মিল মালিকরা এলএসডিতে চাল খালাস করতে না পেরে ফেরত নিচ্ছেন
সরকারের চাল সংগ্রহ ঘিরে মেহেরপুরে বিএনপি-জামায়াতের তিন গ্রুপের চাঁদাবাজি
চলতি মৌসুমে সরকারের চাল সংগ্রহ কর্মসুচিকে ঘিরে খুলনা বিভাগের মেহেরপুর জেলায় সরকারদলীয় বিএনপি ও জামাতের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজিতে নেমেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত সোমবার সরকারি খাদ্য গুদামে (লোকাল সাপ্লাই ডিপো বা এলএসডি) যেসকল মিল মালিক ট্রাকে করে চাল নিয়ে গেছেন তাদেরকে চাল খালাস করতে বাঁধা দেয়া হচ্ছে। গত দুদিন ধরে সেখানে ট্রাক অবস্থান করার পর গতকাল বিকেলে কোনও কোনও মিল মালিক চালভর্তি ট্রাক ফেরত নিয়ে গেছেন। কেউ কেউ স্থানীয় বিএনপি-জামাতের নেতাদের সঙ্গে আপোষ করে চাল খালাসের চেষ্টা করছেন বলেও স্থানীয় একাধিক সুত্র জানিয়েছে।
এ ব্যাপারে এলএসডি’র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদ রানা’র সঙ্গে কথা বলেও মিল মালিকরা চাল খালাস করতে পারেননি। ওসি এলএসডি মিল মালিকদের স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, ‘আমার কিছু করার নেই।’
আরও পড়ুন: টুঙ্গিপাড়ায় মৌসুমী ফলের সমারোহ, জমে উঠেছে হাট-বাজার
জেলা বিএনপি’র সভাপতি এবং স্থানীয় জেলা পরিষদ প্রশাসক জাভেদ মাসুদ মিল্টনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলাবাজার পত্রিকার এই প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘আমি ঢাকায় অবস্থান করছি। ওখানে কি ঘটেছে, কারা ঘটিয়েছে তা আমি জানিনা। এমনটা হবার কথা নয়। আমি খবর নিচ্ছি। ঘটনা সত্য হোক, মিথ্যা হোক আমি আপনাকে জানাবো।’
মিল্টন এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, ‘আমার সরকার কোনও চাঁদাবাজিকে প্রশ্রয় দেয়না। কেউ চাঁদাবাজি করে রেহাই পাবে না। আমি বিষয়টা দেখছি।’
আরও পড়ুন: মাধবপুরে ট্রাক-সিএনজি সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ২
স্থানীয় সুত্রের অভিযোগ বিএনপি’র জেলা কমিটির সভাপতি স্বয়ং ও সাধারন সম্পাদক কামরুল, পুরনো কমিটির সভাপতি মাসুদ অরুন এবং তার বাল্যবন্ধু ছোট কালুসহ সদর বিএনপি’র ফয়েজ মাহমুদ ও প্রফেসর সাইদুলও এই চাঁদাবাজির নির্দেশদাতা। এছাড়াও রয়েছে জামায়াতে ইসলামী’র স্থানীয় নেতারা। তাদের লোকজন মিল মালিকদের চাল খালাস করতে টনপ্রতি চাঁদা দেয়ার কথা বলেছেন। প্রয়োজনে স্থানীয় বিএনপি অফিসে যোগাযোগ করতে নির্দেশ দেন তারা। আদায়কৃত চাঁদার ৬০ শতাংশ বিএনপি’র নেতারা এবং ৪০ শতাংশ জামায়াতের নেতারা পাবেন বলে নিজেদের মধ্যে সমঝোতাও হয়েছে।
এদিকে, এলএসডি’র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তারা চাল খালাস করতে নিষেধ করে কঠোর হুমকিও দিয়েছেন। এলএসডি’র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এখন আর কারও সঙ্গে দেখা করছেন না কিংবা ফোনেও কথা বলছেন না। এই প্রতিবেদক এলএসডি’র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘একটু সমস্যা হয়েছে। আমরা বাধার শিকার হচ্ছি। বর্তমানে চাল খালাস বন্ধ আছে। আমি সরকারের ছোট কর্মকর্তা। বিষয়টি আমি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে জানিয়েছি। আমি যেমন নির্দেশনা পাবো তাই করবো।’
উল্লেখ্য, স্থানীয় সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা মো. তাজউদ্দিন খান (তাজুল) চাল সংগ্রহ কর্মসুচির উপদেষ্টা হিসেবে দেখভাল করার কথা।
সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী মেহেরপুর জেলায় মোট ২ হাজার ১৭৪ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের কর্মসুচি চলছে। প্রায় ১৫ টি হাস্কিং ও অটো রাইস মিল এই চাল সরবরাহ করার কথা। প্রতি মিল ১৫ দিনে যেই পরিমাণ চাল দেয়ার সক্ষমতা রাখে সেই পরিমাণ চালই এলএসডি নেয়ার কথা। কিন্ত এরই মধ্যে চাঁদাবাজির কারনে চাল সংগ্রহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মিল মালিকরা মঙ্গলবার খাদ্য মন্ত্রণালয়ে এই অভিযোগ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সোমবার স্থানীয় ডায়মন্ড অটো রাইস মিল ছাড়াও আরও প্রায় সহ প্রায় ১৩টি হাস্কিং মিল এই চাল সরবরাহের কাজ শুরু করে। তার মধ্যে ডায়মন্ড অটো রাইস মিল প্রায় ১ হাজার মেট্রিক টন চাল দিতে পেরেছে। ওই মিলের আরও তিনটি ট্রাক সোমবার ও মঙ্গলবার এলএসডিতে গিয়েও চাল খালাস করতে পারেনি। বিধিনিষেধ এবং বিএনপি-জামায়াত নেতাদের তিন গ্রুপের চাঁদাবাজির কথা শুনে ওই তিনটি ট্রাক চালসহ ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়। মিলটির মালিক হাবিবুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, “আমরা যেই চাল সরকারকে সরবরাহ করছি তার বাজারদর বর্তমানে কেজিপ্রতি ৫২ টাকা। কিন্ত সরকারকে সেই চাল আমরা দিচ্ছিলাম ৪৯টাকা কেজিতে। এখন বাড়তি অর্থ ব্যয় করে বা চাঁদা দিয়ে চাল না দিয়ে বাজারে বিক্রি করলে আমরা বেশি লাভবান হবো। তবে এতে করে সরকার চাল পাবে না। এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য যে স্বল্পমুল্যে চাল বিতরণে সরকারের কর্মসুচি আছে তা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাই প্রতিবছরের মতো এবারেও আমার চাল দিতে গিয়েছিলাম।’
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী, সারাদেশ থেকে মোট ১২ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করার কথা। গত ১৫ মে শুরু হয়ে এই চাল সংগ্রহ কর্মসুচি ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। এলক্ষ্যে দেশের প্রত্যেক জেলা, উপজেলা ও বিভাগওয়ারী লক্ষ্যমাত্রাও ঠিক করে দেয় সরকার। চাল সংগ্রহে সরকারের প্রত্যেক এলএসডি স্থানীয় অটো রাইস মিল এবং হাস্কিং মিলগুলোর সঙ্গে চুক্তিও সম্পাদন করে। সেই চুক্তির আলোকে মিল মালিকেরা চাল সরবরাহের প্রস্তুতি নেয়।
এদিকে, মিল মালিকদের কেউ কেউ বলেছেন, সরকারকে চাল দেয়ার একটি বড় উদ্দেশ্য হলো একসাথে বড় অঙ্কের বিল পাওয়া যায়। এতে অনিশ্চয়তাও নেই। মিল মালিকদের বেশিরভাগই মিলের বিপরীতে ঋণ নিয়েছে। ওই ঋণ পরিশোধে সরকারকে সরবরাহ করা চালের মুল্য বড় কাজে দেয়। তাই মিল মালিকেরা ঠিকমতো চাল সরবরাহ করতে না পারলে ওই ঋণ পরিশোধে নগদ টাকার সংস্থান করতে পারেনা। মিল মালিকরা জানান, আগে সুদহার ছিল ৮ শতাংশ। এখন তা ১৬ শতাংশ হয়েছে। এতে করেও মিল মালিকেরা বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।





