তীব্র গরমে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, উৎপাদনশীলতা কমছে: বিশ্বব্যাংক

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮:৩২ অপরাহ্ন, ৩০ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৮:৩২ অপরাহ্ন, ৩০ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চরম তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশে শ্রমের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে এবং বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘A Livable Future: Protecting Jobs and Growth from Extreme Heat in South Asia’s Cities’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় চরম গরমের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ঢাকাসহ ৯ অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির আভাস

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ১৩০ কোটি থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান।

বিশ্বব্যাংক বলছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে রাজধানী ঢাকা। তীব্র গরমের কারণে প্রতিবছর ঢাকায় মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ কার্যকরভাবে নষ্ট হচ্ছে, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের সমপরিমাণ।

আরও পড়ুন: ৯ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে ঢাকার উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টার ক্ষতি বেড়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দিনের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলেই শ্রম উৎপাদনশীলতার ক্ষতি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এর ফলে বিশেষ করে শ্রমনির্ভর শিল্প খাতগুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের যৌথ বিশ্লেষণ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তাপজনিত উৎপাদনশীলতা হ্রাসের সংকট মোকাবিলা করা না গেলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাত ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫৮০ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

তবে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ ও কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব বলেও মনে করছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং কারখানার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’ ইতোমধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। আইএফসির ‘পার্টনারশিপ ফর ক্লিনার টেক্সটাইল’ কর্মসূচি এবং টেকসই অর্থায়নও এ উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করেছে। এর ফলে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে পরিবেশবান্ধব ‘লিড (LEED)’ সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার সংখ্যা ২৭০টি ছাড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গরমের কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চাপ বাড়ায় পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের ওপর সহিংসতা ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানির ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় চরম গরমের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি অন্তত ৭ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্তত ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস মারাত্মক ও বিপজ্জনক তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হবেন, যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।

গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় এ ধরনের মৃত্যুর হার প্রায় চার গুণ বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, তাপসহনশীল ও জলবায়ু-সহনশীল শহর গড়ে তোলা শুধু মানুষকে চরম গরম থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান রক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শহরগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধরে রাখার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও বাসযোগ্য, টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক শহর গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।