মায়ের ডাক’ ও ‘আমরা বিএনপির পরিবার’ আয়োজিত অনুষ্ঠান
গুম হওয়া স্বজনদের কাঁন্না ও আর্তনাদ ফুঁপিয়ে কাঁদলেন তারেক রহমান
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে কাছে পেয়ে স্বজনরা তুলে ধরেছেন গুমের শিকার হওয়া তাদের সেই প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি। কেউ জানাচ্ছিলেন বাবাকে হারিয়ে কী নিরানন্দ জীবন কাটছে তাদের। সন্তানহারা মা তুলে ধরছিলেন, নিজের প্রিয় সন্তানকে তারা আর দেখতে পান না অনেক অনেক বছর, তারা কোথায় হারিয়ে গেল!
গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায়’ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘মায়ের ডাক’ ও ‘আমরা বিএনপির পরিবার’। এ সময় তারেক রহমানকে জড়িয়ে ধরে গুম হওয়া সন্তানের মা আর্তনাদ করেন। তখন উপস্থিত সকলের চোখের পানি টলমল করতে দেখা গেছে।
আরও পড়ুন: ঋণ খেলাপির অভিযোগে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল
রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সভায় গুম হওয়া এক সন্তানের মাকে তারেক রহমানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে দেখা যায়। এসময় কাঁদতে কাঁদতে আওয়ামী সরকারের আমলে গুম হওয়া এক বাবার কন্যা বলেন, ‘এটা তো অঙ্ক না যে, আমরা ধরে নেব আমাদের বাবারা মৃত!
২০১৩ সালে ২ ডিসেম্বর গুম হওয়া সোহেল হোসেনের মেয়ে শাফা হোসেন বলেন, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাবার অপেক্ষায় আছি, কিন্তু আজও বাবার মুখটা দেখতে পারিনি। আমরা আমাদের বাবাকে ফেরত চাই। একই বছরের ৪ ডিসেম্বর গুম হওয়া কায়সার হোসেনের কন্যা লামিয়া আক্তার মিম বলেন, আমি জানি না ‘বাবা’ জিনিসটা আসলে কী। যদি জানতাম, বাবাকে আর কোনোদিন দেখতে পাবো না, তাহলে সেদিন শক্ত করে বাবাকে জড়িয়ে ধরতাম। গুমের শিকার পারভেজ হোসেনের মেয়ে আদিবা ইসলাম হৃধি গুম কমিশনের উদ্দেশে বলেন, গুম কমিশন বলে, ধরে নিন ওরা গুম... ওরা মৃত। কেন এটা কি হাতের অঙ্ক যে আমরা ধরে নেব আমাদের বাবারা আর নেই? একটা দল করা কোনো অপরাধ না। দল সবাই করে। এর জন্য এটা কেমন বিচার এই বাংলাদেশে? বক্তব্যের একপর্যায়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের কাছে বাবাকে খুঁজে দেওয়ার আকুতি জানায় হৃধি। আমি তারেক রহমান চাচ্চুর কাছে আশা করি যে আমাদের বাবাদের খুঁজে দেবেন। এই বাংলাদেশের মাটিতে বিচার করবেন এই গুমের। স্বজনদের এসব আর্তনাদ স্পর্শ করে তারেক রহমানকেও। মঞ্চেই বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখা যায় তাকে।
আরও পড়ুন: খালেদা জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চাকারী রাষ্ট্রনায়ক: মঈন খান
এ সময় উপস্থিত ছিলেন-বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদীর লুনা, সহ-গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন এবং ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বহু সন্তান আজও অপেক্ষায় আছে, তাদের গুম হয়ে যাওয়া বাবা একদিন ফিরে এসে দরজায় কড়া নাড়বেন। বহু মা এখনো আশায় আছেন, হারিয়ে যাওয়া সন্তানটি আবার ‘মা’ বলে ডাকবেন। এই অপেক্ষা রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় দায়। তিনি বলেন, গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর কষ্ট এমন গভীর যে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তারেক রহমান গণতন্ত্রে বিশ্বাসী প্রত্যেক মানুষকে সজাগ থাকতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিতর্ক তৈরি করে গণতন্ত্রের পথকে যাঁরা আবার নষ্ট বা ব্যাহত করার চেষ্টা করছেন, তাঁরা যেন সফল না হন। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমাদের হাজার হাজার নেতা–কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, অনেককে হত্যা করা হয়েছে, হাজারেরও বেশি মানুষকে গুমের শিকার হতে হয়েছে। আজ এখানে গুম হওয়া সেই মানুষগুলোর কিছু পরিবারের সদস্য উপস্থিত আছেন। আবার অনেক পরিবার এখনো অপেক্ষায় আছেন। সীমাবদ্ধতা থাকলেও গুম হওয়া মানুষকে উদ্ধারে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন বলে জানান বিএনপির চেয়ারম্যান। দলীয় অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, কৈৗশলের নামে গুপ্ত কিংবা সুপ্ত বেশ ধারণ করেননি বিএনপির কর্মীরা। আমি বিশ্বাস করি, দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে দলের নেতা–কর্মীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের আপসহীন ভূমিকা রাখতে পারেন—সেই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা অপপ্রচার চালিয়ে কেউ এই দলকে দমন করে রাখতে পারবে না।
নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, সম্প্রতি তাদের বিতর্কিত ভূমিকা দেখা গেছে। তারপরও রাজনৈতিক একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ধৈর্যের পরিচয় দিতে চায়।
গুম ও হত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘৭১ সালের যাঁরা শহীদ হয়েছেন এ দেশকে স্বাধীন করার জন্য, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, বিগত ১৬ বছরে যাঁরা গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন, ২৪-এর আন্দোলন ও ৫ আগস্টের আন্দোলনে যাঁরা শহীদ হয়েছেন—প্রতিটি অন্যায়ের বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগামী দিনে অবশ্যই বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দরকার। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে শহীদ ও গুমের শিকারদের আত্মত্যাগ যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মরণীয় থাকে, সে লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে শহীদ পরিবারদের নামে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনার নামকরণ করা হবে বলে জানান তারেক রহমান।





