সাফল্যের পাল্লাই ভারী

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১:৪৭ পূর্বাহ্ন, ১৭ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৩:০৮ পূর্বাহ্ন, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের ইতিহাসে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ২১২টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেয় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। গতকাল ১৬ আগস্ট বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে।

এই সময়ে অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে স্বস্তির লক্ষণ দেখা গেলেও সংকটের গভীরতাও স্পষ্ট হয়েছে। শক্তিশালী প্রবাসী আয়, কিছুটা কমে আসা মূল্যস্ফীতি, সরকারি ব্যয়ে সংযম এবং সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো নতুন উদ্যোগ সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে সামনে এসেছে। বিপরীতে দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতের সংকট, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন: নারীদের অনার্স পর্যন্ত শিক্ষা ফ্রি করার সিদ্ধান্ত সরকারের: প্রধানমন্ত্রী

দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও অব্যবস্থাপনার যে ক্ষত রেখে গেছে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার, তার অনেকটাই এখনো অর্থনীতিকে বহন করতে হচ্ছে। প্রথম ছয় মাস যেকোনো সরকারের চরিত্র, অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস। ছয় মাসে সব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, আবার কয়েকটি দৃশ্যমান সাফল্য দিয়েও একটি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ বিচার করা যায় না।

রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক পরিবর্তন, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের কিছু পদক্ষেপ সরকারের অর্জনের তালিকায় রয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর এই ছয় মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতির সূচকে উন্নতিসহ সাফল্যের হার বেশি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতাও রয়েছে।

আরও পড়ুন: বেকারদের জলাশয় ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে: প্রধানমন্ত্রী

ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে অর্থনীতি, প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগসহ সকল সেক্টর ধ্বংস করেছে। পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সেক্টরও ধ্বংস করেছে। এর প্রভাব এখন পড়ছে।

এছাড়াও প্রবাসী আয় শক্তিশালী, মূল্যস্ফীতি আগের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কিছুটা নেমেছে, সরকার সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষিসহায়তায় নতুন কর্মসূচি নিয়েছে। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল, ব্যাংক খাতের সংকট গভীর, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত এবং সরকারের ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের একটি আলোচিত দিক হলো তার তুলনামূলক বিনয়ী ও কর্মমুখী উপস্থিতি। নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ, সাধারণ পোশাক-পরিচ্ছদ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ততা ক্ষমতাসীন রাজনীতিতে একটি ভিন্ন বার্তা তৈরি করেছে। অবশ্যই কোনো প্রধানমন্ত্রীর পোশাক বা ব্যক্তিগত আচরণ দিয়ে রাষ্ট্রের সাফল্য পরিমাপ করা যায় না; কিন্তু নেতৃত্বের আচরণ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি প্রতীকী প্রভাব ফেলে।

সরকারের ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের প্রবণতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয়, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, দুর্বল নজরদারি এবং মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ রাষ্ট্রের অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। ব্যয় কমানো মানেই উন্নয়ন কমানো নয়। বরং সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত—অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়ানো। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, কৃষি, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিতে ব্যয় বাড়াতে হলে অপচয় বন্ধ করতেই হবে।

সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে বেশ কিছু নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা সম্প্রসারণ, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, সিঙ্গেল উইন্ডো এবং বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সংস্কারের উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও কিছুটা স্বস্তি এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগ উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।

ছয় মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক উদ্যোগ ফ্যামিলি কার্ড। মার্চে এর পাইলট কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ১৪টি ইউনিটে ৬ হাজার ৫০০ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করে কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়; দীর্ঘমেয়াদে দুই কোটি পরিবারকে এর আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। কার্ডধারী নারীপ্রধান পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা পাওয়ার কথা।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন রয়েছে—‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। সামাজিক নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন্ন ভাতা থেকে একটি সমন্বিত পরিবারভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের এই চেষ্টা সফল হলে এটি বাংলাদেশের কল্যাণরাষ্ট্রের কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে।

এছাড়াও কৃষক কার্ড, কৃষকদের ন্যায্য মূল্যে সার, বীজসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণও রয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মেয়েদের দ্বাদশ পর্যন্ত লেখাপড়া ফ্রি, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের পোশাক বিতরণ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া নতুন কুঁড়ি খেলোয়াড়দের ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশ থেকে খেলোয়াড়সহ শিল্পীদের নানাভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।

তবে মূল্যস্ফীতি এ মুহূর্তে সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা। জুলাইয়ে হার কিছুটা কমলেও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। এটিকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বলা যায় না। দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, সঞ্চয়ের মূল্য ক্ষয় হয়েছে এবং খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ব্যয় বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ দাম কমা নয়; দাম আগের তুলনায় ধীরগতিতে বাড়ছে মাত্র। ফলে নীতিনির্ধারকদের আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কঠোর মুদ্রানীতি প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু শুধু উচ্চ সুদের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমাতে গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চাপ বাড়বে। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির বড় অংশ খাদ্য সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, জ্বালানি খরচ ও বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত।

বহিঃখাতে প্রবাসী আয় কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু রপ্তানির দুর্বলতা এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স স্বস্তি দেয়, কিন্তু উৎপাদনশীলতা, রপ্তানিবৈচিত্র্য এবং বিনিয়োগের দুর্বলতার বিকল্প নয়। দীর্ঘ মেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি টেকসই করতে হলে পণ্য ও সেবা রপ্তানির ভিত্তি বিস্তৃত করতে হবে।

কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে। স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও আইসিটির সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বড় শ্রমশক্তির জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। শ্রমঘন উৎপাদন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং বাস্তব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন।

অর্থনীতির সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, মানুষের প্রকৃত আয় ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান দিয়ে বিচার করা উচিত। বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্মেলন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর প্রণোদনা বা নতুন প্রতিষ্ঠান কম নেই। কিন্তু উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নেন বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ কতটা নির্ভরযোগ্য, ঋণের খরচ কত, বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যায় কি না, কর ও শুল্কের নিয়ম কতটা পূর্বানুমানযোগ্য, অনুমোদনে কত সময় লাগে—এসবই বিনিয়োগ নির্ধারণ করে। দেশীয় উদ্যোক্তারাই যখন নতুন বিনিয়োগে সতর্ক, তখন শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচার যথেষ্ট হবে না। বিনিয়োগের সমস্যা আসলে আস্থার সমস্যা, আর সেই আস্থা তৈরি হয় নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রতিষ্ঠানের আচরণ থেকে।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির নতুন চাপের মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। তেল সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় ও আমদানি খরচ নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দেশে এর প্রভাব সরাসরি পড়ে। জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি গ্যাসের ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদনে চাপ তৈরি করেছে। ফলে সরকারের ছয় মাসের হিসাব করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সংকট সামলানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

জ্বালানিসংকট এই দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়েছে। এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, গ্যাসের ঘাটতি এবং সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার ঘটনা দেখিয়েছে যে বাংলাদেশের জ্বালানিব্যবস্থায় স্থিতিস্থাপকতা সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বা সরবরাহে একটি ধাক্কা দ্রুত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগে প্রভাব ফেলে। সরকার জরুরি আমদানি, ঋণ ও ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলাতে পারে, কিন্তু এগুলো সময় কেনে মাত্র। মূল সমস্যা রয়ে যায়।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, আমদানির উৎসবৈচিত্র্য, শক্তিদক্ষতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং গ্রিড উন্নয়নে দ্রুত অগ্রগতি না হলে একই সংকট বারবার ফিরে আসবে। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণেও একটি সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন। দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে কম মূল্য রাখা আর্থিকভাবে টেকসই নয়। আবার সরবরাহের মান না বাড়িয়ে বারবার দাম বাড়ানোও গ্রহণযোগ্য নয়। মূল্য সমন্বয় হলে তা ধাপে ধাপে, পূর্বঘোষিত এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি জ্বালানিকৌশলের অংশ হওয়া উচিত। শিল্প এমনকি তুলনামূলক বেশি মূল্যও সামলাতে পারে, যদি সরবরাহ নির্ভরযোগ্য হয়। অনিশ্চিত মূল্য ও অনিশ্চিত সরবরাহ একসঙ্গে থাকলে বিনিয়োগের হিসাবটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

রাজস্ব নীতিতে বাস্তবতার ঘাটতি স্পষ্ট। প্রায় প্রতিবছর উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, পরে তা অর্জিত হয় না। নতুন বাজেটেও বড় বৃদ্ধির প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, করের আওতা বাড়ানো এবং করছাড় কমানোর মতো সংস্কার সময়সাপেক্ষ। অবাস্তব লক্ষ্য দিয়ে ব্যয়ের কাঠামো দাঁড় করালে শেষ পর্যন্ত ঋণ বাড়ে অথবা উন্নয়ন ব্যয় কাটতে হয়। করভিত্তি অবশ্যই বাড়াতে হবে, তবে সহজে ধরা যায়, এমন ছোট ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি চাপ দিয়ে নয়। বড় কর ফাঁকি, অঘোষিত সম্পদ, উচ্চ আয়ের পেশাজীবী এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একই কঠোরতা দরকার।

ব্যাংক খাতের ক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকি, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা এবং পুনঃপুন ঋণ পুনঃতফসিল বর্তমান সংকটকে গভীর করেছে। কিছু ব্যাংকে পুনর্গঠন বা পুনর্মূলধন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু জনগণের অর্থ ব্যবহারের আগে সম্পদের প্রকৃত মান যাচাই, দায়ী পরিচালকদের জবাবদিহি, খেলাপি ঋণ উদ্ধারের পরিকল্পনা এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা প্রয়োজন।

অন্যথায় সংস্কারের নামে পুরোনো ক্ষতির দায় করদাতার ওপর স্থানান্তর হবে। এ পরিস্থিতির মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ এসেছে। এগুলোর সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত রাখা দরকার। ফ্যামিলি কার্ড সামাজিক সুরক্ষাকে আরও সমন্বিত করতে পারে এবং নারীর হিসাবে সরাসরি অর্থ দেওয়া ইতিবাচক ফল দিতে পারে। কিন্তু বড় আকারে সম্প্রসারণের আগে পাইলটের ফলাফল মূল্যায়ন জরুরি। কারা প্রকৃত দরিদ্র, কারা বাদ পড়ছেন, পুরোনো ভাতাগুলো কীভাবে সমন্বিত হবে, একজন একই সঙ্গে একাধিক সুবিধা পাচ্ছেন কি না এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে হবে, এসবের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ছাড়া দ্রুত সম্প্রসারণ করলে অপচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব দুটিই বাড়তে পারে।

কৃষক কার্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সার, বীজ, ঋণ, বিমা, যন্ত্রপাতি, আবহাওয়ার তথ্য ও বাজারদর একটি পরিচয়ের মাধ্যমে পাওয়া গেলে কৃষকের লেনদেন খরচ কমতে পারে। কিন্তু কার্ডকে যেন সমস্যার সমাধান হিসেবে অতিরঞ্জিত না করা হয়। সার যথাসময়ে না এলে, কৃষিঋণ প্রকৃত চাষির কাছে না পৌঁছালে বা বাজারে কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে একটি ডিজিটাল পরিচয় খুব বেশি পরিবর্তন আনবে না। আবার জমির মালিকানার তথ্যের ওপর বেশি নির্ভর করলে বর্গাচাষি ও ভূমিহীন প্রকৃত কৃষক বাদ পড়ার ঝুঁকি আছে। প্রযুক্তির চেয়ে সেবার গুণমান তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সামনের ঝুঁকিগুলোও কম নয়। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘ হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। রপ্তানি দুর্বল থাকলে বৈদেশিক মুদ্রায় চাপ তৈরি হবে। ব্যাংক পুনর্গঠনের ব্যয় বাজেটে আসতে পারে। কঠোর মুদ্রানীতি বিনিয়োগকে আরও কিছু সময় দুর্বল রাখতে পারে। এর সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ুজনিত খাদ্য ও কৃষিঝুঁকি যুক্ত হবে।

স্বল্প মেয়াদে সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতিকে আরও নিচে আনা, তবে উৎপাদনকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংকুচিত না করা। খাদ্য, জ্বালানি ও সারের মজুত এবং সরবরাহের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। নির্বিচার মূল্য ভর্তুকির পরিবর্তে যাচাই করা দরিদ্র ও নিম্নমধ্য আয়ের পরিবারকে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা বেশি কার্যকর হতে পারে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে হাসপাতাল, সেচ, সার, খাদ্য সংরক্ষণ এবং রপ্তানিশিল্পের অগ্রাধিকার স্পষ্ট করতে হবে।

মধ্য মেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজির উৎসবৈচিত্র্য, শিল্পে শক্তিদক্ষতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং গ্রিড আধুনিকায়ন একসঙ্গে এগোতে হবে। করছাড়ের পূর্ণ হিসাব প্রকাশ করে অকার্যকর সুবিধা প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। ব্যাংক সংস্কারকে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। আর ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও অন্যান্য সামাজিক কর্মসূচিকে একটি নির্ভরযোগ্য সামাজিক নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত।

সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও মাঠ প্রশাসনে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘মব সংস্কৃতি’ বন্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এসব পুরোপুরি বন্ধ না হলেও অনেকটা কমেছে। এটাও বর্তমান সরকারের সফলতা মনে করছেন অনেকে।

সরকারের হিসাবে, প্রথম ছয় মাসে ২ কোটি ২২ লাখের বেশি চারা রোপণ করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ২ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের তথ্য দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান সরকারের আন্তরিক চেষ্টায় মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার আবার খুলে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। দেশটিতে দীর্ঘদিন কর্মী পাঠানো বন্ধ ছিল।

সবশেষে কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে। স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও আইসিটির সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বড় শ্রমশক্তির জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। শ্রমঘন উৎপাদন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং বাস্তব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন।

অর্থনীতির সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, মানুষের প্রকৃত আয় ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান দিয়ে বিচার করা উচিত।

সরকার গঠনের পর প্রথম ৬ মাসে বিএনপি সরকারের অধিকাংশ নির্বাচনি অঙ্গীকার ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, কোথাও ১০০ শতাংশ, আবার কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।

গত শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন রিজভী। সরকারের ছয় মাসের অর্জনের বিস্তারিত পরিসংখ্যান শিগগির প্রকাশ করা হবে বলেও জানান রিজভী।

তিনি বলেন, সরকারের ছয় মাসের অর্জনের লিখিত বিবরণ বা বুকলেট সাংবাদিকদের হাতে দেওয়া হবে। সেখানে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচির বিস্তারিত পরিসংখ্যান থাকবে।

রিজভী বলেন, ছয় মাসের যে লক্ষ্য, সে লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সবগুলোই পূরণ হয়েছে। কোথাও হয়তো ১০০ শতাংশ না হলেও সেখানে ৯৫ শতাংশ, ৯০ শতাংশ আছে। কোথাও ১০০ শতাংশ হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে সময় লেগেছে। পরবর্তী ছয় মাসে সরকারের কর্মসূচি আরও জোরালো ও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন হবে বলেও প্রত্যাশা রিজভীর।