রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার শুরু
নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় মিয়ানমার
নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) সোমবার (১২ জানুয়ারি) থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে দায়ের করা ঐতিহাসিক মামলার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া ২০১৯ সালে ওআইসি-র পক্ষ নিয়ে এই মামলাটি দায়ের করেছিল।
এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই প্রথম কোনো গণহত্যার মামলা, যা আইসিজে-তে পূর্ণাঙ্গ শুনানিতে গড়াচ্ছে। নেদারল্যান্ডসের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় পিস প্যালেসে শুরু হওয়া এই আইনি লড়াই আগামী তিন সপ্তাহ ধরে চলবে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মামলার গতিপ্রকৃতি কেবল মিয়ানমারের জবাবদিহিই নিশ্চিত করবে না, বরং বৈশ্বিক মানবাধিকার রক্ষা এবং গণহত্যার আইনি সংজ্ঞায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
আরও পড়ুন: ইরানে পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে: আরাঘচি
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক বাহিনী তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরু করে। এই অভিযানের ফলে অন্তত ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু মুসলিম ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ এবং শত শত গ্রামে অগ্নিসংযোগের ভয়াবহ চিত্র। জাতিসংঘের একটি বিশেষ অনুসন্ধানী দল (ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন) ২০১৯ সালে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সেই অভিযান ছিল স্পষ্টত ‘গণহত্যামূলক উদ্দেশ্য’ প্রণোদিত।
ওআইসি-র পক্ষ থেকে পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম প্রধান দেশ গাম্বিয়া এই ঐতিহাসিক মামলার নেতৃত্ব দিচ্ছে। ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগে তারা মিয়ানমারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। গাম্বিয়া দাবি করেছে, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের একটি জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নির্মূল করার চেষ্টা করেছে। ২০২০ সালে আদালত একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করেছিল, যেখানে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং গণহত্যার প্রমাণ নষ্ট না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান শুনানিটি মামলার সেই মূল অভিযোগগুলো প্রমাণের চূড়ান্ত ধাপ।
আরও পড়ুন: ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিহত বেড়ে ৫৩৮
এবারের শুনানিতে প্রথমবারের মতো সরাসরি ভুক্তভোগী রোহিঙ্গাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় মাইলফলক, কারণ আন্তর্জাতিক আদালতে ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর সরাসরি শোনার সুযোগ খুব কমই ঘটে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে এবং ভুক্তভোগীদের গোপনীয়তা রক্ষার খাতিরে এই অধিবেশনগুলো জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে না।
জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রধান নিকোলাস কোউমজিয়ান বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘এই মামলাটি গণহত্যার সংজ্ঞা এবং এটি কীভাবে প্রমাণিত হতে পারে, সে বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করবে।’ আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মামলার রায় গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান দক্ষিণ আফ্রিকার মামলার ওপরেও আইনি ও নৈতিক প্রভাব ফেলবে।
মিয়ানমার বরাবরই গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, সামরিক অভিযানটি ছিল আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি বৈধ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। ২০১৯ সালের প্রাথমিক শুনানিতে মিয়ানমারের তৎকালীন বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চি সশরীরে হাজির হয়ে এই অভিযোগগুলোকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
তবে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জান্তা সরকার ক্ষমতা দখল করার পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বর্তমানে মিয়ানমারজুড়ে গৃহযুদ্ধ চলছে এবং জান্তা সরকার একতরফা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলো ‘প্রহসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থায় মিয়ানমারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি।
নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত পিস প্যালেসে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় দুপুর ৩টা) এই শুনানি শুরু হয়। টানা তিন সপ্তাহ ধরে চলবে এই আইনি লড়াই, যেখানে উভয় পক্ষ তাদের যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করবে। খবর : রয়টার্স





