আলোর মুখ দেখছে বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে স্কেল

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৩:১৪ পূর্বাহ্ন, ১৮ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৪:৪১ পূর্বাহ্ন, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে বড় সুখবর দিয়েছে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। নতুন বেতন কাঠামো এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার।

ফলে আলোর মুখ দেখছে বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে স্কেল। এরই মধ্যে নবম পে স্কেলের খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটি। চূড়ান্ত করা নতুন এই কাঠামোতে বেতন সর্বোচ্চ প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: বিচারপতি আসাদুজ্জামান দুদকের নতুন চেয়ারম্যান, ডক্টর জাহাঙ্গীর আলম ও সাজ্জাদ হোসেন খান কমিশনার নিয়োগ

তবে সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুক প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। প্রায় ১১ বছর ধরে নতুন কোনো বেতন কাঠামো না থাকায় দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছেন বলে উল্লেখ করেন মুখ্য সচিব।

তাঁর ভাষ্য, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা কষ্টকর হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান সমন্বয়ের স্বার্থে এটি জরুরি হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন: আরও এক বছর মন্ত্রিপরিষদ সচিব থাকছেন ড. নাসিমুল গনি

খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে নবম পে স্কেলের আংশিক বাস্তবায়ন ধরা হবে। এরপর ধাপে ধাপে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সুবিধার জন্য নতুন যে পে স্কেল করা হয়েছে, সেটি অনেকটাই চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

গতকাল সোমবার সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

মাহদী আমিন বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সুবিধার জন্য নতুন যে পে-স্কেল করা হয়েছে, সেটা অনেকটাই চূড়ান্তের পথে।

তিনি বলেন, ইশতেহারে উল্লেখ করা কর্মসূচির বাইরেও সরকার বেশ কিছু কাজ করেছে। অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আগের সরকার লোপাট করে দিয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

মাহদী আমিন বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা ২০২২ সালের পর থেকে তাদের প্রাপ্য অর্থ পাননি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করার পর তিনি অর্থের ব্যবস্থা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় দুদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে ২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ–পরবর্তী ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

ভোটের কালি শুকানোর আগেই ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

এর আগে রবিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তারও জানান, সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে এটি ঘোষণা হতে পারে।

তিনি বলেন, পে স্কেল বিবেচনাধীন আছে এবং এ বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। এটা আমরা বাস্তবায়ন করব। এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। যেকোনো মুহূর্তে পে স্কেল ঘোষণা হতে পারে।

পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন নতুন পে স্কেল না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করে বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

এবিএম আব্দুস সাত্তার বলেন, সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় বছর পরপর পে স্কেল হওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘ সময় নতুন পে স্কেল না হওয়ায় প্রায় ১৮ লাখ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী চাপের মধ্যে রয়েছেন। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুক প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এতে ‘নবম পে স্কেল: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর’ শীর্ষ উপশিরোনামে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

গতকাল সোমবার প্রকাশিত বইয়ে বলা হয়েছে, প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। দুই ধাপে এটি বাস্তবায়িত হবে। এর মধ্যে প্রথম বছরে মূল বেতন এবং দ্বিতীয় বছরে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর হতে পারে।

সচিব কমিটির সব সদস্য চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সই করেছেন। এতে আরও বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেতন–ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, আইন সচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক রয়েছেন।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ২৭ জুলাই সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানকে প্রধান করে ২৩ সদস্য বিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠনের পর গত ২১ জানুয়ারি তারা সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন।

বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে জাকির আহমেদ খান কমিশন। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। আর সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তব্যে ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আমরা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিচ্ছি।

গত ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন, অথচ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

চলতি বছরের মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে পে স্কেলের বিভিন্ন দিক নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে পে কমিশন নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, পে কমিশনের অনেকগুলো দিক আছে। সবগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে। আজকে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে আরও আলোচনা প্রয়োজন। পরে আবার বৈঠক হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বছরের মধ্যেই নতুন পে স্কেল হবে। তবে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বিস্তারিত জানানো হবে।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বরাদ্দটি নেট পাবলিক সার্ভিস খাতে রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ খাতে ব্যয় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেড়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা।

কর্মকর্তাদের মতে, বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে ৪৪ হাজার কোটি টাকার এই বরাদ্দ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ে ব্যয় করা হবে।

এবার মূল বেতনে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুপারিশ করেছে নবম পে কমিশন।

২০১৫ সালে দুই ধাপে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ওই বছর সংশোধিত মূল বেতন এবং পরের বছর সংশোধিত ভাতা কার্যকর করা হয়।

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম পে স্কেল নিয়ে এর আগে সরকারের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে চলতি বছরের মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা আরও বেড়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

এর আগে অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে।

সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

জাকির আহমেদ খান কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল।

এখন সেই সুপারিশ ও পরবর্তী পর্যায়ের পর্যালোচনার ভিত্তিতে সচিব কমিটির চূড়ান্ত করা খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়। পরে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হওয়ায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে।

সেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়।