারের বাইরে থাকে, সেখানে নিরাপত্তা, নজরদারি, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

একটি শিশুর নীরবতা; 

আরও পড়ুন: সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর ১৬৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

গালিমপুর এহসানিয়া আবাসিক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ত ১২ বছরের ছোট্ট শিশু। প্রতিবেদনের স্বার্থে তার নাম দেওয়া হলো ‘রিফাত’ (ছদ্মনাম)। রিফাতের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানে থাকার সময় সে এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যা তাকে ভয় ও অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দেয়।

ভুক্তভোগী শিশু রিফাত বলছিলো....

আরও পড়ুন: সুপ্রাচীন ইতিহাস সম্বলিত মিউজিয়াম 'সুন্দরবন সংগ্রহশালা'

প্রায় রাতে হুজুর আমার লগে খারাপ কাজ করতো। প্রথম প্রথম দুই রানে এসব করতো। পরে আমার পায়খানার রাস্তায়ও করতো। আমাকে ভয় দেখাতো যাতে এসব কথা কাউরে না কই। কইলে আমারে মারবে। যেদিন প্রথম আমার পায়খানার রাস্তায় হুজুর খারাপ কাজ করে সেদিন অনেক রক্ত বের হইছে। ব্যথায় কানছি। পরে হুজুর ঔষধের দোকান দিয়ে ব্যাথার ঔষধ আইনা দিছে। আর কইছে এই সপ্তাহে বাড়ি যাওন বন্ধ। যতদিন পায়খানার রাস্তার ঘাঁ শুকায়নি ততদিন তার পুরুষাঙ্গ মুখে দিয়ে করাইতো। আরও কয়েকজনের লগে এগুলো করছে। আমি দেখেছি। পরে তারাও এসে সুযোগ নিতে চাইতো।

আর যাইতে মন চায় না। তাই পড়ালেখা ছাইড়া দিছি। এহন কাম কাইজ করি।

রিফাত আর কিছু বলতে পারেনি। একটি শিশুর মুখ থেকে বের হওয়া কয়েকটি শব্দের পেছনে কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে এমন এক অভিজ্ঞতা, যা সে হয়তো কাউকে বলতে পারেনি বহুদিন। ভয়, লজ্জা, সামাজিক চাপ কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রভাব সবকিছু মিলিয়ে শিশু অনেক সময় নীরব থাকে। কিন্তু শিশুর এই নীরবতা কখনোই সম্মতি হতে পারে না।

বাড়িতে বলতে ভয় পেয়েছিল

শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনায় পরিবার অনেক সময় প্রথম প্রতিরোধের জায়গা হতে পারে। কিন্তু অনেক শিশু পরিবারের কাছেও বিষয়টি বলতে ভয় পায়। ঠিক যেমনটি পেয়েছিলো রিফাত। কখনো সে ভাবে তাকে বিশ্বাস করা হবে না। কখনো ভয় থাকে তাকে দোষ দেওয়া হবে। আবার কখনো প্রতিষ্ঠানের সম্মান কিংবা সামাজিক প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে পরিবারও ঘটনাটি গোপন রাখে। রিফাতের বাবা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—

কোনো সুস্থ্য মস্তিষ্কের মানুষের দ্বারা কখনো সম্ভব এগুলো করা? ছেলেডারে হাফেজ বানানের জন্য মাদ্রাসায় দিছিলাম পড়তে। এইটুকু পোলা আমার। পোলাডারে আধমরা বানাইয়া তারপর নিয়ে আসলাম। ওয় কখনো কিছু কয়নাই। যেদিন প্রথম কইলো আমি ওরে ধমক দিছি। পরে ওয় একদিন আমারে পায়খানার রাস্তা দেখায়। তা দেখে আর সহ্য করার মতো ছিলো না। পরে ওরে আমরা মাদরাসা থেকে নিয়া আসি। আর কোনো মাদরাসায় দেইও নাই। পড়ালেখা বন্ধ। এখন আমার লগে কাজকাইম করে। মাইনষের ভয়ে কাউরে কিছু কইতেও পারিনাই। আপনেই কন, এগুলো কি কওনের মতো কিছু? 

তার প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে জানা ছিলো না। না আছে এই সভ্য সমাজের কাছে। তবে এই নীরবতার কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি। কারণ একটি শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর যদি সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি ভয় পায়, তাহলে সুরক্ষা ব্যবস্থার কোথাও না কোথাও ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতি রয়েছে তাদের বোঝাপড়ার ক্ষেত্রেও।

নবাবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী উপজেলায় রয়েছে একাধিক মাদরাসা। তবে অনেক মাদরাসা এই তালিকায় নেই। প্রশাসন বলছে ব্যাঙের ছাতার মতো এসব মদরাসা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে রুম ভাড়া করে গজিয়ে উঠছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের সরকারি তালিকায় থাকা মানেই সেখানে আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে এমন নয়। আবার আবাসিক ব্যবস্থা থাকলেই প্রতিষ্ঠানটি অনিরাপদ এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। তবে কোনো অভিযোগ পেলে আমরা তা খতিয়ে দেখি। এর বাইরে প্রশাসনও কিছু করার ক্ষমতা রাখে না।

আমরা প্রশাসনের কাছে জানতে চাইলাম-

কোন প্রতিষ্ঠানে আবাসিক ব্যবস্থা আছে? কত শিশু সেখানে থাকে? রাতে তাদের দায়িত্বে কে থাকেন?কর্মীদের পরিচয় ও অতীত যাচাই করা হয় কি না ? শিশুর অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা আছে কি? নিয়মিত পরিদর্শন হয় কি?

কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের তথ্য থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের তথ্যই তাদের কাছে নেই। তাই এসব প্রশ্নের খোলাসা কোনো উত্তর তাদের কাছে নেই। এর প্রধান কারণ মাদ্রাসা করার বা পাঠদানের তেমন কোনো নিয়ম এখনো চালু হয়নি। যা প্রশাসনের আওতায় নেই বললেই চলে।  তবে কোনো কোনো শিশু বা তার পরিবার অভিযোগ করার সাপেক্ষে পদক্ষেপ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন। 

অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান: ঝুঁকি কোথায়?

নবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় উদ্যোগে ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারি বা বোর্ডের স্বীকৃত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বা স্বীকৃতি না থাকলেই সেখানে শিশু নির্যাতন হয় এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে আবাসিকভাবে শিশু রাখার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ একটি শিশুকে পরিবারের কাছ থেকে দূরে রেখে রাতযাপন করানো হলে প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি দায়িত্ব তৈরি হয়। তবে প্রতিষ্ঠান কতৃপক্ষ বা যারা একজন শিশুকে শিক্ষিত করবে তারাই যদি অমানবিক নির্যাতন করে তাহলে শিশু কোথায় যাবে? রক্ষকই যখন ভক্ষক হয় তখন একটি শিশুর অসহায় হয়ে পড়ারই কথা।