কিংবদন্তি লালনসংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীনকে হারানোর এক বছর

Shahrier Islam Pallab
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩:৪১ অপরাহ্ন, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৪:৪৩ অপরাহ্ন, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আজ (১৩ সেপ্টেম্বর) লালনসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ও লালনসম্রাজ্ঞীখ্যাত ফরিদা পারভীনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভোগার পর গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর মারা যান এই বরেণ্য শিল্পী। মৃত্যুর এক বছর পরও তার কণ্ঠের গান, সংগীতসাধনা ও লালনের দর্শনের প্রতি তার নিবেদন শ্রোতাদের মনে অমলিন হয়ে আছে। ফরিদা পারভীন শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, লালনগীতি ও বাঙালির লোকজ দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রচারকও ছিলেন। তার কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান দেশ-বিদেশের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যায়। লালনের মানবতাবাদ, জীবনবোধ ও দর্শনকে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।

১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানার শাওল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদা পারভীন। তবে তার শৈশব ও বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়ায়। ছোটবেলায় মাগুরায় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে গানে তার হাতেখড়ি।

আরও পড়ুন: ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আসছে কাভিশ

১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে নজরুলসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তার সংগীতজীবন শুরু হয়। ১৯৭৩ সালের দিকে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে পরিচিতি পান তিনি। পরে সাধক মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে লালনসংগীতে তালিম নেওয়া শুরু করেন। এরপর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছ থেকেও তালিম নেন।

লালনের বাণী ও সুর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের অবদান ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়। তার গাওয়া লালনের গান দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও জনপ্রিয়তা পায়। গানের টানে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে।

আরও পড়ুন: প্রেম-রোমান্সনির্ভর নাটক-সিনেমা বন্ধ চেয়ে হাইকোর্টে রিট

সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। ১৯৯৩ সালে অন্ধ প্রেম চলচ্চিত্রের নিন্দার কাঁটা গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা গায়িকার সম্মান পান। ২০০৮ সালে জাপান সরকারের ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচার পুরস্কারও অর্জন করেন তিনি।

শুধু গান গাওয়াই নয়, পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে লোকসংগীত ও লালনগীতি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেও যুক্ত ছিলেন ফরিদা পারভীন। প্রায় ১৭ বছর আগে জীবনসঙ্গী প্রখ্যাত বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’। সেখানে লোকগান, নজরুলসংগীত, আধুনিক ও শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি ছবি আঁকা, গিটার ও তবলা শেখানো হয়।

বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী সংগীতের তালিম নিচ্ছেন। তিন বছর বয়সী শিশু থেকে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা—বিভিন্ন বয়সের মানুষ রয়েছেন তাদের মধ্যে।ফরিদা পারভীনের মৃত্যুর এক বছর পরও তার প্রতিষ্ঠিত সংগীত একাডেমিতে চলছে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ। প্রতিষ্ঠানটি এখন একাই সামলাচ্ছেন গাজী আবদুল হাকিম।

ফরিদা পারভীনকে স্মরণ করে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, তার শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তবে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। বাংলা লোকগান পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার যে স্বপ্ন ফরিদা পারভীন দেখেছিলেন, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

ফরিদা পারভীনের সঙ্গে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের সম্পর্ক ছিল বরেণ্য সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের। বড় বোন ও ছোট বোনের মতো ছিল তাদের সম্পর্ক। প্রিয় শিল্পীকে স্মরণ করে ফেরদৌসী রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, অন্যরা অনেক সময় মুখ দিয়ে গান গাইলেও ফরিদা পারভীনের গান শুনলে মনে হতো তিনি একেবারে ভেতর থেকে গাইছেন। গানের প্রতিটি কথা ও সারমর্ম উপলব্ধি করে তিনি গান গাইতেন।

ফেরদৌসী রহমান আরও বলেন, ফরিদা পারভীনের গান যেমন সহজ-সরল ও মিষ্টি ছিল, তার জীবনও ছিল তেমনই সহজ-সরল। তার মধ্যে কোনো জটিলতা দেখেননি তিনি। ফরিদা পারভীনের সন্তানদের ইচ্ছা ছিল, মাকে কুষ্টিয়া পৌর শহরে তার মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত করার। শেষ পর্যন্ত সেই ইচ্ছাই পূরণ হয়। কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।

প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে ফরিদা পারভীনকে স্মরণ করে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও সংগীত প্রতিষ্ঠান নানা আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ বেতারে আজ (১৩ সেপ্টেম্বর) প্রচার হবে তাকে নিয়ে এক ঘণ্টার বিশেষ অনুষ্ঠান। সেখানে তার গান পরিবেশন করবেন নাসরিন আক্তার বিউটি ও সাজিয়া সুলতানা পুতুল। বাঁশি বাজাবেন গাজী আবদুল হাকিম। এছাড়া আজ (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় অচিন পাখি সংগীত একাডেমিতেও থাকছে স্মরণ আয়োজন। সেখানে একাডেমির কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা ফরিদা পারভীনের জীবন ও সংগীতে তার অবদান নিয়ে আলোচনা করবেন।

আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের একটি মিলনায়তনে ফরিদা পারভীনের গান ও জীবন নিয়ে আরও একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন গাজী আবদুল হাকিম।

এক বছর ধরে ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে নতুন কোনো গান শোনা যায় না। তবে তার গাওয়া গান, শেখানো সুর, লালনের বাণী এবং সংগীতসাধনার উত্তরাধিকার এখনো বয়ে চলেছেন তার শিক্ষার্থীরা। গানে ও সাধনায় রেখে যাওয়া এই উত্তরাধিকারই বাঁচিয়ে রাখছে লালনসম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীনের স্মৃতি।