প্রতিভার ডানায় ভর করে স্বপ্নের সীমানায় মেহজাবীন নূর
ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর বয়স তার খুব বেশি নয়। অথচ এরই মধ্যে বিজ্ঞাপন, মডেলিং, নাটক ও চলচ্চিত্রে কাজ করে নিজের মতো করে একটি পরিচিতি তৈরি করেছে ছোট্ট মেহজাবীন নূর। বয়সের তুলনায় কাজের অভিজ্ঞতা যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি শুটিং সেটে তার সহজ-স্বাভাবিক উপস্থিতিও মুগ্ধ করে সহকর্মীদের। তবে এসব পরিচিতির আড়ালে মেহজাবীন এখনও সেই ছোট্ট শিশুই—যার কাছে ক্যামেরা, অভিনয় আর শুটিং অনেকটা আনন্দের খেলার মতো।
মাত্র চার বছর বয়স থেকেই ক্যামেরার সঙ্গে তার পথচলা। শুরুটা হয়েছিল গ্রামীণফোনের একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে। এরপর বিকাশ ও গ্রামীণফোনসহ পরিচিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন, মডেলিং এবং নাটকে কাজ করেছে সে। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে কাজের পরিধি, তৈরি হয়েছে নতুন অভিজ্ঞতা। তবে মেহজাবীনের সবচেয়ে বড় পরিচয় এখনও তার শিশুসুলভ সরলতা।
আরও পড়ুন: শিল্পকলায় শুরু ‘শিশু আনন্দ মেলা’
প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর স্মৃতি এখনও মনে আছে মেহজাবীনের। শুরুতে কিছুটা অস্বস্তি ও ভয় কাজ করলেও সেটের সবাই তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে স্বাভাবিক করে তুলেছিলেন। ধীরে ধীরে সেই ভয় কেটে যায়। এখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো তার কাছে একেবারেই স্বাভাবিক।
শিশুশিল্পী হিসেবে মেহজাবীনের একটি গুণের কথা প্রায়ই বলেন তার সঙ্গে কাজ করা মানুষজন—নির্দেশনা খুব দ্রুত বুঝে নেওয়া এবং সংলাপ মনে রাখার ক্ষমতা। একবার কোনো দৃশ্য বা সংলাপ বুঝিয়ে দিলে সাধারণত বারবার বলতে হয় না তাকে। নিজের মতো করে সেটি মনে রেখে ক্যামেরার সামনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভিনয় করার চেষ্টা করে।
আরও পড়ুন: ফের জুটি বাঁধছেন বিদ্যা-বাল্কি
নাটকে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও মেহজাবীনের বেশ সমৃদ্ধ। ‘শেষ বিকেলের গল্প’ নাটকে পরিচালক মাবরুর রশীদ মান্নাহর সঙ্গে কাজ করেছে সে। পাশাপাশি ‘চাকর যখন মালিক’ নাটকেও অভিনয় করেছে এই শিশুশিল্পী। নাটকটি পরিচালনা করেছেন মামুন আর রশিদ। এসব কাজের মাধ্যমে অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্মাতা ও শিল্পীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছে তার।
‘মায়া পাখি’ নাটকে জনপ্রিয় অভিনেতা অপূর্বর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও তার জন্য বিশেষ। মেহজাবীনের ভাষায়, অপূর্ব তাকে খুব আদর করেছেন এবং অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে বড় সংলাপও একবার শুনে মনে রাখতে পারার বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেছেন। একজন শিশুশিল্পীর জন্য এমন প্রশংসা নিঃসন্দেহে আনন্দের এবং অনুপ্রেরণার।
জনপ্রিয় আরও অনেক অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে কাজের সুযোগ হয়েছে তার। মোশাররফ করিমের সঙ্গেও নাটকে অভিনয় করেছে মেহজাবীন। ‘দুবাই বিউটি’তে জামিল হুসাইন, ‘জাদুমনি’তে মীর সাব্বিরসহ আরও অনেক শিল্পীর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
মেহজাবীনের অভিনয়যাত্রা শুধু নাটক বা বিজ্ঞাপনে আটকে নেই। ইতোমধ্যে ছয়টি চলচ্চিত্রে কাজ করেছে সে। এর মধ্যে ‘৭১-এর করতলে ছিন্ন মাথা’ ও ‘সুসময়’ সিনেমায় তার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি ‘অসময়’, ‘তাণ্ডব’, ‘উৎসব’ ও ‘অপারেশন জ্যাকপট’ সিনেমাতেও অভিনয় করেছে এই শিশুশিল্পী।
তার চলচ্চিত্রযাত্রার শুরু ‘৭১-এর করতলে ছিন্ন মাথা’ দিয়ে। রফিকুল আনোয়ার রাসেলের পরিচালনায় নির্মিত এই সিনেমায় মেহজাবীন যখন কাজ করে, তখন বয়স ছিল খুবই কম। সিনেমাটিতে ইমতিয়াজ বর্ষণ ও নাজিবা বাসার অভিনয় করেছেন তার মা-বাবার চরিত্রে। আর আনোয়ার শাহি ছিলেন তার দাদার চরিত্রে।
ছোট্ট মেহজাবীনের সঙ্গে কাজের সেই সময়ের স্মৃতি এখনও পরিবারের কাছে বিশেষ। শুটিংয়ের প্রয়োজনে তাকে কোলে-পিঠে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে সহশিল্পীদের। শিশুটিকে সামলে কাজের পরিবেশ তৈরি করতে তাদের যে আন্তরিকতা ছিল, সেটি মেহজাবীনের পরিবারের কাছেও কৃতজ্ঞতার স্মৃতি হয়ে আছে।
মেহজাবীনের অভিনয়জীবনের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় ‘সুসময়’। সিনেমাটির শুটিংয়ে তাকে বেশ কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়েছে। তবে মেহজাবীনের চেয়ে তার মায়ের দুশ্চিন্তাই ছিল বেশি।
শুটিংয়ের জন্য ভোর ৫টার দিকে নৌকায় উঠতে হতো। অনেক সময় পরদিন সকাল ৯টা-১০টা পর্যন্ত শুটিং চলেছে। এভাবে টানা কয়েক দিন নৌকায় শুটিং করতে হয়েছে। গাজীপুরের গহিন জঙ্গল, সেতুর নিচের অন্ধকার পরিবেশ, নোংরা পানির মধ্যে চলেছে কাজ।
মেহজাবীন এক নৌকায় শুটিং করত, আর তার মা দূরের আরেকটি নৌকায় বসে থাকতেন। দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন তিনি। অথচ মেহজাবীনের কাছে পুরো বিষয়টিই ছিল অনেকটা অভিযানের মতো। কখনো দুষ্টুমি করতে করতে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে, আবার শুটিং শেষ হলে হাসিমুখে ছুটে এসেছে।
একদিন দীর্ঘ সময় মেহজাবীনকে চোখের আড়ালে থাকতে হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর দূর থেকে মেয়েকে হাসতে হাসতে দৌড়ে আসতে দেখে মায়ের দুশ্চিন্তা মুহূর্তেই আনন্দে বদলে যায়। মাকে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট নূরের সরল মন্তব্য ছিল—‘মা, কী যে মজা হচ্ছে আজকে!’
এই একটি ঘটনাই যেন মেহজাবীনের অভিনয়কে দেখার দৃষ্টিটা পরিষ্কার করে দেয়। তার কাছে শুটিং কোনো চাপের বিষয় নয়; বরং আনন্দ, খেলা আর নতুন কিছু শেখার জায়গা।

ছবিঃ মেহজাবীন নূর
‘অপারেশন জ্যাকপট’ সিনেমাতেও মেহজাবীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রয়েছে। সিনেমাটির কাজ তার কাছে বিশেষ অভিজ্ঞতা। নিজের চরিত্রটি নিয়ে বিস্তারিত না বললেও মেহজাবীন জানিয়েছে, কাজটি করতে তার ভালো লেগেছে এবং দর্শকদেরও চরিত্রটি ভালো লাগবে বলে তার আশা।
এ ছাড়া ‘অসময়’, ‘তাণ্ডব’ ও ‘উৎসব’-এর মতো সিনেমাতেও কাজ করেছে সে। প্রতিটি কাজের অভিজ্ঞতাই তার কাছে আলাদা, কারণ প্রতিটি সেট থেকে নতুন কিছু শেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মেহজাবীনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো তার অভিনয় দক্ষতার চেয়েও তার স্বাভাবিক আচরণ। শুটিং সেটে যারা তার সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের অনেকের কাছেই সে আদরের ছোট্ট মানুষ। পরিচালকদের নির্দেশনা মন দিয়ে শোনা, সহশিল্পীদের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়া এবং কাজের ফাঁকে নিজের মতো করে থাকা—সব মিলিয়ে তার উপস্থিতি আলাদা করে নজর কাড়ে।
তার অভিভাবকের ভাষ্য, দেশের পরিচিত কয়েকজন শিল্পী, নির্মাতা ও কাস্টিং সংশ্লিষ্ট মানুষ মেহজাবীনের কাজ পছন্দ করে তাকে নতুন কাজের জন্য সুপারিশ করেছেন। নিলয় আলমগীর, আরওশ খান, সাগর মির্জা, জামিলসহ অনেকে যেমন তাকে স্নেহ করেন, তেমনি অমর চৌধুরী, রাহুল, মোস্তফা, শুভ, পাভেল ও কাস্টিং সংশ্লিষ্ট ফারুকসহ অনেক নির্মাতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকেও সহযোগিতা পেয়েছে সে।
অভিভাবকের কাছে এ ভালোবাসা অবশ্যই গর্বের। তবে মেহজাবীনের পরিবারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ভালোবাসা যেন তাকে বদলে না দেয়। কারণ, যত কাজই করুক, সে যেন তার শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দটুকু ধরে রাখতে পারে।
শোবিজে কাজ করলেও মেহজাবীনের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন অভিনয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায় সে। পড়াশোনাকে তাই সমান গুরুত্ব দেয় পরিবারও। মেহজাবীন মনে করে, অভিনয় তার ভালো লাগে এবং সুযোগ পেলে মানসম্মত কাজ করতে চায়। কিন্তু একই সঙ্গে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে ভবিষ্যতে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নও পূরণ করতে চায়। অভিনয় আর পড়াশোনার এই দুই পথকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার ইচ্ছাই হয়তো তার বয়সের তুলনায় সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।
ক্যামেরার বাইরের মেহজাবীনও আর দশটা শিশুর মতোই। পড়াশোনা, খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নতুন কিছু শেখার প্রতি তার আগ্রহ রয়েছে। শুটিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবার চেষ্টা করে তার স্বাভাবিক শৈশবটা যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়।
এ কারণেই হয়তো দীর্ঘ শুটিং, রাত জাগা কিংবা কঠিন লোকেশনের অভিজ্ঞতাও তার মনে ভয় তৈরি করেনি। বরং প্রতিটি কাজকে সে নতুন একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে নেয়। মেহজাবীনের ঝুলিতে এরই মধ্যে বেশ কিছু কাজ জমেছে। জাকারিয়া সৌখিনের ‘মায়া পাখি’, রুবেল হাসানের ‘যখন তুমি এলে’, রাইসুল তমালের ‘চাচ্চু’, ইবনে জুবায়েরের ‘ফুচকা মামা’, জিয়াউদ্দিনের ‘ভাঙা সংসার’, ‘আহা মজিদ’, ‘জাদুমনি’ ও ‘মামনি’সহ আরও কিছু কাজের সঙ্গে তার নাম যুক্ত হয়েছে।
তবে সামনে কী করবে, তা নিয়ে এখনই বড় কোনো দাবি নেই তার। বরং ভালো গল্প, সুন্দর চরিত্র এবং মানসম্মত কাজ—এই তিনটিই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
দর্শকদের কাছে তার ছোট্ট চাওয়া—ভালোবাসা ও দোয়া। সে যেন পড়াশোনা ভালোভাবে চালিয়ে যেতে পারে, একদিন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে এবং পাশাপাশি অভিনয়ের জগতেও ভালো কিছু কাজ উপহার দিতে পারে।
মেহজাবীন নূরের গল্প তাই শুধু একজন শিশু শিল্পীর ক্যামেরার সামনে আসার গল্প নয়। এটি একটি শিশুর স্বপ্ন, পরিবারের নিরলস সহযোগিতা, শুটিং সেটের মানুষের ভালোবাসা আর ধীরে ধীরে নিজেকে আবিষ্কার করার গল্প।
আজ যে ছোট্ট মেয়েটি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলে, কখনো নৌকার ওপর শুটিং করে, কখনো কঠিন লোকেশনে কাজ শেষ করে হাসতে হাসতে মায়ের কোলে ফিরে আসে—কাল সে হয়তো অন্য কোনো পরিচয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে।
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন আর অভিনয়ের ভালোবাসা—দুই পথই আপাতত পাশাপাশি হাঁটছে মেহজাবীনের জীবনে। আর সেই পথচলায় সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপারটি হলো, খ্যাতির আলোয় থেকেও সে এখনও তার শৈশবটাকে নিজের মতো করেই বয়ে নিয়ে চলছে।





