হামে মৃত শিশুদের ৮২% প্রথম ছয় মাস পর্যাপ্ত বুকের দুধ পায়নি

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮:৩৮ পূর্বাহ্ন, ২০ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৮:৩৮ পূর্বাহ্ন, ২০ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া শিশুদের ৮২ শতাংশই জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পর্যাপ্ত মায়ের বুকের দুধ পায়নি। একই সঙ্গে হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছিল। এর মধ্যে ১২ শতাংশ ছিল তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত এবং ৫৩ শতাংশের ছিল মাঝারি মাত্রার অপুষ্টি।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সভায় গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর কাজে আস্থা বেশিরভাগ নাগরিকের

সভায় গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র ডিরেক্টর ড. মুস্তাফিজুর রহমান। শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম এবং আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী।

গবেষণায় চলতি বছরের মে মাস থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত অথবা হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩৪১ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি এখনো চলমান রয়েছে।

আরও পড়ুন: হঠাৎ উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে নানান রহস্য

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া শিশুদের ৪৩ শতাংশের বয়স ছিল ৩ থেকে ৯ মাসের মধ্যে। আক্রান্ত শিশুদের ৩৮ শতাংশ জন্মের পর প্রথম ছয় মাস মায়ের বুকের দুধে সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে পারেনি। তবে যারা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে, তাদের মধ্যে পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পাওয়ার হার ছিল অনেক বেশি। এই শিশুদের ৮২ শতাংশ প্রথম ছয় মাস পর্যাপ্ত মায়ের দুধ পায়নি।

শিশুদের পুষ্টিগত অবস্থাও গবেষণায় গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৬৫ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছিল। এর মধ্যে ১২ শতাংশ তীব্র এবং ৫৩ শতাংশ মাঝারি মাত্রার অপুষ্টির শিকার ছিল।

গবেষকেরা শিশুদের বয়স ও টিকা গ্রহণের তথ্য অনুযায়ী ৩৪১ জনকে চারটি ভাগে বিভক্ত করে তথ্য বিশ্লেষণ করেন। টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি এমন ৯ মাসের কম বয়সি ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়। অর্থাৎ এই দলে শনাক্তের হার ছিল ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

অন্যদিকে, টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার পরও টিকা না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ হার ৯৭ শতাংশ।

এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জনের শরীরে হাম পাওয়া গেছে, যার হার ৯২ শতাংশ। আর সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শনাক্তের হার ৭৬ শতাংশ।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ফলাফলকে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদের ৭৬ শতাংশ হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ গবেষণাটি সাধারণ জনগণের ওপর নয়, বরং হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নির্দিষ্ট শিশুদের ওপর পরিচালিত হয়েছে। তাই দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ সন্দেহভাজন শিশুর মধ্যে ১৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষণায় বলা হয়েছে, টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি এবং ব্যক্তিভেদে অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণ সংক্রমণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

আক্রান্ত শিশুদের শরীরে শনাক্ত হওয়া হাম ভাইরাসের ধরনও গবেষণায় পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, শনাক্ত সব হাম ভাইরাসই বি৩ সাবক্লেডের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শনাক্ত হওয়া বি৩ ভাইরাসের সঙ্গে এসব ভাইরাসের মিল রয়েছে।

গবেষকেরা আরও জানিয়েছেন, ভাইরাসের এইচ প্রোটিনের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করতে সক্ষম এপিটোপ অঞ্চলে চারটি পরিবর্তন বা মিউটেশন পাওয়া গেছে।

হাম উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু

এদিকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুধবারের হাম পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ১৮ জনের মধ্যে ৮৭ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে নিশ্চিত হাম আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৭৬ জনে।

অন্যদিকে, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৯৩১ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। ১৫ মার্চ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত দেশে মোট ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭১১ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে।

এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২২ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ৯৯ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৮২৩ জনের।