সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার হবে: পেন্টাগন
যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ সেনাসদস্যকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে। আগামী ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে এ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষও এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য দেখতে পারবেন। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তাও বিবিসিকে সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আরও পড়ুন: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা নয়: ট্রাম্প
হেগসেথ বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করব, মানুষ যেন এটি দেখতে পারে। এ ধরনের অপরাধের পরিণতি কতটা গুরুতর, তা সবার বোঝা প্রয়োজন।’
২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটির একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে গুলি চালিয়ে নিরস্ত্র ১৩ মার্কিন সেনাসদস্যকে হত্যা করেন নিদাল হাসান। ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা হাসান মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
আরও পড়ুন: রিয়াদে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, স্কুল-ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত
২০১৩ সালে সামরিক আদালতে বিচার চলাকালে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন। তার দাবি ছিল, আফগানিস্তানে মুসলিম ও তালেবানদের রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ওই হামলা চালিয়েছিলেন। আদালতে নিজের ‘ভুলের’ জন্য ক্ষমাও চান তিনি।
পেন্টাগন জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সুপারিশ অনুমোদন করেছেন। তবে মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের সমর্থন রয়েছে কি না, তা জানতে হোয়াইট হাউসের কাছে প্রশ্ন পাঠিয়েছে বিবিসি।
এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে ছয় দশকের বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটিতে প্রথমবারের মতো সামরিক ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটবে।
তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ও সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠেছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়ে কাজ করা আইনজীবী জন মিলস বলেছেন, আধুনিক যুগে এমন সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন এবং এর আইনি ভিত্তিও অনিশ্চিত।
তার মতে, হাসানের আপিলপ্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। তিনি ফেডারেল আদালতে দণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মিলসের ভাষায়, মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগ ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও কম।
ইয়েল ল স্কুলের অতিথি প্রভাষক ইউজিন আর ফিডেলও সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেছেন। তার মতে, মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করা মধ্যযুগীয় মানসিকতার প্রতিফলন। আইনি লড়াই শুরু হলে তা ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদের চেয়েও দীর্ঘ হতে পারে।
অন্যদিকে ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে এর আগে কখনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হয়নি। এমন উদ্যোগ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনসাধারণের সামনে অভূতপূর্ব স্বচ্ছতা আনতে পারে।
তবে সম্প্রচারটি কোথায় দেখানো হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সরাসরি সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে। টিকটকেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এক্সেও মৃত্যুর দৃশ্যসংবলিত কনটেন্ট নিয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের ১৭টি দেশে ২ হাজার ৭০০টির বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা জানা গেছে শুধু ইরান ও আফগানিস্তানে। ইরানে ১১টি এবং আফগানিস্তানে ছয়টি প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
সংস্থাটির হিসাবে, গত বছর সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা দেশগুলোর মধ্যে ছিল চীন, ইরান, সৌদি আরব, ইয়েমেন ও যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ বছর বিরতির পর ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ বছরে ফেডারেল পর্যায়ে ১৩টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ফেডারেল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে স্থগিতাদেশও বাতিল করেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৬১ সালে। সে সময় ১১ বছর বয়সী এক অস্ট্রীয় শিশুকে ধর্ষণের দায়ে দণ্ডিত এক সেনাসদস্যকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার ওই মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেছিলেন।
আর সর্বশেষ সামরিক ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে সেনাবাহিনী থেকে পালানোর দায়ে মার্কিন সেনাসদস্য এডি স্লোভিককে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।





