৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২

ফজলুল হক হলের বৈঠকেই চূড়ান্ত হয় ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি

Any Akter
আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: ৪:৩৩ অপরাহ্ন, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১১:০০ পূর্বাহ্ন, ১১ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ৩ ফেব্রুয়ারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক ঐতিহাসিক বৈঠক। এই বৈঠকেই ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনকে রক্তাক্ত কিন্তু অবিস্মরণীয় এক পর্যায়ে নিয়ে যায়।

তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাঙালি ছাত্রসমাজ ও রাজনৈতিক কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালের শুরুতে এসে নতুন করে গতি পায়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্র।

আরও পড়ুন: রিফাইন্ড থেকে নতুন করে রিকনসিলিয়েশন

এই প্রেক্ষাপটে ৩ ফেব্রুয়ারি ফজলুল হক হলে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন এবং ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ এবং একটি সমন্বিত কর্মসূচি ঘোষণা করা।

দীর্ঘ আলোচনার পর বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, ২১ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে সর্বাত্মক প্রতিবাদ দিবস পালিত হবে। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সেদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক কর্মসূচি এবং রাজপথে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানো হবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আরও পড়ুন: আবারো কঠোর অবস্থানে বিএনপি, এমপি মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশনা

একই সঙ্গে বৈঠকে আন্দোলনকে আরও সংগঠিত ও জোরদার করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ছাত্রসমাজকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয় সম্ভাব্য সরকারি দমন-পীড়নের জন্য। হলভিত্তিক সভা, লিফলেট বিতরণ, দেয়াললিখন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যুক্ত করার পরিকল্পনাও এই বৈঠকে চূড়ান্ত করা হয়।

৩ ফেব্রুয়ারির এই বৈঠকের গুরুত্ব এখানেই যে, এর মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন একটি নির্দিষ্ট তারিখ ও সুস্পষ্ট কর্মসূচি পায়। এতদিন আন্দোলন ছিল মূলত বিচ্ছিন্ন ও প্রতিক্রিয়াশীল। কিন্তু এই বৈঠকের পর তা রূপ নেয় পরিকল্পিত ও সম্মিলিত গণআন্দোলনে।

এই সিদ্ধান্তের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনের প্রস্তুতি দ্রুত এগোতে থাকে। বিভিন্ন হল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সভা অনুষ্ঠিত হয়, ছাত্রদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ে এবং ভাষা প্রশ্নে সাধারণ মানুষের সমর্থনও বিস্তৃত হতে থাকে।

পরবর্তীতে সরকার ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করলে ছাত্রসমাজ সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম রক্তের বিনিময়ে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।

ভাষা আন্দোলনের এই রক্তাক্ত পরিণতির পেছনে যে সংগঠিত সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা কাজ করেছিল, তার সূচনাবিন্দু ছিল ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালের ফজলুল হক হলের সেই বৈঠক। ইতিহাসের এই দিনটি তাই ভাষা আন্দোলনের মোড় ঘোরানো এক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।