সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি হলে দুর্নীতি হ্রাস পাবে: বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৬:৩৭ অপরাহ্ন, ১২ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৬:৫৯ অপরাহ্ন, ১২ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করা হলে দুর্নীতি কমবে। এমসয় তিনি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

আরও পড়ুন: নতুন বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতি: ফখরুল

অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও তাদের বেতন কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হয়নি। গত ১১ বছর ধরে নতুন কোনো পে-স্কেল কার্যকর না হওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ সরাসরি সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর পড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, বেসরকারি খাতে বিভিন্ন সময়ে বেতন সমন্বয় হলেও সরকারি খাতে সে ধরনের সুযোগ সীমিত ছিল। ফলে অনেক কর্মচারীর জন্য পারিবারিক ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সংকট তৈরি হলে অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতি ঝোঁক তৈরি হতে পারে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করলে তারা আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে উৎসাহিত হবেন বলে সরকার আশা করছে। তিনি বলেন, আয় বৃদ্ধি এবং জীবনমানের উন্নয়নের ফলে দুর্নীতির হার কমতে পারে এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা বাড়বে।

আরও পড়ুন: বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ নেই: এনবিআর চেয়ারম্যান

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এবারের বাজেটের বিশেষ প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ এমন একটি বাজেট প্রত্যাশা করছে, যেখানে তাদের চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা ও উন্নয়নের স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সরকার বাজেট প্রণয়ন করেছে।

তিনি জানান, সাধারণত জাতীয় বাজেট প্রস্তুতের জন্য প্রায় ছয় মাস সময় পাওয়া যায়। তবে বর্তমান সরকার মাত্র দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে বাজেট প্রস্তুত করেছে। স্বল্প সময়ের মধ্যেও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত সংগ্রহ করে তাদের চাহিদা ও প্রত্যাশাকে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমিত সম্পদের বাস্তবতার মধ্যেও সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করেছে। এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করা এবং উন্নয়নের মূলধারার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আওতায় নিয়ে আসা।

এসময় তিনি উল্লেখ করেন, বাজেট প্রণয়নের সময় সমাজের কোনো শ্রেণি, পেশা, ধর্ম বা গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করা হয়নি। সীমিত সম্পদের মধ্যেও সবার জন্য কমবেশি বরাদ্দ, উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বাস্তবায়নের রোডম্যাপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো অংশগ্রহণমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

অর্থমন্ত্রী দেশের অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত দেড় দশকে দেশের সম্পদ লুটপাট, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সীমিত সম্পদের মধ্যে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরও বলেন, অতীতে অর্থনীতি কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল। পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক সেই অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে এবারের বাজেটে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজেট ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ধীরে ধীরে কমিয়ে বেসরকারি বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহ সচল রাখতে এই নীতি বাস্তবায়নে আগ্রহী সরকার।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এখন নিয়মভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে ক্রমশ সুরক্ষাবাদী নীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও পড়ছে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে সরকারি ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এগুলো হলো— অর্থের যথাযথ ব্যবহার (ভ্যালু ফর মানি), বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাবর্তন (রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট), কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিবেচনা। সরকারের প্রতিটি প্রকল্প ও ব্যয় এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। অপচয়নির্ভর অর্থনীতি নয়, বরং নীতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই তার সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, সরকার ধীরে ধীরে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নের উৎস জোরদার করার পথে এগোচ্ছে। অর্থনীতিতে সরকারি বিনিয়োগ (পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট) বাড়ানোর ওপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অতীতে যেখানে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ছিল, সেখানে তা বাড়িয়ে ১৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তার মতে, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজস্ব আয়ও বাড়াবে।

অর্থ সচিব জানান, চলতি অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সরকারের সামনে এখন বিকল্প অর্থায়নের বেশ কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি সরকার ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুকুক বন্ড ইস্যু করেছে, যা ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। এ বন্ডের বিপরীতে প্রায় ৭২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আবেদন জমা পড়েছে। এতে বোঝা যায়, বাজারে বিকল্প বিনিয়োগ মাধ্যমের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

অর্থ সচিব বলেন, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে ইক্যুইটি ও বাজারভিত্তিক অর্থায়নের দিকে যেতে চায়। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রিন বন্ড, অরেঞ্জ বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের বন্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের পুঁজিবাজার ও আর্থিক বাজারকে আরও গভীর ও কার্যকর করার প্রচেষ্টা চলছে।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এসব সংস্কার ও নতুন অর্থায়ন কাঠামোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং অর্থায়নের উৎস আরও বহুমুখী হবে।