রাষ্ট্রপতি যখন শুধু পদ নয়, রাষ্ট্রের আস্থার প্রতীক

Sanchoy Biswas
আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: ৯:১৯ অপরাহ্ন, ২২ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫৪ অপরাহ্ন, ২২ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদটি নিয়ে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে। সংবিধানের চোখে এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ, কিন্তু সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। তিনি রাষ্ট্রের প্রধান, কিন্তু সরকারপ্রধান নন।

তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক অভিভাবক, কিন্তু সরকারের দৈনন্দিন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রক নন। তাঁর অধিকাংশ কার্যাবলি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পন্ন হয়। তবু ইতিহাস বলে, রাষ্ট্রপতির পদ কখনোই গুরুত্বহীন নয়। বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাংবিধানিক সংকট কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার প্রশ্নে এই পদটির নৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব অনেক সময় আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ৪৯ অনুচ্ছেদ তাঁকে দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা লঘু করার বিশেষ ক্ষমতাও দিয়েছে।

আরও পড়ুন: দোতলা বিআরটিসি বাসে নারী-পুরুষের পৃথক সেকশন: নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর গণপরিবহনের একটি সম্ভাব্য মডেল

এই বাস্তবতার মধ্যেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দিয়েছেন। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলো।

এই নির্বাচন তাই নিছক একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও আছে। বিশেষ করে এমন একজন রাজনীতিক রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রবেশ করেছেন, যিনি দীর্ঘদিন সক্রিয় দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি যেমন দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি বিরোধী রাজনীতির কঠিন সময়ও পার করেছেন। এখন তাঁর সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরীক্ষা। দলীয় রাজনীতিতে যে মানুষটি একটি পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসে তাঁকেই হতে হবে সব পক্ষের রাষ্ট্রপতি।

আরও পড়ুন: বিএনপি সদ্য বিদায়ী মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের চোখের পানি ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে

এখানেই তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই পদটির চরিত্র কখনো একই রকম ছিল না। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্মাণের সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতীকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা চালুর পর পদটি সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে। এরপর সামরিক শাসনের সময় রাষ্ট্রপতি পদ আরও এক ধরনের রাজনৈতিক বৈধতার আবরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর আবার রাষ্ট্রপতির পদ সাংবিধানিক প্রধানের সীমারেখায় ফিরে আসে।

এই দীর্ঘ পথের মধ্যে সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই: রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষমতার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।

রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন, তিনি রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, তাহলে সাংবিধানিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। আবার রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন, তাঁর কোনো ভূমিকা নেই, তাহলে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে। সুতরাং একজন সফল রাষ্ট্রপতির মূল গুণ ক্ষমতা প্রয়োগে নয়, ক্ষমতার সীমা বোঝার মধ্যে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের দুই ভিন্ন সময়ের ভূমিকা এই পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র নির্মাণের কঠিন বাস্তবতায় তাঁর নেতৃত্ব ছিল অপরিহার্য। কিন্তু ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা, বাকশাল প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি রাষ্ট্র যতই সংকটে থাকুক, রাজনৈতিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করতে পারে।

এরপর জিয়াউর রহমানের সময় রাষ্ট্রপতি পদ আবার নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসে। সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং সামরিক প্রভাবের সেই সময় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে ফেলে। রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের সময়ও সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখল রাষ্ট্রপতি পদকে আবার সামরিক শাসনের কেন্দ্রে নিয়ে যায়। এরশাদ পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে নিজের শাসনের রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে সেই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনের সংকোচন।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের রাষ্ট্রপতিত্ব সেই অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তিনি দেখিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় শক্তি সব সময় ক্ষমতা নয়, নিরপেক্ষতা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গভীর অবিশ্বাসের সময়ও তিনি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি সাংবিধানিক অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছিলেন। তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড তৈরি করে: রাষ্ট্রপতি দলীয় সরকারের অংশ নন, তিনি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থার একটি প্রতীক।

অবশ্য ইতিহাসের সব রাষ্ট্রপতি একই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হননি। ২০০৬-০৭ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ায় তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত জরুরি অবস্থা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বড় ধরনের সংকটে ফেলে। এই অভিজ্ঞতার শিক্ষা স্পষ্ট: সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির ব্যক্তিগত সততা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাঁর সিদ্ধান্তকে জনগণের কাছে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বলেও প্রতীয়মান হতে হয়।

পরবর্তী সময়ে জিল্লুর রহমান ও আবদুল হামিদের রাষ্ট্রপতিত্ব তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল সাংবিধানিক ধারার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে জিল্লুর রহমান দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়েও রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে এসে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সংযম বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন। আবদুল হামিদের দীর্ঘ রাষ্ট্রপতিত্বও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সময়ের সঙ্গে যুক্ত। তবে এই সময়ের একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতাও ছিল। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় জাতীয় রাজনীতির বড় বড় সংকট, নির্বাচনব্যবস্থা, মানবাধিকার কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অনেক সময় জনগণের প্রত্যাশার তুলনায় কম দৃশ্যমান ছিল।

সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতা আরও কঠিন। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দীনের মেয়াদে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদল রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকার সামনে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সংসদ বিলুপ্তি, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং পরবর্তী সাংবিধানিক বিতর্কে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। শেষ পর্যন্ত তাঁর পদত্যাগও রাষ্ট্রপতি পদকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ইতিহাসের এই অধ্যায় থেকে নতুন রাষ্ট্রপতির জন্য শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ: রাষ্ট্রপতির প্রতিটি সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের জন্য নয়, ভবিষ্যতের সাংবিধানিক নজির হিসেবেও বিবেচিত হয়।

এই জায়গাতেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ।

তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিকে ভেতর থেকে দেখেছেন। ক্ষমতার রাজনীতি দেখেছেন, বিরোধী দলের রাজনীতি দেখেছেন, রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ দেখেছেন, আন্দোলন দেখেছেন, নির্বাচন দেখেছেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্কের টানাপোড়েনও প্রত্যক্ষ করেছেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে একটি বড় সম্পদ হতে পারে। কিন্তু একই অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জও হতে পারে। কারণ দীর্ঘদিনের দলীয় পরিচয় রাতারাতি মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায় না।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাঁকে তাই শুধু নিরপেক্ষ হতে হবে না, তাঁকে নিরপেক্ষতার বিশ্বাসযোগ্য প্রতীকও হতে হবে।

জনগণ তাঁকে প্রশ্ন করবে না যে তিনি অতীতে কোন দলের নেতা ছিলেন। জনগণ দেখতে চাইবে, রাষ্ট্রপতি ভবনে বসে তিনি এখন কার কথা বলেন। তাঁর কাছে বিরোধী দলের নেতা যেমন সমান মর্যাদার নাগরিক, ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ কর্মীও তেমনি আইনের অধীন। একজন সাধারণ কৃষক, একজন শ্রমিক, একজন সংখ্যালঘু নাগরিক, একজন সাংবাদিক, একজন ছাত্র কিংবা একজন রাজনৈতিক কর্মী রাষ্ট্রের কাছে সমান মর্যাদা পাচ্ছে কি না, সেটিই তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের নৈতিক মানদণ্ড হওয়া উচিত।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর বিকল্প নন। সংবিধান তাঁকে নির্বাহী সরকারের সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র বানায়নি। বরং ৪৮(৩) অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাঁর অধিকাংশ দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী পালন করেন। ফলে নতুন রাষ্ট্রপতির কাছে জনগণের প্রত্যাশা এমন কিছু নয় যে তিনি প্রতিদিন সরকারের কাজে হস্তক্ষেপ করবেন। বরং প্রত্যাশা হলো, তিনি তাঁর সাংবিধানিক সীমারেখার মধ্যে থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্য ও নৈতিক নেতৃত্বের জায়গাটি শক্তিশালী করবেন।

এই পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

রাষ্ট্রপতির শক্তি সরকারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নয়; সরকারের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার প্রতীক হয়ে থাকার মধ্যে। তিনি সরকারের অংশ নন, আবার সরকারের প্রতিপক্ষও নন। তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি অপরিহার্য অংশ।

তাই নতুন রাষ্ট্রপতির কাছে প্রথম প্রত্যাশা নিরপেক্ষতা।

দ্বিতীয় প্রত্যাশা সাংবিধানিক দায়িত্বশীলতা। রাজনৈতিক চাপ, দলীয় আবেগ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে প্রতিটি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। এই ক্ষমতা অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা, ব্যক্তিগত আনুগত্য বা ক্ষমতাসীনদের চাপ যেন এই ক্ষমতার ব্যবহারে প্রভাব না ফেলে। কারণ একজন রাষ্ট্রপতির একটি সিদ্ধান্ত শুধু একজন ব্যক্তির ভাগ্য নির্ধারণ করে না, রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা ও ন্যায়বিচারের ওপরও মানুষের আস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

তৃতীয় প্রত্যাশা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে নৈতিক অবস্থান। রাষ্ট্রপতি আদালতের বিচার করবেন না, প্রশাসনের দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা করবেন না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সাংবিধানিক অবস্থানের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা প্রকাশ পেতে হবে প্রতিটি কর্মকাণ্ডে।

চতুর্থ প্রত্যাশা জাতীয় ঐক্য।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্বলতাগুলোর একটি হলো বিভাজন। সরকার বদলালেই যেন রাষ্ট্রের ভাষা বদলে যায়, প্রশাসনের অগ্রাধিকার বদলে যায়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি আচরণ বদলে যায়। এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। নতুন রাষ্ট্রপতি যদি জাতীয় ঐক্যের একটি গ্রহণযোগ্য ভাষা তৈরি করতে পারেন, তাহলে সেটি তাঁর অন্যতম বড় অবদান হবে।

জাতীয় ঐক্য মানে অবশ্য রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূর করে দেওয়া নয়। বরং মতপার্থক্যের মধ্যেও রাষ্ট্রকে অভিন্ন জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি কিংবা নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তি কেউই রাষ্ট্রের মালিক নয়। রাষ্ট্র জনগণের। রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হতে পারে এই সত্যটিকে প্রতীকী ও নৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা।

পঞ্চম প্রত্যাশা হলো প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ওপরে স্থান দেওয়া।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার প্রভাব গভীর। শক্তিশালী নেতা মানেই শক্তিশালী রাষ্ট্র নয়। বরং শক্তিশালী রাষ্ট্র হলো সেই রাষ্ট্র, যেখানে ব্যক্তি পরিবর্তিত হলেও প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবে, বিচার বিভাগ তার স্বাধীনতা বজায় রাখবে, সংসদ কার্যকর থাকবে, প্রশাসন আইন অনুযায়ী চলবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ব্যক্তি বা দলের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হবে না।

রাষ্ট্রপতি সরাসরি এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন না। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে যে নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করবেন, তা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনআস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

আর একটি প্রত্যাশা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ক্ষমতার সংযম।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতা হারানোর ভয় যেমন রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে, তেমনি ক্ষমতা ধরে রাখার অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষাও রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একজন রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হতে পারে তাঁর সংযম। তিনি কতটা কথা বললেন, তার চেয়ে কখন কথা বললেন সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কতগুলো সিদ্ধান্ত নিলেন, তার চেয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে অস্বীকার করলেন সেটিও ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্য এখানেই একটি ঐতিহাসিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি চাইলে রাষ্ট্রপতি পদটিকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার জায়গায় রেখে দিতে পারেন। আবার চাইলে সাংবিধানিক সীমারেখা অতিক্রম না করেও এই পদটির নৈতিক মর্যাদা অনেকখানি বাড়িয়ে দিতে পারেন।

সেটি করতে হলে তাঁকে হয়তো খুব বেশি কিছু করতে হবে না। শুধু কিছু মৌলিক নীতি অটুট রাখতে হবে।

রাষ্ট্রপতি ভবনের দরজা যেন শুধু ক্ষমতাসীনদের জন্য খোলা না থাকে। বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ যেন রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত না হয়। সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যেন রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছাতে পারে। কোনো রাজনৈতিক কর্মী অন্যায় আচরণের শিকার হলে তিনি যেন ন্যায়বিচারের সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন। সাংবাদিকের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের মর্যাদা, সংসদের কার্যকারিতা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে তিনি যেন দলীয় ভাষার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ভাষায় কথা বলেন।

সবচেয়ে বড় কথা, তিনি যেন কখনো ভুলে না যান যে রাষ্ট্রপতির চেয়ারটি কোনো দলের পুরস্কার নয়। এটি রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব।

মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া তাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং এক অর্থে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এতদিন তিনি একটি দলের হয়ে কথা বলেছেন। এখন তাঁকে এমন এক অবস্থানে দাঁড়াতে হবে, যেখানে তাঁর একটি শব্দও দলীয় ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রীয় অর্থ বহন করবে।

তাঁর সামনে অতীতের রাষ্ট্রপতিদের সাফল্য যেমন আছে, তেমনি ব্যর্থতার দীর্ঘ তালিকাও আছে। আছে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের শিক্ষা, সামরিক শাসনের শিক্ষা, দলীয়করণের শিক্ষা, সাংবিধানিক সংকটের শিক্ষা এবং নিরপেক্ষতার মূল্যও। এই সব অভিজ্ঞতার সম্মিলিত পাঠ যদি তিনি গ্রহণ করতে পারেন, তাহলে তাঁর রাষ্ট্রপতিত্ব বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ আজ এমন একজন রাষ্ট্রপতি চায় না, যিনি সরকারের সঙ্গে ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় নামবেন। আবার এমন রাষ্ট্রপতিও চায় না, যিনি সবকিছু দেখেও কেবল আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের দায়িত্ব পালন করবেন।

দেশ চায় এমন একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি জানবেন কোথায় কথা বলতে হয়, কোথায় নীরব থাকতে হয়; কখন সরকারের পাশে দাঁড়াতে হয়, কখন রাষ্ট্রের স্বার্থকে সামনে আনতে হয়; কখন রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে যেতে হয় এবং কখন সংবিধানের প্রতি নিজের অঙ্গীকারকে সবার ওপরে রাখতে হয়।

একজন রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হয়তো সংবিধানের কোনো ধারায় লেখা নেই। সেটি হলো জনগণের আস্থা।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই আস্থা অর্জন করতে পারলে তাঁর রাজনৈতিক অতীতই তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে বড় বাধা হবে না, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠতে পারে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। আর যদি তিনি দলীয় পরিচয়ের ছায়া থেকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে পুরোপুরি আলাদা করতে পারেন, তাহলে তাঁর রাষ্ট্রপতিত্ব শুধু একটি সাংবিধানিক পদ পূরণের ঘটনা হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি প্রয়োজনীয় বার্তা।

বার্তাটি খুব স্পষ্ট: সরকার পরিবর্তন হতে পারে, দল পরিবর্তন হতে পারে, ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র সবার।

আর রাষ্ট্রপতির প্রথম ও শেষ পরিচয়ও হওয়া উচিত একটাই-  তিনি রাষ্ট্রের, কোনো দলের নন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।