সাবেক উপদেষ্টার প্রভাবে মিল্ক ভিটায় আনোয়ারের দুর্নীতির তদন্ত যাচ্ছে দুদকে
৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের বিতর্কিত সাবেক প্রভাবশালী উপদেষ্টার প্রভাবে মিল্ক ভিটায় ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও আর্থিক ক্ষতি সাধনের অভিযোগে অপসারিত সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। মিল্ক ভিটা কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠাচ্ছে।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই ব্যক্তি রাতারাতি ছাত্রলীগ নেতা থেকে হয়েছেন ‘জুলাই যোদ্ধা’। এরপর বিএনপি পরিবারের সদস্য। এভাবেই মিল্ক ভিটায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আনোয়ার হোসাইনের বিরুদ্ধে। এলজিআরডি ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সাবেক প্রভাবশালী উপদেষ্টার নাম ব্যবহার করে দখলে নিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি থেকে টেন্ডার—সবখানেই ছিল তার দাপট। এমন একাধিক অভিযোগের পর শুরু হয় অভ্যন্তরীণ তদন্ত। উঠে আসে নানা অনিয়মের তথ্য। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর সহ-সভাপতির পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয় সরকার।
আরও পড়ুন: অপতথ্য ঠেকাতে সাংবাদিকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান তথ্য প্রতিমন্ত্রীর
জানা গেছে, গত ৬ আগস্ট সমবায় অধিদপ্তরের আদেশে এ অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর আগে ২৯ জুলাই মিল্ক ইউনিয়নের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। লিখিত প্রমাণ দেখে সদস্যরা তার ওপর অনাস্থা জানান।
অভিযোগে জানা যায়: মিল্ক ভিটার ৩৫০ মেট্রিক টন চিনির টেন্ডারেও অনিয়মের অভিযোগ। সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতি কেজি ৯৯ টাকা দর দিয়েছিল। কিন্তু তাকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কাজ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয় চতুর্থ সর্বোচ্চ দরদাতাকে। তার দর ছিল প্রতি কেজি ১২২ টাকা ৮০ পয়সা। এতে মিল্ক ভিটার ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৮৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে শিক্ষা ও আর্থিক স্বাবলম্বিতা জরুরি: রিজভী
আনোয়ারের বিরুদ্ধে শুধু টেন্ডার নয়, নিয়োগ-বদলি ও পদোন্নতির নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ভাঙিয়ে চাকরি ও বদলি করিয়ে দেওয়ার কথা বলতেন তিনি। বিনিময়ে নিতেন মোটা অঙ্কের টাকা।
জামালপুরের মাদারগঞ্জের সরদারপাড়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি সাধন গোপের অভিযোগও একই ধরনের। গত ২০ জুলাই মিল্ক ভিটা চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া অভিযোগে তিনি বলেন, মিল্ক ইউনিয়নের সদস্যপদ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে আনোয়ার পাঁচ লাখ টাকা নেন। সদস্য করতে না পারায় পরে দুই লাখ টাকা ফেরত দেন। বাকি তিন লাখ টাকা এখনো ফেরত দেননি। অর্থ লেনদেনের প্রমাণও তিনি আগামীর সময়কে দিয়েছেন।
ভুয়া সমবায়ী পরিচয়:
আনোয়ারের সমবায়ী পরিচয় নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি প্রকৃত কোনো দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায়ী ছিলেন না। পদ পাওয়ার জন্য ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করেন। প্রথমে ময়মনসিংহের ফুলপুরের একটি সমিতির সদস্য পরিচয় দেন। পরে একইভাবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর একটি সমিতির সদস্য হওয়ার কাগজ ব্যবহার করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ছাত্রলীগ থেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’:
আনোয়ারের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন বলে জানিয়েছেন মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিল। বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বদলে ফেলেন পরিচয়। নিজেকে দাবি করেন ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও সমন্বয়ক। এরপর বিএনপি পরিবারের সদস্য পরিচয়ে গত ২৩ এপ্রিল বাগিয়ে নেন মিল্ক ইউনিয়নের সহ-সভাপতির পদ।
সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ কয়েকজনের নাম ভাঙিয়ে মিল্ক ভিটায় প্রভাব বিস্তার করতেন আনোয়ার। বিষয়টি সমবায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন মিল্ক ইউনিয়নের সাতজন সদস্য।
দুদক-এনবিআর ও গোয়েন্দা তদন্তের সুপারিশ:
অভিযোগের পর শুধু পদ থেকে সরিয়েই থামেনি মিল্ক ভিটার বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটি। আনোয়ারের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে দুদক, এনবিআর ও গোয়েন্দা সংস্থাকে তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিল বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর আনোয়ারের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আসে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তাকে অপসারণের জন্য নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। তার বিরুদ্ধে দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আনোয়ার হোসাইন। তিনি বলেন, তিনি ষড়যন্তের শিকার। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল না। পরিবারের সদস্যরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।





