পৃথিবীর খনিজ সম্পদে শক্তি প্রদর্শনের নতুন মার্কিন মিশন ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিবর্তে শক্তি প্রদর্শনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা এবার সরাসরি বাস্তব রূপ পেয়েছে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়, বরং বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে উপেক্ষা করার স্পষ্ট বার্তা।
আরও পড়ুন: বিক্ষোভে উত্তাল ইরান: দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান যে ‘আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার’ নয়, বরং ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগকেই প্রাধান্য দিচ্ছে—তা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাস্তব বিশ্ব চলে শক্তি, ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে, কাগুজে নীতিমালার মাধ্যমে নয়।
স্টিফেন মিলার আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে দেশটি সেই অবস্থান আগের চেয়ে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করবে। তাঁর এই বক্তব্যকে নিছক রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখছেন না আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
আরও পড়ুন: নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ২০০ সদস্যের প্রতিনিধিদল পাঠাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে বন্দী করার ঘটনাকে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বৈদেশিক নীতির বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। তাঁদের মতে, এই পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিপজ্জনক নজির তৈরি করেছে, যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্র চাইলে যেকোনো দেশের নেতৃত্বকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সরিয়ে নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসী অবস্থান বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের ধারণা দুর্বল হলে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
মাদুরোকে তুলে আনার ঘটনাকে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অভিযান’ বলছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে বাস্তবে এ ঘটনা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যুদ্ধে জড়ানোর শামিল, যার জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করেননি ট্রাম্প।
প্রশ্ন হলো, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধানকে তুলে এনে কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়? আরও বড় প্রশ্ন, মাদুরোকে অপসারণের পর ভেনেজুয়েলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আছে কি? বরং এ ঘটনায় ভেনেজুয়েলায় এক নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার শেষ কোথায়, কেউ জানে না।
‘ভেনেজুয়েলা–কাণ্ডের’রেশ কাটতে না কাটতেই ট্রাম্পের হুমকির তালিকায় যুক্ত হয়েছে কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও ইরান। একই সঙ্গে নতুন করে সামনে এসেছে গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ। মিলারের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এতটাই শক্তিশালী যে গ্রিনল্যান্ডকে তারা ‘সহজে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে’ নিয়ে আসতে পারবে। অথচ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ এবং ডেনমার্ক সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য। এই বক্তব্য কার্যত মিত্ররাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকেও তুচ্ছ করার শামিল।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই দৃষ্টিভঙ্গি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী মার্কিন নেতৃত্বের মূল দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত। আটলান্টিক সনদ, জাতিসংঘ সনদ বা ন্যাটোর ভিত্তি ছিল শক্তিশালী রাষ্ট্র দুর্বল রাষ্ট্রকে জবরদস্তি করতে পারবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অবস্থান সেই নীতিকে অগ্রাহ্য করে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই ‘বলপ্রয়োগের রাজনীতি’ নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠছে। ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স একে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গেই সরাসরি তুলনা করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমরা শক্তিশালী বলেই কি সব দেশ চালাব? এটা কি আদৌ আমেরিকার জনগণের চাওয়া?’
ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক ও তাঁর দল রিপাবলিকানদের অনেকের কাছে এই ‘আগ্রাসী অবস্থান’ হয়তো আকর্ষণীয় হতে পারে। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও কমতে থাকা জনপ্রিয়তার মধ্যে ট্রাম্প কি সত্যিই একের পর এক দেশ ‘শাসন’ করতে পারেন—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে। আসন্ন এ নির্বাচনেই ট্রাম্পের ‘বলপ্রয়োগের’ এই মার্কিন কৌশল রাজনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করবেন আমেরিকানরা। তবে তত দিনে বিশ্ব কতটা বদলে যাবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।





