হঠাৎ হকার উচ্ছেদ অভিযানে রণক্ষেত্র মিরপুর
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অন্তত তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া পুলিশের একটি গাড়ি ও উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবহৃত একটি ভেকু ভাঙচুর করা হয়েছে।
এ ঘটনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাজধানীর মিরপুর১০ এলাকায় ডিএনসিসির ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানে সমন্বয়ের অভাব ছিল। বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: মিরপুরের ঘটনাবলী সংক্রান্ত মাহবুব আলম শেখের সংবাদ সম্মেলন
এদিকে, রাজধানীর মিরপুরের হোপ মার্কেটে উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে অবহিত না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ওই এলাকার সংসদ সদস্য, জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত না করে উচ্ছেদ অভিযান আমাকে বিস্মিত করেছে। সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের তাগিদ দেন তিনি।
আরও পড়ুন: উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ফ্ল্যাটের আইডি প্রদান সংক্রান্ত ১১তম লটারি অনুষ্ঠিত
এছাড়া, মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, আমার লাশের ওপর দিয়ে হলেও ফুটপাত দখলমুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে রাজধানীর মিরপুরে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান অব্যাহত থাকবে। মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও পুলিশের উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকারদের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করতে এই অভিযান চালানোর সময় হকারদের বাধার মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ।
গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে মিরপুর-১৪ পর্যন্ত সড়কে অবৈধ দোকানপাট ও হকার উচ্ছেদে যৌথ অভিযান শুরু হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরের হোপ মার্কেটের সামনে উচ্ছেদ চলাকালে একটি বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে উপস্থিত হকার ও ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ব্যবসায়ীরা বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে উচ্ছেদ অভিযানের সময় রোলার দিয়ে দোকান ভাঙতে গেলে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আর এই আগুনে বাইতুল কুদ্দুস জামে মসজিদের নিচে থাকা ৬-৭টি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। উত্তেজিত হকাররা সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশের ওপর লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। হকারদের সংখ্যার কাছে পুলিশ একপর্যায়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল বা কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। হামলাকারীরা সিটি কর্পোরেশনের ৩টি ময়লার গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং একটি এক্সকাভেটর (ভেকু গাড়ি) ও পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান ভাঙচুর করে। এই সহিংসতার ঘটনার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরাও হকারদের হামলার শিকার হন এবং একটি বেসরকারি টেলিভিশনের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম উচ্ছেদ অভিযান চলমান থাকার ঘোষণা দেন। যারা বাধা ও গাড়িতে আগুন দিয়েছে তাদের আইনের আওতায় আনার হুশিয়ারি দেন। বেলা আড়াইটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আবারও উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। অতিরিক্ত পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও আনসার সদস্যদের উপস্থিতিতে এই অভিযান পুনরায় শুরু হয়। মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার হকার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে ঘটনাস্থলে তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করতে যাওয়া সংবাদকর্মীদের সঙ্গেও হকারদের কয়েকজনের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে হেনস্তা ও তাদের ওপর চড়াও হন হকারেরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, ঘটনাস্থলে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের সংখ্যা পুলিশের তুলনায় বেশি ছিল। একপর্যায়ে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপের মুখে পুলিশ সদস্যদের কিছুটা পিছু হটতে দেখা যায়। মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল, তদন্তের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় ডিএনসিসির ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানে সমন্বয়ের অভাব ছিল। বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আয়োজিত সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে একথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। সেখানে সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জেনেছি। চাঁদাবাজদের তালিকা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চাঁদাবাজদের তালিকা করা পুলিশের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। এ ধরনের তালিকা পুলিশের কাছে সবসময়ই থাকে। একইভাবে সন্ত্রাসী, অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী ও অস্ত্রধারীদের তালিকাও পুলিশের কাছে রয়েছে এবং সেগুলো নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। নতুন করে কোনো তালিকা করা হয়েছে এমন বিষয় নেই বলেও জানান তিনি। স্থানীয় এমপিকে না জানিয়ে উচ্ছেদ অভিযান আমাকে বিস্মিত করেছে: জামায়াত আমির— প্রশাসন যদি কোনো অবস্থায় ন্যায়বিচারের পথ ছেড়ে জালিমের ভূমিকা পালন করে, তবে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না এবং জনগণ তা রুখে দাঁড়াবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
উপযুক্ত বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হলে সংঘাত এড়ানো সম্ভব হতো। স্থানীয় এমপিকে না জানিয়ে উচ্ছেদ অভিযান আমাকে বিস্মিয় প্রকাশ করেন তিনি। সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের তাগিদ দেন তিনি। বুধবার রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষ ও উদ্ভূত পরিস্থিতি পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা চাই না আমাদের প্রশাসন অতীত ফ্যাসিবাদী আমলের মতো অন্যায়ের পক্ষ নিক। সংগত ও ভালো কাজে প্রশাসন সবসময় জনগণের সহযোগিতা পাবে। কিন্তু প্রশাসন যদি জালিমের ভূমিকা পালন করে, তবে আমরা তা রুখে দাঁড়াবো। এ সময় তিনি প্রশাসনকে ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন’ নীতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করার আহ্বান জানান।
উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন ও চলাচলের উপযোগী রাখা যেমন নাগরিক দায়িত্ব, তেমনি ফুটপাতের প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের কর্তব্য।
ফুটপাত ঘিরে দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজির কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, একদল অসাধু চক্র মাসের পর মাস এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক হারে চাঁদা আদায় করে আসছে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপর আর্থিক বোঝা বাড়ছে।
তিনি স্পষ্টভাবে জানান, শহর কিংবা দেশে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি, দখলদারি ও মাদকের ব্যবসা বরদাশত করা হবে না। যারা এসব অপরাধে জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি। উচ্ছেদ অভিযানে সংঘর্ষে হতাহত এবং সরকারি ও স্থানীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে দুঃখ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান সবাইকে ধৈর্য ধারণ ও শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে এবং আলোচনার ভিত্তিতে একটি মানবিক ও বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি। আমার লাশের ওপর দিয়ে হলেও ফুটপাত দখলমুক্ত হবে: ডিএনসিসি প্রশাসক— আমার লাশের ওপর দিয়ে হলেও ফুটপাত দখলমুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। তিনি বলেন, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে রাজধানীর মিরপুরে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বুধবার মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, নগরবাসীর সুবিধা নিশ্চিত করতে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আজও মিরপুর-১০ এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখলে রাখা ব্যক্তিরা এবং তাদের ইন্ধনে সিটি করপোরেশনের পরিবহন, সাংবাদিক ও কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ফুটপাত দখল ও হামলার পেছনে ‘ফ্যাসিবাদের আমলের সুবিধাভোগী ও তাদের দোসররা’ জড়িত। ঘটনাস্থলে অরাজকতা সৃষ্টির অভিযোগ তুলে প্রশাসক বলেন, ‘আজ পরিকল্পিতভাবে ফ্যাসিবাদের দোসররা মসজিদে আগুন দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশ ও ডিএনসিসির পক্ষ থেকে পৃথক মামলা করা হচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে।
শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, স্থানীয় সাধারণ জনগণের প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। আমি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি, নগরসেবার জন্য আমার প্রিয় নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত উদ্ধারের যে কর্মসূচি রয়েছে, তা চলমান থাকবে। পরিদর্শনকালে ডিএনসিসি প্রশাসকের সঙ্গে মিরপুর জোনের বিভাগীয় উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার, কাফরুল ও মিরপুর থানার ওসি, ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মইনুল হাসান এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েসসহ সিটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।





