বাগেরহাট ও যশোর ডিসির নিদারুণ নিষ্ঠুরতার অভিযোগ

‘মৃত শিশু দেখা করতে গেছে তার জীবিত পিতার সাথে’ ঘটনায় তোলপাড়

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:১২ অপরাহ্ন, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৮:১২ অপরাহ্ন, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে শনিবার মধ্যরাতে দাফন করা হয়েছে যশোর কারাগারে বন্দি থাকা ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা এবং তাদের নয় মাস বয়সী শিশুসন্তানকে। তবে দাফনের আগে তাদের শেষ সাক্ষাত হলো যশোর কারাগারের গেইটে। এই ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

কানিজ সুবর্ণা এবং তাদের শিশুর দাফনকে ঘিরে প্রশাসনের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ এবং অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের একটি পোস্ট বিশেষভাবে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে লেখা ছিল: "মৃত শিশু দেখা করতে গেছে, তার জীবিত পিতার সাথে।"

আরও পড়ুন: নির্বাচনের দিন ও আগে সহিংসতার দায় আ.লীগের: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার

এই লাইনটি ব্যবহার করে পোস্টার, ফটোকার্ড এবং অন্যান্য গ্রাফিক্স তৈরি করে অসংখ্য মানুষ সরকারের নীতি ও প্রশাসনের আচরণের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

একদিকে সমাজে মানবিকতার প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে, অন্যদিকে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, "আওয়ামী লীগ আমলেও এমন বা এর চেয়ে বেশি অমানবিক ঘটনা ঘটিয়েছে।"

আরও পড়ুন: রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা

বিবিসি বাংলার সঙ্গে আলাপকালে, মৃতের স্বামী জুয়েল হাসান সাদ্দামের ভাই মোঃ শহীদুল ইসলাম বলেছেন, "বাচ্চাকে জীবিত অবস্থায় কোলে নিতে পারেননি। তাই কারাগারের গেইটেও তাকে আর কোলে তুলেননি। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন – আমি ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করো।"

শনিবার কারাগারের গেইটে মোট নয়জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। পরিবার জানিয়েছে, প্যারোলে মুক্তির আবেদন বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি এবং তাদের যশোর কারাগারের গেইটে পাঠানো হয়েছে।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক আব্দুল বাতেন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "পরিবারের সদস্যরা আমাদের কাছে এসে জানিয়েছেন, প্যারোলের আবেদন যশোর জেলা প্রশাসক বা জেল সুপারের কাছে করতে হবে। আমরা তাদের সহযোগিতা করেছি।"

অন্যদিকে যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান জানিয়েছেন, তারা এমন কোনো আবেদন পাননি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনাকে রাষ্ট্রের ‘অমানবিক চেহারার’ প্রকাশ বলে দেখছেন। তাদের মতে, আবেদনের প্রক্রিয়ায় সময় নষ্ট করে পরিবারকে লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে যা এক ধরনের নৃশংসতা।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে জুয়েল হাসান সাদ্দাম আত্মগোপনে ছিলেন। এরপর ২০২৫ সালের এপ্রিলের শুরুতে গোপালগঞ্জ থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। তিনি বিভিন্ন মামলায় কারাগারে আছেন।

সাদ্দামের রাজনৈতিক সহকর্মীরা সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন যে, তিনি আত্মগোপনের সময় কলকাতায় ছিলেন। দেশে ফিরে আসার পর গোপালগঞ্জ থেকে তাকে আটক করা হয়। আটক হওয়ার সময় তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন। কানিজ সুবর্ণা বাগেরহাটে শাশুড়ি ও ননদের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন।

শহীদুল ইসলাম জানিয়েছেন, "বাচ্চাটা হওয়ার পর মা পাঁচবার কারাগারের গেইটে গেছেন স্বামীকে দেখানোর জন্য। প্রতিবারই বাচ্চাকে কোলে তুলতে চান। কিন্তু প্রতিবারই জেল কর্তৃপক্ষ তাকে অনুমতি দেয়নি। এতে মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।"

শুক্রবার রাত সাবেকডাঙ্গা গ্রামের বাড়ি থেকে কানিজ সুবর্ণার মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পাশেই ছিল তাদের ৯ মাস বয়সী শিশুর মরদেহ।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য প্যারোলে আবেদন করা হয়। তবে পরিবার বলছে, প্রশাসন আবেদন গ্রহণ করেনি। বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদনের পর পরিবারকে যশোরে পাঠানো হয়। সেখানে ৫ মিনিট সময়ের জন্য মি. সাদ্দামের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হয়।

যশোর কারা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার এখতিয়ার জেলা প্রশাসকের হাতে। সেই অনুমতি না থাকায় মানবিক বিবেচনায় মি. সাদ্দামকে লাশ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

শহীদুল ইসলাম বলেছেন, "তিনি বাচ্চাটাকে কোলে নেননি। বললেন, জীবিত থাকতেই তো নিতে পারলাম না, এখন আর কী করবো। বাচ্চার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন – আমি ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করো। ভাবীকে বললেন – ভালো স্বামী হতে পারিনি, ক্ষমা করো। এরপর এক টুকরো মাটি আমাকে দিয়ে বলেন বউ-বাচ্চার কবরে দাও। আমরা তাই করেছি।"

রাত সাড়ে এগারটায় বাগেরহাটে দাফন সম্পন্ন হয়।

শুক্রবার রাত থেকেই মৃতদেহের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। এরপর প্যারোলের আবেদন ও সাক্ষাতের খবরগুলো ভাইরাল হয়। একাধিক সংবাদমাধ্যমও এই খবর প্রচার করে।

মানুষ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছে, প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া নৃশংস ও অমানবিক। কেউ কেউ বলেছেন, আগে এমন ঘটনা ঘটলেও এখন কেন এমন হবে।

মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটন বলেছেন, "এ ঘটনায় রাষ্ট্র ও আইন-কানুনের নির্মম দিকটি আবারো উন্মোচিত হলো। বাগেরহাট ও যশোর জেলা প্রশাসন মানবিক হলে বন্দি তার মৃত স্ত্রী ও সন্তানকে শেষ বিদায় জানাতে পারতেন।"

এমএসএফ-এর সম্পাদক সাইদুর রহমান বলেছেন, "লিখিতভাবে প্রশাসনকে জানানো হলেও তা গুরুত্ব পায়নি। প্যারোল না হওয়াটা একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন।"

যশোর জেলা প্রশাসন বিবৃতিতে জানিয়েছে, পরিবারের পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তির আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে করা হয়নি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, "স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুতে জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়নি। পরিবারে মৌখিক অভিপ্রায় অনুযায়ী যশোর জেলগেটে মৃতদেহ দেখানো হয়েছে। মানবিক দিক বিবেচনায় সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়েছে।"

পরিবারের বক্তব্য অনুসারে, তারা আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।

এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, বরং প্রশাসনের মানবিকতার অভাব এবং আইন-কানুন প্রয়োগে অসামঞ্জস্যের দৃষ্টান্ত। সামাজিক মাধ্যমে মানুষের প্রতিক্রিয়া, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা এবং প্রশাসনের বিবৃতির মধ্যে স্পষ্ট তফাৎ ঘটেছে।

বাগেরহাট ও যশোর জেলা প্রশাসনের এই কার্যক্রমকে দেশের নাগরিকরা ‘নিষ্ঠুর’ ও ‘অমানবিক’ হিসেবে দেখছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রক্রিয়াগত বিলম্ব, প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া এবং লাশ দেখানোর জন্য সীমিত সময়ের ব্যবস্থা—এগুলো মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর ত্রুটি।

এই ধরনের ঘটনা দেশে প্রশাসন ও মানবাধিকারের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজনীয়তার উপর আবারও আলোকপাত করেছে।