ইরানে অস্থিরতা ১১ দিনে পৌঁছালো, ৩৪ বিক্ষোভকারী নিহত
ইরানের বিভিন্ন স্থানে বুধবার রাতেও সহিংস বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংস সংঘর্ষ হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া অস্থিরতা টানা ১১তম দিনে গড়িয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স, যা বিপ্লবী গার্ডের ঘনিষ্ঠ, তারা জানিয়েছে–– দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরদেগান শহরে সশস্ত্র ব্যক্তিদের গুলিতে দুইজন পুলিশ নিহত হয়েছে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানে ৫.৮ মাত্রার ভূমিকম্প
সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা গেছে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর উত্তেজনাপূর্ণ মুখোমুখি অবস্থান, পেছনে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
অন্য কয়েকটি এলাকার ফুটেজে দেখা গেছে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের দিকে গুলি ও টিয়ার গ্যাস ছুড়ছে, আর বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুড়ছে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি: ইরানে বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হলে ‘শক্ত প্রতিক্রিয়া’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, বিক্ষোভ এখন পর্যন্ত ৩১টি প্রদেশের ১১১টি শহর ও নগরে ছড়িয়ে পড়েছে।
সংস্থাটি দাবি করেছে, অস্থিরতায় অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী ও চারজন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছে এবং দুই হাজার ২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিবিসি পার্সিয়ান ২১ জনের মৃত্যু ও পরিচয় নিশ্চিত করেছে, আর ইরানি কর্তৃপক্ষ পাঁচজন নিরাপত্তা সদস্যের মৃত্যুর খবর দিয়েছে।
বিক্ষোভ শুরু হয় ২৮শে ডিসেম্বর, যখন রাজধানী তেহরানে দোকানদাররা মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের তীব্র পতনে ক্ষোভ প্রকাশ করে রাস্তায় নামে।গত এক বছরে রিয়াল রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমে গেছে এবং মুদ্রাস্ফীতি ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিষেধাজ্ঞা, সরকারি দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে।
বিক্ষোভ শুরুর পর দ্রুতই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে যোগ দেয় এবং তা অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
জনতা প্রায়ই দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় এবং কখনো কখনো নির্বাসিত সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভীর পক্ষে স্লোগান শোনা যায়।
বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ
বুধবার বিবিসি পার্সিয়ানের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের উত্তর-পশ্চিমের শহর কাজভিনে জনতা বিক্ষোভ করছে এবং 'স্বৈরাচারীর মৃত্যু হোক', 'শাহ দীর্ঘজীবী হোক' এরকম স্লোগান দিচ্ছে।
বন্দর আব্বাসের ফুটেজে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা 'পুলিশ বাহিনী, সমর্থন করো, সমর্থন করো' বলে স্লোগান দিচ্ছে; যদিও পরে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শিয়া পবিত্র শহর মাশহাদে বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে এবং তাদের পিছু হটতে বাধ্য করতে দেখা গেছে।
অন্য এক ভিডিওতে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত পাহলভি রাজবংশের পক্ষে স্লোগান শোনা গেছে।
বিকেলের দিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আবাদান শহরে, যা ইরাক সীমান্তের কাছে, বড় বিক্ষোভ হয়েছে। বিবিসি পার্সিয়ান যাচাই করা ফুটেজে দেখা গেছে বিক্ষোভকারীরা "কামান, ট্যাংক, আতশবাজি! মোল্লারা বিদায় নাও"—যা ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বকে উদ্দেশ্য করে বলা—এই স্লোগান দিচ্ছে।
শহরের একটি বারান্দা থেকে ধারণ করা আরও ফুটেজে দেখা গেছে–– নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালাচ্ছে এবং পাথর ও অন্যান্য বস্তু ছুড়ে এগিয়ে আসতে থাকা বিক্ষোভকারীদের সামনে থেকে সরে যাচ্ছে।
রাত নামার পর পশ্চিমাঞ্চলীয় আলিগুদারজ শহরে নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করেছে। এর আগে জনতা একটি চত্বরে জড়ো হয়ে 'জনতার বিদ্রোহ, জিন্দাবাদ' বলে স্লোগান দিচ্ছিল।
লোরদেগানের বিষয়ে ফার্স জানিয়েছে, বুধবারের বিক্ষোভে দুই পুলিশ নিহত হয়েছে, যাদের নাম হাদি আজারসালিম ও মুসলেম মাহদাভিনাসাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা 'দাঙ্গাকারীদের' একটি দলের মধ্যে থাকা 'সশস্ত্র ব্যক্তিদের' গুলিতে নিহত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে খবরে।
বিবিসি এবং অন্যান্য স্বাধীন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে ইরানের ভেতর থেকে সংবাদ প্রচারের অনুমতি দেওয়া হয় না অথবা অনুমতি পেলেও তাদের চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় এই খবর তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তবে লোরদেগান অস্থিরতার সময় সহিংস সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, যেখানে গত বৃহস্পতিবার দুই বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিলেন।
কী বলছে ইরানের সরকার
বুধবার ইরানের মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর নির্বাহী বিষয়ক ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জাফর কায়েমপানাহ জানান, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান নির্দেশ দিয়েছেন যে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে 'কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা' নেওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, "যারা আগ্নেয়াস্ত্র, ছুরি ও দা বহন করে এবং পুলিশ স্টেশন ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তারা দাঙ্গাকারী। আমাদের বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গাকারীর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে"।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সরকার সাত কোটি ১০ লাখ (৭১ মিলিয়ন) নাগরিককে মাসিক সাত ডলার সমপরিমাণ নতুন ভাতা দেওয়া শুরু করেছে।
এদিকে বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেছেন, 'দাঙ্গাকারীদের' দ্রুত বিচার ও শাস্তি দেওয়া হবে যাতে তা অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে।
সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শনিবার বলেছেন, কর্তৃপক্ষের উচিত "বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলা", তবে "দাঙ্গাকারীদের তাদের জায়গায় রাখা" দরকার।
তার এই মন্তব্য আসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর, যেখানে তিনি বলেন, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে। তিনি বলেন, "আমরা প্রস্তুত"।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক ড. সানাম ভাকিল বিবিসিকে বলেছেন, বিক্ষোভ দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে এবং তা জনসাধারণের গভীর ক্ষোভ দ্বারা চালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, "মানুষ বিরক্ত। তাদের ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রতিদিনের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে"।
"যদি আরও গতি আসে এবং আরও মানুষ রাস্তায় নামে, (বিক্ষোভ) আরও গুরুতর হবে এবং অবশ্যই তখন সরকারের প্রতিক্রিয়া আরও সহিংস হবে"।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যাপক সাদেঘ জিবাকালাম বলেছেন, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির কারণে ইরানি কর্তৃপক্ষ হয়তো কঠোর দমন-পীড়ন থেকে বিরত থাকছে।
তিনি বিবিসিকে বলেন, "কিছু ইরানি নেতা—বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার ও নিরাপত্তা বাহিনী—হয়তো এবার কিছুটা সতর্ক এবং জনতাকে দমন করতে তাড়াহুড়ো করছে না, কারণ তারা আশঙ্কা করছে এতে মার্কিন হস্তক্ষেপ হতে পারে"।
এই বিক্ষোভ ২০২২ সালের সেই বিদ্রোহের পর সবচেয়ে ব্যাপক, যা নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হয়েছিল। তরুণ কুর্দি নারী মাহসা আমিনি নৈতিকতা পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন, অভিযোগ ছিল তিনি সঠিকভাবে হিজাব পরেননি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সেই বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে ৫৫০ জনের বেশি নিহত এবং ২০ হাজার মানুষ আটক হয়েছিল।





