নতুন ৪ মন্ত্রী, ২ প্রতিমন্ত্রী; বদলেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব

মন্ত্রিসভায় রদবদল, সরকারের কাজে গতিশীলতার লক্ষ্য

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:২৪ অপরাহ্ন, ২২ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৭:২৪ অপরাহ্ন, ২২ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় প্রথম বড় ধরনের রদবদল এনেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন করে চারজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার পাশাপাশি একজন মন্ত্রীর দপ্তর পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন পদত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে গতি আনা এবং দায়িত্বের পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে সরকারের কাজকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যেই এ পরিবর্তন বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নতুন চার মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁদের শপথ পড়ান। শপথ নেওয়া নতুন মন্ত্রীরা হলেন—ড. আবদুল মঈন খান, এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সাচিং প্রু জেরী এবং আন্দালিব রহমান। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন হুমায়ুন কবির ও মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন।

আরও পড়ুন: তেজগাঁও থানা আকস্মিক পরিদর্শনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেবা নিশ্চিতের নির্দেশ

শপথের পর শুক্রবার রাতেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দপ্তর বণ্টন ও পুনর্বণ্টন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’-এর ৩(৪) বিধি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে দপ্তরের দায়িত্ব বণ্টন ও পুনর্বণ্টন করেছেন। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করা হয়।

কে পেলেন কোন মন্ত্রণালয়

আরও পড়ুন: তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন করে বাংলাদেশ গড়ব: মঈন খান

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে দেওয়া হয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এর আগে তিনি একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ফলে প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে পদোন্নতি পেলেন তিনি।

সাচিং প্রু জেরী পেয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। আর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমানকে দেওয়া হয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

অন্যদিকে, আগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আফরোজা খানমকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন দুই প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আগে থেকেই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। ফলে এখন এ মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করবেন।

কাজের গতি বাড়াতে পররাষ্ট্রে দুই প্রতিমন্ত্রী

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের কারণ হিসেবে কাজের পরিধি ও ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত ছয় মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজের পরিমাণ বেড়েছে। এ সময়ে প্রায় তিনটি নতুন উইং চালু হয়েছে। অভিবাসন ও অবৈধ অভিবাসন বন্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ভিত্তিক কাজও বেড়েছে।

তিনি আরও জানান, প্রবাসী কল্যাণ, সংস্কৃতি, শ্রম ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় ফোকাল পয়েন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আগামী এক বছর তাঁর ওপর বাড়তি দায়িত্ব থাকবে। এ কারণে কাজের সুবিধা ও গতি বাড়াতেই দুই প্রতিমন্ত্রী নিয়ে দল হিসেবে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিমান ও পর্যটন খাতেও নতুন পরিকল্পনা

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নতুন দায়িত্ব পাওয়া এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতও রদবদলের লক্ষ্য হিসেবে সংশ্লিষ্ট খাতকে আরও গতিশীল করার কথা বলেছেন।

শনিবার দুপুরে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিমান, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন) এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনকে আন্তর্জাতিক মানে নতুনভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রী এ পরিবর্তন এনেছেন।

রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এগুলোকে নতুন ও গতিশীল রূপে সাজাতে চান। কে কোথায় কাজ করলে দেশ ও জনগণের সর্বাধিক উন্নতি হবে—সেটি বিবেচনা করেই দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রিত্ব ছেড়ে রাজনৈতিক উপদেষ্টা স্বপন

এবারের রদবদলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের দায়িত্বেও পরিবর্তন এসেছে। তিনি মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তাঁর পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেছেন এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।

পৃথক আরেকটি প্রজ্ঞাপনে জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন নতুন মন্ত্রী আন্দালিব রহমান।

মন্ত্রিসভার আকার ৫২

নতুন চার মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হওয়া, একজন প্রতিমন্ত্রীকে পূর্ণমন্ত্রী করা এবং দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের ফলে মন্ত্রিসভার কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। সর্বশেষ রদবদলের পর প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভায় ২৭ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। অর্থাৎ মোট সদস্যসংখ্যা ৫২।

সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় এই প্রথম বড় ধরনের রদবদলকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দায়িত্ব গ্রহণের ফলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্ব এসেছে। একই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রী হওয়া রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে গুরুত্বপূর্ণ বিমান ও পর্যটন খাতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্ব আনা হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে এ রদবদলকে প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এখন নতুন দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা তাঁদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে কতটা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারেন, সেটিই হবে এই রদবদলের কার্যকারিতার বড় পরীক্ষা।