খামেনি: যুগের প্রতীক এক বিশ্বনেতার বিদায়!

Sanchoy Biswas
এম এফ ইসলাম মিলন
প্রকাশিত: ৬:৫২ অপরাহ্ন, ০৩ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৭:৫১ অপরাহ্ন, ০৩ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কোনো নেতার প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল তাঁর জীবদ্দশায় নয়, বরং তাঁর অনুপস্থিতির পরও মানুষের স্মৃতিতে তিনি কতটা জীবন্ত থাকেন, তার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। ইতিহাসে এমন অনেক নেতা আছেন, যাঁদের মৃত্যু একটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সেই দৃষ্টিতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও ছিলেন তেমনই একজন প্রভাবশালী নেতা।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনৈতিক মহলের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এসব তথ্য যদি সঠিক হয়ে থাকে, তবে এটি স্পষ্ট করে যে, তাঁর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিস্তৃত ছিল।

আরও পড়ুন: ঢাকা-ওয়াশিংটন-বেইজিং-আঙ্কারা অক্ষ এবং দিল্লির কৌশলগত বাধ্যবাধকতা

প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশ থেকেও একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে জাতীয় সংসদের স্পিকারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফরের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পূর্বনির্ধারিত বিদেশ সফরের কারণে উপস্থিত থাকতে না পারলেও, ভারতের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠানোর খবর প্রকাশিত হয়েছে। পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও আফগানিস্তান থেকেও প্রতিনিধি দলের অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া, চীন, কাতার, ফ্রান্স এবং মধ্য এশিয়ার কয়েকটি রাষ্ট্র কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে অংশ নেবে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: দলীয় আনুগত্য বনাম রাষ্ট্রের স্বার্থ: অযোগ্য নিয়োগে প্রশাসনের সংকট

যেভাবে বিস্তৃত পরিসরে বিশ্বনেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণ ঘটতে যাচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও তাঁর প্রভাব ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

খামেনির সমর্থকদের মতে, তিনি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা এবং বিদেশি প্রভাবমুক্ত নীতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও ইরানকে নিজের কৌশলগত অবস্থানে ধরে রাখার চেষ্টা তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইতিহাস আমাদের শেখায়—বড় নেতাদের উত্তরাধিকার সবসময় বিতর্ক, প্রশংসা ও সমালোচনার মধ্য দিয়েই মূল্যায়িত হয়। কিন্তু একটি বিষয় অনস্বীকার্য, দীর্ঘ সময় ধরে কোনো নেতা যদি একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক আলোচনাকে প্রভাবিত করেন, তবে তিনি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠেন।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা হলো—কোনো ব্যক্তির অবদান ও প্রভাবকে তথ্যনির্ভর, নিরপেক্ষ ও গবেষণাভিত্তিকভাবে মূল্যায়ন করা। সমর্থন কিংবা বিরোধিতা—উভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাস একদিন খামেনির জীবন, নেতৃত্ব এবং উত্তরাধিকারকে নিজস্ব মানদণ্ডেই বিচার করবে। সেই বিচারই হবে সবচেয়ে স্থায়ী এবং সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

পরিশেষে বলা যায়, মানবাধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, আঞ্চলিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে বহু সমালোচনা রয়েছে বিধায় ইতিহাসে তাঁর মূল্যায়ন হয়তো একমাত্রিক হবে না; তবে রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁকে অবিস্মরণীয় ও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বিচার করতে হবে।

লেখক: এম এফ ইসলাম মিলন, ব্যবসায়ী ও কলামিস্ট।