ধোলাইখালে ময়লার স্তূপ ঠেকাতে ‘সবুজ লড়াই’
# তরুণদের উদ্যোগে গাছের চারা রোপণ
# ময়লা ফেলবে কোথায়, প্রশ্ন স্থানীয়দের
আরও পড়ুন: ঢাকার ঐতিহাসিক স্থান আর ধ্বংস হতে দেওয়া যাবে না: ডিএসসিসি প্রশাসক
# বিভাজকের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকায় বর্জ্য ফেলা ঠেকানো হয়েছে
# স্থানীয় মানুষ কম, বাইরের বাসিন্দারাই বেশি ফেলেন
আরও পড়ুন: রাড্ডা ক্লিনিকে ফিরল নিজস্ব সাইনবোর্ড, শুরু হয়েছে সংস্কার কাজ
# সড়ক বিভাজকে পথচারীদের ভোগান্তিও কমেছে
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও খোলা জায়গায় যত্রতত্র ময়লা ফেলার কারণে বাড়ছে পরিবেশদূষণ। সড়ক-মহাসড়কে ফেলা ময়লার স্তূপ থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, জন্ম নিচ্ছে মশা-মাছি ও নানা রোগজীবাণু। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষায় শুরু হয়েছে নতুন এক উদ্যোগ—‘সবুজ লড়াই’। স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবীদের অংশগ্রহণে পরিচালিত এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করা এবং মানুষকে পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সচেতন করা। উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সচেতনতামূলক প্রচার এবং নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার বিষয়ে জনগণকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
জানা গেছে, রাজধানীর পুরান ঢাকার ধোলাইখালের ব্যস্ততম সড়কটি নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। দুপাশে বসানো হয়েছে নান্দনিক টাইলস। ভাঙাচোরা পথে সংস্কারের পর এখন পরিচ্ছন্নতার ছাপ। পুরান ঢাকার ধোলাইখালের ব্যস্ততম এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের চলাচল। কিন্তু সড়ক চকচকে হলেও সেখানে বড় অস্বস্তির নাম হয়ে উঠে বিভাজকে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। ওই পথে ময়লার দুর্গন্ধে পথচারীদের নাক চেপে চলাচল করতে হতো। কোথাও ছেঁড়া পলিথিন, কোথাও বাসাবাড়ির বর্জ্যের ব্যাগ, কোথাওবা দোকানের আবর্জনা পড়ে থাকতো। সড়ক সংস্কারের পরও যদি বিভাজকজুড়ে ময়লা পড়ে থাকে, তাহলে নতুন করে সাজানোর অর্থইবা কী, এমন প্রশ্নই ঘুরছিল স্থানীয় সচেতন বাসিন্দাদের মধ্যে।
পুরান ঢাকার ধোলাইখালের তিন রাস্তার মোড় হিসেবে পরিচিত গোয়ালঘাট এলাকা থেকে রায়সাহেব বাজারমুখী প্রায় ৬৫০ ফুট দীর্ঘ সড়কের ওই অংশজুড়ে এমনই পরিস্থিতি ছিল। সড়কটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন। ধোলাইখালের এই অংশে ময়লা ফেলা ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় কয়েকজন তরুণ নিজেরাই মাঠে নামেন। তাদের হাতে ছিল না কোনো সরকারি বরাদ্দ, ছিল না বড় কোনো প্রকল্প। নিজেদের অর্থে গাছ কিনেছেন। সড়ক বিভাজকে লাগিয়েছেন ফুল ও ফলের গাছ। গাছগুলো রক্ষায় দিয়েছেন অস্থায়ী বেষ্টনী। শুধু গাছ লাগিয়েই থামেননি। মহল্লায় ঘুরে ঘুরে মানুষকে বুঝিয়েছেন, সড়কের বিভাজকে ময়লা না ফেলতে। কখনো মাইকিং করেছেন, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও এবং বার্তা ছড়িয়েছেন। আর যেখানে এসব দিয়েও কাজ হয়নি, সেখানে নিয়েছেন কিছুটা অভিনব কৌশল।
সরেজমিনে ধোলাইখাল সড়কের ওই অংশে দেখা যায়, সড়ক বিভাজকের বিভিন্ন স্থানে নানা ধরনের ফুল ও ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। ছোট ছোট গাছগুলো ঘিরে দেওয়া হয়েছে অস্থায়ী বেষ্টনী। কোথাও বাঁশ বা অন্য উপকরণ দিয়ে এমনভাবে ঘের তৈরি করা হয়েছে, যেন সহজে কেউ ময়লার ব্যাগ ছুড়ে ভেতরে ফেলতে না পারেন। স্থানীয় তরুণদের দাবি, গাছ লাগানোর পর থেকে সড়ক বিভাজকে ময়লা ফেলার প্রবণতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এখন তাদের লক্ষ্য, যেখানে সামান্য ময়লা পড়ে আছে, সেটিও বন্ধ করা। এই সামাজিক উদ্যোগের অন্যতম উদ্যোক্তা স্থানীয় ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন সজল।
তিনি বলেন, গল্পটা শুরু হয়েছিল ময়লা দিয়ে, গাছ দিয়ে নয়। তার কথায়, আগে সড়ক ও বিভাজক ভাঙাচোরা থাকায় সেখানে ময়লা জমে থাকত। তখন থেকেই তিনি বিষয়টি নিয়ে ভিডিও করা এবং মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করতেন। পরে সড়ক সংস্কার হলো, বিভাজক মেরামত হলো, ফুটপাতে টাইলস বসানো হলো। চারপাশে সৌন্দর্য ফিরলেও ময়লা ফেলার অভ্যাস বদলালো না। তখনই কয়েকজন বন্ধু মিলে ভাবলেন, বিভাজকে গাছ লাগালে কেমন হয়। প্রথমে নিজেদের বাসার সামনে কয়েকটি গাছ লাগানো হয়। এরপর স্থানীয় মানুষের সাড়া পেতে শুরু করেন তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উদ্যোগটির প্রশংসা আসতে থাকে। সেই উৎসাহই তাদের আরও গাছ লাগাতে আগ্রহী করে তোলে।
সজলের হিসাবে, নিজেদের অর্থায়নে তারা ৮০ থেকে ৮৫টি গাছ লাগিয়েছেন। এর বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পাওয়া এবং স্থানীয় মানুষের দেওয়া আরও বেশ কিছু গাছও বিভাজকে লাগানো হয়েছে। তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সব মিলিয়ে গাছের সংখ্যা শতাধিক। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন তিনি দেখছেন ময়লা ফেলার ক্ষেত্রে। সজল বলেন, বিভাজকের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকায় তারা বর্জ্য ফেলা ঠেকাতে পেরেছেন। বাকি অংশেও ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তরুণদের এ উদ্যোগ ময়লা না ফেলার সচেতনতা তৈরি করলেও তাদের কথায় উঠে এসেছে নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি পুরোনো প্রশ্ন, মানুষ বাসার ময়লা ফেলবে কোথায়? এই সামাজিক উদ্যোগের উদ্যোক্তা সজলের অভিযোগ, অনেক বাসাবাড়ি থেকে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করা হয় না। ফলে মানুষকে নিজেরাই ময়লা সরিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কেউ কেউ নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা নিয়ে গেলেও অনেকে শেষ পর্যন্ত রাস্তা বা বিভাজকে ফেলে দেন।
তিনি বলেন, বর্জ্য সংগ্রহের সেবা নিয়মিত হলে রাস্তার ওপর ময়লা ফেলার প্রবণতাও কমবে। একই সঙ্গে বাসাবাড়ির মানুষকে নির্ধারিত বর্জ্য সংগ্রহের জন্য নিয়মিত টাকা দেওয়ার বিষয়েও সচেতন হতে হবে। অর্থাৎ, সমস্যাটি শুধু মানুষ ময়লা ফেলছে, এতটা সরল নয়। একদিকে নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে, অন্যদিকে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও রয়েছে। এ জায়গাটিকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন উদ্যোগের সঙ্গে থাকা আরেক তরুণ সামাজিক উদ্যোক্তা মো. সাদ্দাম উল করিম।
তিনি বলেন, বাসাবাড়ি থেকে নিয়মিত ময়লা সংগ্রহ করা হলে সড়কে ময়লা ফেলার প্রবণতা আরও কমবে। কারণ, স্থানীয় কয়েকজন সবসময় বিভাজকের পাশে দাঁড়িয়ে নজরদারি করতে পারবেন না। সাদ্দাম বলেন, তারা প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকে গাছগুলোতে পানি দেন। বৃষ্টি হলে কখনো একদিন বিরতি পড়ে। এভাবে নিয়মিত পরিচর্যায় গাছগুলো বড় হচ্ছে। কিন্তু ময়লা ফেলার বিষয়টি এখনো তাদের জন্য সমস্যা। তার প্রত্যাশা, বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নিয়মিত হলে এ সমস্যার বড় একটি অংশের সমাধান হবে। গাছ লাগানোর পরও কিছু মানুষ সেখানে ময়লা ফেলতে থাকেন। তখন তরুণরা বুঝতে পারেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না; গাছ ও জায়গাটি রক্ষার ব্যবস্থাও করতে হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এই সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে থাকা মো. নাদিম মাসুদ বলেন, এলাকার অনেক মানুষ এখনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সচেতন নন। তারা নানা ধরনের বাধা তৈরি করছেন। সর্বশেষ বেষ্টনী দিয়ে ময়লা ফেলার জায়গাগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এরপরও কেউ কেউ বেষ্টনীর ভেতর দিয়ে ময়লা ঢুকিয়ে দেন কিংবা ওপর দিয়ে ছুড়ে ফেলেন। সমস্যাটা হলো, স্থানীয় তরুণরা তো সারাক্ষণ সেখানে পাহারা দিতে পারবেন না। তাদের নিজেদের ব্যবসা ও কাজ রয়েছে। নাদিমের দাবি, এসব উদ্যোগের ফলে ময়লা ফেলার পরিমাণ আগের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে। মানুষকে সচেতন করতে তারা মাঝেমধ্যে মাইকিংও করেন। তবে তিনি মনে করেন, স্থানীয়দের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। সড়ক বিভাজকে ময়লা কারা ফেলছেন, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে স্থানীয়দের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা পাওয়া গেছে। নাদিম মাসুদের দাবি, স্থানীয় ব্যবসায়ী বা স্থায়ী বাসিন্দারা তুলনামূলকভাবে কম ময়লা ফেলেন।
তার অভিযোগ, আশপাশের ভাড়াবাড়ির কিছু বাসিন্দা কিংবা তাদের বাসাবাড়ির গৃহকর্মীরা রাস্তার পাশে ময়লার ব্যাগ রেখে যান। তবে এ বক্তব্যকে কোনো এলাকার সব বাসিন্দার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলা যায় না। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ আবার বর্জ্য সংগ্রহের অনিয়মকেও সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। রায়সাহেব বাজার এলাকার বাসিন্দা মশিউর রহমান বলেন, কেউই সড়কের ওপর ময়লা পড়ে থাকুক, এটি চান না। কিন্তু মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত বর্জ্য সংগ্রহকারীরা নিয়মিত না আসায় বাসাবাড়িতে ময়লা জমে থাকে। তার ভাষ্য, তখন কেউ কেউ বাধ্য হয়ে রাস্তার দিকে ময়লা ফেলে আসেন। তবে তিনি নিজে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলার পক্ষে নন। আশপাশে কাউকে এভাবে ময়লা ফেলতে দেখলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে বলেন। সড়ক বিভাজকে ময়লা জমে থাকার প্রভাব শুধু সৌন্দর্যের ওপরই পড়েনি, পথচারীদের চলাচলেও সমস্যা তৈরি করেছিল।
কবি নজরুল সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রোকেয়া পারভীন বলেন, সড়ক পার হওয়ার সময় বিভাজকের কাছে ময়লার দুর্গন্ধে অনেক সময় দূরের পথ ঘুরে যেতে হয়েছে। এখন সেখানে ময়লা অনেকটাই কমেছে। স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগকে প্রশংসনীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন কাজে অন্যদেরও এগিয়ে আসা উচিত। স্থানীয় তরুণদের গাছ লাগানো, বেষ্টনী দেওয়া এবং ময়লা ফেলা বন্ধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ধোলাইখালের অংশবিশেষ তাদের আওতাধীন।
তিনি বলেন, গাছ লাগানো অবশ্যই ভালো কাজ। তিনি বলেন, উদ্যোগটি অবশ্যই ভালো। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে বক্তব্য জানাবেন। তাকে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও পরে এর কোনো উত্তর তিনি দেননি। তবে অঞ্চল-৪-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিয়ার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনকল রিসিভ করেননি।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুব বলেন, ধোলাইখালের গল্পটি শুধু কয়েকজন তরুণের গাছ লাগানোর গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে একটি শহরের নাগরিক আচরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সেবার সীমাবদ্ধতার গল্প। তিনি বলেন, একদিকে সড়ক সংস্কার করে সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে সেই সড়কের বিভাজকেই মানুষ ময়লা ফেলার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছে। এরপর কয়েকজন তরুণ নিজেদের অর্থ খরচ করে সেখানে গাছ লাগাচ্ছেন, বেষ্টনী দিচ্ছেন, পানি দিচ্ছেন এবং মানুষকে বোঝাচ্ছেন, এখানে ময়লা ফেলবেন না। কিন্তু তাদের নিজেদের কথায়ই স্পষ্ট, এ উদ্যোগ একা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।





