হুতি হামলায় বিপর্যস্ত সৌদি
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে গত শনিবার আকস্মিক প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কমপক্ষে ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত হয়েছেন। ঘটনাটি উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতকে নতুন মোড় দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে খ্যাত সৌদি আরব হুতিদের একের পর এক হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা শুরুর পর উপসাগরীয় কোনো দেশে এটিই সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলা, যা রক্তাক্ত সামরিক জবাবের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে সবকিছু। সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলার কারণে দেশটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে। এতে সোমবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আকাশ প্রায় ফাঁকা ছিল।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী জানিয়েছে, রবিবারও রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৪ নিশানা করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে সেখানে আগুন ধরে যায়। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনায় একজন নিহত ও অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। রবিবারের হামলার কারণে চলতি সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে মোট নিহত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮। শনিবারের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক এবং অন্যরা বিদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
আরও পড়ুন: অর্থনীতিতে নোবেল জয় করলেন রবার্ট হল, মাইকেল উডফোর্ট
সৌদি জোট জানিয়েছে, সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গতকাল কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করেছে। এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে একটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। সোমবার স্থানীয় সময় ভোরে দক্ষিণাঞ্চলীয় আবহা শহরে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। এরই মধ্যে দাম্মাম বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সৌদি আরবে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তাদের দেশের নাগরিকদের জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দর ছাড়া বাকি সব বিমানবন্দরে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। মার্কিন বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ মার্কিন এয়ারলাইনসগুলোকে সৌদিতে বা সৌদির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বনের নোটিশ জারি করেছে।
আরও পড়ুন: চীনে উচ্চশিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতিতে আগ্রহ বাড়ছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার বলেছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তারই অংশ হিসেবে এই সংঘাতের বিস্তার ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রও হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির হামলায় যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।
টেলিগ্রামে এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তিনি তাঁর সৌদি প্রতিপক্ষকে জানিয়েছেন, তেহরান সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে আলোচনা শুরু করতে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
সৌদি কর্তৃপক্ষ পৃথকভাবে ঘোষণা দিয়েছে, রিয়াদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে সশরীর উপস্থিতির বদলে গতকাল থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অনলাইন ক্লাস চালু থাকবে।
ইয়েমেনের হুতিদের প্রাণঘাতী হামলার পর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সময় বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে সোমবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আকাশ প্রায় ফাঁকা ছিল। সৌদি আরবের জেদ্দার পর দ্বিতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। শনিবারের হামলার পর থেকে বিমানবন্দরটি বন্ধ রয়েছে।
বিমান চলাচলবিষয়ক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার নির্ধারিত মোট ফ্লাইটের ৯৯.৭ শতাংশ বাতিল করা হয়েছে। ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্যেও দেখা গেছে, সোমবার উড়োজাহাজগুলো রিয়াদের আকাশ এড়িয়ে চলছিল। তবে সৌদি আরবের আকাশসীমা দিয়ে উড়োজাহাজ চলাচল এবং দেশটির পশ্চিম উপকূলের প্রধান বিমান চলাচল কেন্দ্র জেদ্দায় অবতরণ অব্যাহত ছিল।
এ পরিস্থিতিতে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বিমান সংস্থা ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। লুফথানসা গ্রুপ ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম সৌদি রাজধানীতে যাওয়া ও সেখান থেকে আসা ফ্লাইট চলাচল স্থগিত রাখার আগের সিদ্ধান্তের মেয়াদ বাড়িয়ে মাসের শেষ পর্যন্ত করেছে। আবুধাবিভিত্তিক ইতিহাদ এয়ারওয়েজও সৌদি আরবগামী ফ্লাইট বাতিলের সময়সীমা আরও বাড়িয়েছে। এর ফলে সোমবার ও মঙ্গলবার রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামগামী প্রায় ২০টি ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে।
হুতিদের সঙ্গে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এর ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছর সৌদি আরবের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৩.৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে কমে যাওয়া তেল খাতের কার্যক্রমসহ একাধিক বিষয়কে দায়ী করা হয়েছে।
হামলার কারণে চলতি মাসে রিয়াদে নির্ধারিত বিভিন্ন আয়োজনও চাপে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের প্রধান বিনিয়োগ সম্মেলন এবং ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের (ডব্লিউপিসি) এনার্জি কংগ্রেস। এসব আয়োজনে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও কর্মসূচি থেকে বাদ পড়েছেন বেশ কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহী।
হামলার দায় স্বীকার হুতিদের: টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি রিয়াদে শনিবার চালানো হামলার দায় স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, তাদের গোষ্ঠীটি সৌদির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দাম্মাম বিমানবন্দর এবং সৌদি তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর দুটি স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে। এর আগে রবিবার হুতিরা সৌদি বিমানবন্দর ব্যবহারের বিরুদ্ধে তাদের সতর্কতা পুনর্ব্যক্ত করে। গোষ্ঠীটি জানায়, ‘আমরা সবাইকে আমাদের সতর্কবার্তা গুরুত্বসহকারে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি; প্রতিহত করার যেকোনো ব্যর্থতার দায় সৌদি আরবকেই নিতে হবে।’
ঢাকা থেকে ৫১ ফ্লাইট বাতিল-স্থগিত, ভোগান্তিতে সাড়ে ৫ হাজার যাত্রী: এদিকে, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ৫১টি ফ্লাইটে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে কিছু ফ্লাইট বাতিল ও কিছু স্থগিত হয়েছে। এসব ফ্লাইটের ৫ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাঁদের ঢাকা থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল। গতকাল সোমবার বিকেলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছে। গত শনিবার রাত থেকে সোমবার বিকেল পর্যন্ত এসব ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হয়েছে।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, ৫১টি ফ্লাইটের মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ফ্লাইট ১২টি। বাকি ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট।
মক্কা-মদিনার ওপর হুমকি এলে বাংলাদেশ বসে থাকবে না: শামা ওবায়েদ—অন্যদিকে, সৌদি আরবে অবস্থিত পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার ওপর কোনো হুমকি এলে বাংলাদেশ বসে থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, মক্কা-মদিনা সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে ঐক্যের জায়গা। এটা সাধারণ কোনো কূটনীতির বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের আবেগ কাজ করে। সুতরাং মক্কা ও মদিনার ওপর কোনো হুমকি এলে, আর বাংলাদেশ যেহেতু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, আমরা বসে থাকব না। অবশ্যই আমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেব।
সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ: এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ মিশন। একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নিজেদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে মিশন জানায়, চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কোনো ধরনের তথ্য, ছবি বা ভিডিও ধারণ, আদান-প্রদান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা সৌদি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
প্রসঙ্গত, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের দ্বন্দ্ব বেশ পুরোনো। এ দ্বন্দ্ব ফের নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ২০১৪ সালে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়, যখন শিয়াঅধ্যুষিত অঞ্চলে অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এরপর ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি জোট হুতিদের হটাতে সামরিক অভিযান শুরু করে, যা ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়। এই যুদ্ধে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে, চরম মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।
এরপর ২০২২ সালে হুতি ও সৌদি সরকারের সমর্থক দেশগুলোর মধ্যে অনানুষ্ঠানিক বিভাজনে যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পায়। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ কৌশলগত নতুন পরিস্থিতি তৈরি করে, যার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের সমীকরণ পাল্টে যায়। ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রাভিযান তীব্র হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইয়েমেনের উপকূলীয় জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বৃদ্ধি পায়। আর এই সুযোগে লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে হুতিরা বিভিন্ন অঞ্চল দখল করতে শুরু করে। যুদ্ধের পাঁচ মাস পর পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়; একদিকে সৌদি আরব হুতিদের ওপর বিমান হামলা জোরদার করে, অন্যদিকে ইরানি বিমান যাতে অবতরণ করতে না পারে, সে জন্য সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার সানা বিমানবন্দরে নিজেরাই বোমাবর্ষণ করে।





