মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ধ্বংসে নেতৃত্বে থাকা ৪ হোতা সনাক্ত
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী একটি ভয়ানক চক্রকে সনাক্ত করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। তারা দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শ্রমবাজারটি যাতে নির্বিঘ্নে খুলতে না পারে সেই অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চক্রের সদস্যরা রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে সাজানো কাল্পনিক অভিযোগ দেওয়াসহ নানামুখী অপতৎপরতার মাধ্যমে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুন্ন করে আছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যখন ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসুচির আওতায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার চেষ্টা করছে তখনই এই চক্রটি আবার আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে।
এই চক্রটি দীর্ঘদিন থেকে কাউন্টার সেটিং এর মাধ্যমে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক প্রেরণ করে আসছে। বৈধ পথে শ্রমিক গেলে তাদের অবৈধ পথে শ্রমিক পাঠানোর কারবার বন্ধ হয়ে যাবে এই কারণে সংঘবদ্ধ চক্রটি বৈধ পথে শ্রমিক পাঠানোর বিরোধিতা করেছে বলে ওরা মনে করেন।
আরও পড়ুন: সৌরশক্তি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ সরকারের
সূত্র জানায়, চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন মালয়েয়ায় ‘কাউন্টার সেটিং’ চক্রের প্রধান ও আফিয়া ওভারসীসের মালিক আলতাব খান। তার সযোগী হিসেবে কাজ করছেন জনশক্তি রপ্তানী কারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ও হিউম্যান রিসোর্স ডেভলপমেন্ট সেন্টারের সত্বাধিকারী ফকরুল ইসলাম, মাইক্রো এক্সপোর্ট হাউসের সত্বাধিকারী মোস্তফা মাহমুদ ও অনিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের সত্ত্বাধিকারী একেএম মোয়াজ্জেম হোসেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই চার ব্যক্তি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ধ্বংসের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এই খাত আরও অস্থির হয়ে উঠবে। সরকার জিরো কস্টে শ্রমিক পাঠানোর যে প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সেটা ব্যার্থ হয়ে যাবে। যার সুযোগ নিবে নেপাল, ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়াসহ অপর সোর্স কান্ট্রিগুলো। ইতোমধ্যে নেপাল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়া যাচ্ছে। এমনকি তাদের দেশের ফ্লাইট না পেয়ে ভারতে গিয়ে সেখান থেকেও মালয়েশিয়া ফাড়ি দিচ্ছে নেপালের শ্রমিকরা। আর বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ।
আলতাব খান
আরও পড়ুন: হজযাত্রীদের জন্য শুভেচ্ছা উপহার পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় বহুল আলোচিত ‘কাউন্টার সেটিং’ সিন্ডিকেটের এজেন্ট আফিয়া ওভারসিসের স্বত্বাধিকারী আলতাব খান ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন মালয়েশিয়ায়। দেশটির দুর্নীতি দমন কমিশন তাকে গ্রেপ্তার কারার পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে আলতাব খান স্বীকার করেন, মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরে কর্মরত কিছু অসাধু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের নির্বিঘ্নে ইমিগ্রেশন পার করতে তিনি। তার আগে আলতাব খান মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে শ্রমিক প্রেরণকে বাঁধাগ্রস্ত করতে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় সংস্থা বোয়েসেলসহ ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেন। আলতাব খান মামলার জন্য এমন সময় বেছে নেন যখন জুলাই বিপ্লব পরবর্তী পুলিশি ব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর ছিল। ওই সময় পুলিশ পর্যাপ্ত যাছাই বাছাই ছাড়াই মামলাটি রেকর্ড করে। পরবর্তীতে সিআইডি মামলাটি তদন্ত করে। মামলার সত্যতা না পেয়ে সিআইডি আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পল্টন থানায় করা মানব পাচার ও অর্থ পাচারেরর মামলা করার ২০ দিনের মাথায় মানব পাচারের অভিযুক্ত হয়ে আলতাব নিজেই মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় গ্রেপ্তার হন। এছাড়া আলতাব খানের করা ভুল অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রেকর্ড ও পরবর্তীতে ইন্টারপোলের কাছে চিঠি লেখাসহ তদন্ত প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা পল্টন এসআই, তদারকি কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট পল্টন থানার ওসি ও পুলিশ সদর দপ্তরের এসপিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদর দপ্তরকে চিঠি দিয়েছিল সিআইডি। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয় পুলিশ সদর দপ্তর। আলতাফ মালয়েশিয়া থেকে ছাড়া পেয়ে বাংলাদেশে এসে আদালতে নারাজী দেন। পরে আদালত মামলাটির পুন:রায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবিকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। আলতাব খান ও তার সহযোগীরা মামলার তদন্তকে প্রভাবিত করছেন।
ফকরুল ইসলাম
আলতাবের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন বায়রার সাবেক যুগ্ম সচিব ফকরুল ইসলাম। তিনি হিউম্যান রিসোর্স ডেভলপমেন্ট সেন্টার নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক। ফকরুল মালয়েশিয়ায় ইতোপূর্বে যে দুই দফায় শ্রমিক পাঠানো হয় তখন ব্যবসায় ছিলেন। নতুন করে সিন্ডিকেট করার জন্য তিনি ব্যপকহারে অপতৎপরতা শুরু করে। সফল হতে না পেরে তিনি প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মানব বন্ধন, সাংবাদিক সম্মেলন, বিভিন্নস্থানে অভিযোগ জমা দেওয়াসহ দেশে বিদেশে নানামুখী অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি অন্তর্বতী সরকারের সময় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টাকে হাত করার জন্য মোটা অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেন। ফকরুলকে মানবপাচার ও অর্থপাচারের মামলায় ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর এক সহযোগীসহ বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে বনানী থানা পুলিশ। ওই মামলা থেকে জানাগেছে, আরইউএল ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পার্টনার মো. রুবেল হোসেন ওই বছরের ৪ নভেম্বর বনানী থানায় এই মানবপাচার এবং অর্থ আত্মসাতের মামলা করেন ফখরুলের বিরুদ্ধে। ওই মামলায় তিনি ফখরুল ইসলাম এবং তার সহযোগী জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রায় ৩ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ ও ২৮ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না দিয়ে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন। ফখরুলের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও মানবপাচার আইনে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছিল। প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে লোক পাঠানোর এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
ফকরুল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ বাণিজ্যে ১০ সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী ছিলেন ফকরুল ইসলাম। মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাণিজ্যের জন্য বাগিয়ে নিয়েছেন নিজের মেডিক্যাল সেন্টার ওয়েলকাম মেডিক্যাল। প্রায় ৭০ হাজার কর্মীর নামমাত্র স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এখন পরিচয় লুকিয়ে নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণের চেষ্টা করছেন। তার কমপক্ষে দুইটি লাইসেন্স রয়েছে ১০১ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকায়। সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকাতেও রয়েছে তার এজেন্সি ও ওয়েলকাম মেডিক্যাল সেন্টার। এছাড়া মালয়েশিয়ায় বৈধপথে শ্রমিক যাওয়া বন্ধ থাকায় অবৈধভাবে শ্রমিক পাঠাচ্ছেন ফকরুল। টেকনাফ, কক্সবাজার উপকূলসহ যেসব শ্রমিকদের অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয় তার নেতৃত্ব ও সহযোগিতায় রয়েছেন ফকরুল।
মোস্তফা মাহমুদ
মালয়েশয়ার শ্রমবাজার বন্ধ রাখতে অপতৎপরতাকারী হিসিবে চিহ্নিত অপর ব্যবসায়ী হলেন মোস্তফা মাহমুদ। তিনি মাইক্রো এক্সপোর্ট হাউসের সত্ত্বাধিকারী ও বায়রার কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য। বিদেশ পাঠানোর নামে বহু মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তিনি। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় অনেক ব্যাবসায়ী তার কাছে টাকা পাবে। তিনি সেগুলো না দিয়ে তালবাহানা করছেন। মোস্তফা মাহমুদ গত ৫ এপ্রিল সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার চালু হলে তিনি আমরণ অনশন করবেন। জিরো কস্টে শ্রমিক নেওয়ার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান করা মোস্তফা মাহমুদ নানান অপপ্রচার ছড়াচ্ছেন। তিনি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ নেওয়ার কাল্পনিক গল্প ছড়িয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে বাঁধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ রাখতে মোস্তফা মাহমুদ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দপ্তরে সাজানো, কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন অভিযোগ দিয়ে যাচ্ছেন। বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক হওয়ায় তার বিরুদ্ধ কেউ কথা বলার সাহস পাচ্ছে না।
মোয়াজ্জেম হোসেন
অনিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের সত্ত্বাধিকারী মোয়াজ্জেম হোসেন মালয়েশিয়ায় শ্রমিক প্রেরণে বিরোধীতাকারীদের মূল অর্থদাতা হিসেবে চিহ্নিত। তিনি মালয়েশিয়ায় প্রতিনিধি পাঠিয়ে শ্রমবাজার খোলাকে বাঁধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছেন। আওয়ামী লীগের অর্থদাতা মোয়াজ্জেম হোসেন চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিএনপি বনে যান। তিনি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের বিষোদগার করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেশের স্বার্থবিরোধী বক্তব্য দিয়ে শ্রমবাজার বন্ধ রাখতে কাজ করেন। তিনি অন্তর্বতী সরকারের বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের ঘনিষ্ঠজন পরিচয় দিয়ে শ্রমাবাজার একক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন। বর্তমানে সরকার যখন জিরো কস্টে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার চেষ্টা করছে এর বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়ে মোয়াজ্জেম।





