গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ছিনতাই নীরব চাঁদাবাজি

Sanchoy Biswas
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:০৫ অপরাহ্ন, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৮:০৫ অপরাহ্ন, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

শিল্পনগরী গাজীপুরে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। সদর উপজেলা, টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর ও শ্রীপুরের শিল্পাঞ্চল থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও হুমকি-ধমকির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, যা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। তবে গাজীপুরের পুলিশ সুপার শরিফ উদ্দিন বলেছেন, পুলিশ অপরাধীদের দমনে সক্রিয় রয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। দেশের রপ্তানি খাত ও অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য গাজীপুর গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন এলাকা। কিন্তু সেখানে সন্ধ্যা নামলেই রাস্তায় চলাচলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। সরেজমিন ঘুরলে বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যায় কিশোর ও যুবক বয়সের ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্রের মুখে রিকশা বা অটোরিকশার গতিরোধ করে টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। কখনও অন্ধকারে পথ আটকে, কখনও আবার থেমে থাকা বাসের জানালা দিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হয় মুঠোফোন ও গয়না। বাধা দিলে ছুরিকাঘাত করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গত ৬ মাসে গাজীপুর মহানগরে দস্যুতা ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৩৪টি মামলা হয়। এর আগের ৬ মাসে মামলা হয় ২৬টি। যদিও অনেক ঘটনার ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী মামলা করতে যেতে চান না। কারণ, হয়রানি ও ভোগান্তির আশঙ্কা থাকে। এ কারণে পুলিশের পরিসংখ্যানে অপরাধের প্রকৃত চিত্র আসে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কিছু ঘটনায় মূল্যবান জিনিসপত্র হারানোর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়।

ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি হয় গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায়। সেখানেই ছিনতাইকারীরা সাংবাদিক আসাদুজ্জামানকে কুপিয়ে হত্যা করেছিল। ওই হত্যায় গ্রেফতার হওয়া ৯ জনই ছিনতাইকারী ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। গাজীপুরে ফুটপাত, পরিবহন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজির কয়েকটি ঘটনা সম্প্রতি সামনে এসেছে। অনেক ঘটনা সামনে আসছে না। যদিও ভুক্তভোগী হচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। চাঁদাবাজির খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে চাঁদাবাজদের রোষানলে পড়েছেন এবং হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকেরাও। এসব ঘটনার নেপথ্যে রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্রয়ের অভিযোগও রয়েছে। এ অবস্থায় গত কয়েক সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন স্থানে পৃথক হত্যার ঘটনাও ঘটে। কোনাবাড়ী ও কালিয়াকৈর এলাকায় পূর্ববিরোধ ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে খুনের ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। শ্রীপুর এলাকাতেও তুচ্ছ বিরোধ থেকে ছুরিকাঘাতে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয়ভাবে আলোড়ন তোলে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ জানিয়েছে। অন্যদিকে, অজ্ঞাত পরিচয় লাশ উদ্ধারের ঘটনাও মাঝে মধ্যে ঘটছে, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে। যদিও পুলিশ বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃতি উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। এদিকে, গতকাল শনিবার শ্রীপুরে সড়কের পাশ থেকে এক যুবকের পোড়া লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের এমসি বাজার-বরমী আঞ্চলিক সড়কের বৃন্দাবন চৌরাস্তা এলাকার গজারি বনের পাশ থেকে ওই যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাছির আহমদ। তিনি বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে আগুনে পোড়া লাশটি উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত ওই যুবকের বয়স ২০ বছর। তবে ধারণা করা হচ্ছে, অজ্ঞাত খুনীরা তাকে হত্যার পর নির্জন গজারী বনের পাশে এনে শুকনো পাতা খড়কুটোর মাধ্যমে তাকে পুড়ানো হয়। এতে তার শরীর পুড়ে আঙ্গার হয়ে গেছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে পুলিশ। গত মঙ্গলবার গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার পৌর এলাকার সবুজবাগে প্রাইভেট পড়তে যাওয়া এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে আলমগীর হোসেন (৩০) নামে এক শিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত আলমগীর হোসেন উপজেলার সিঙ্গারদীঘি গ্রামের বাসিন্দা এবং তিনি শ্রীপুরে একটি ভাড়া বাসায় কোচিং সেন্টার পরিচালনা করতেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রাইভেট পড়ানোর সময় তিনি ওই শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি করেন।

আরও পড়ুন: বায়তুল মোকাররম এলাকায় কাটা হাত-পা উদ্ধার, ফিঙ্গারপ্রিন্টে পরিচয় শনাক্ত

ওই দিন বিকেলে শ্রীপুরে ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা চালক আতাউর রহমানকে (৩২) অপহরণ করে মারধর ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় শ্রীপুর থানায় মামলা রুজু হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাছির আহমদ জানান, ভুক্তভোগী অটোরিক্সা চালকের স্ত্রীর বড় ভাই রেজাউল করিম (৩০) বাদী হয়ে গত সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে পাঁচ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত চার জনকে আসামী করে শ্রীপুর থানায় মামালা দায়ের করে। পরে পুলিশ ওই রাতেই মামলার দু’জন এবং অপর এক আসামিকে গ্রেফতার করে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে গাজীপুরের পুলিশ সুপার শরিফ উদ্দিন বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তৎপর রয়েছে। নিয়মিত টহল, চেকপোস্ট ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর অধিকাংশেই আসামি শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। সচেতন মহলের মতে, দ্রুত নগরায়ন ও বিপুল শ্রমিকসমাগমের কারণে গাজীপুরে অপরাধের ঝুঁকি সবসময়ই তুলনামূলক বেশি। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা। শিল্পনগরী হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা গাজীপুরে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।