ব্যাংকখেকো নাফিসের ঘনিষ্ঠ আনোয়ারুল এখন এমডি

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকে ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের পদোন্নতি বাণিজ্যের মহোৎসবে ক্ষোভ

Any Akter
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:১৭ অপরাহ্ন, ২০ মে ২০২৬ | আপডেট: ৭:২৩ অপরাহ্ন, ২০ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বিতাড়িত স্বৈরাচারের সহযোগীদের টানা লুটপাটে বিধ্বস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক এখনো ব্যাংকখেকোদের নিয়ন্ত্রণেই রয়ে গেছে। আলোচিত ব্যাংকখেকো চৌধুরী নাফিজ শরাফতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম এখন এই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। অভিযোগ উঠেছে, ব্যাংক পুনর্গঠনের নামে বর্তমানে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি ও পদায়ন বাণিজ্যের উৎসব চলছে। উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে স্বৈরাচারের দোসরদের সাথে একটি ধর্মীয় দল সমর্থিতরা একাকার হয়ে গেছে।

রাষ্ট্রের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা সচল করতে গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও এমডি পরিবর্তন করে অভিজ্ঞদের দায়িত্ব দেয়। তবে অগ্রণী ব্যাংকে নিয়োগ পান আওয়ামী আমলে এই ব্যাংকেরই উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম। বিতাড়িত স্বৈরাচারী গোষ্ঠীর আত্মীয় ও ব্যাংকখেকো হিসেবে পরিচিত চৌধুরী নাফিজ শরাফতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে পরিচিত বর্তমান এই এমডি।

আরও পড়ুন: ছুটি শুরুর আগেই থমকে যাচ্ছে হাইওয়ে: ঘরমুখো মানুষের সামনে ভয়াবহ যানজটের আশঙ্কা

সংশ্লিষ্টদের মাঝে গুঞ্জন রয়েছে, এই আনোয়ারুল ইসলাম সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) থেকে ডিএমডি হওয়ার ৪টি ধাপ সরাসরি পার করেছেন তাদের বিশেষ অনুগ্রহে। জীবনে কখনো ঢাকায় চাকরি না করা মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে পদোন্নতি পেয়েই ঢাকা সার্কেল-১ এর মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলের দায়িত্ব পান সাবেক এমডি শামস-উল ইসলামের বদান্যতায়। এরপর ডিএমডি হয়ে নিয়ম ভেঙে প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা (হেড অব এইচআর) হন। প্রতিটি পদোন্নতির সময় নিজেকে 'আওয়ামী পরিবারের সন্তান' ও কট্টর আওয়ামীপন্থী হিসেবে প্রমাণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল তার। এমনকি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও তিনি আওয়ামী-ঘনিষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন।

হেড অব এইচআর থাকা অবস্থায় ব্যাংকের ১০ জনকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) পদে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে, যাদের মধ্যে কাজী ফাতেমা এনি এবং আবদুর রহমান সাগর অন্যতম। এরপর তিনি অবসরে যান। কিন্তু ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আকস্মিকভাবে একটি রাজনৈতিক দলের সুপারিশ ও একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ পান, যা পুরো ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের হতভম্ব করে দেয়।

আরও পড়ুন: পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণে কাজ করবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

এমডির চেয়ারে বসেই তিনি 'সুপারনিউমারারি' (অতিরিক্ত সংখ্যাতিরিক্ত) পদোন্নতি প্রদান করেন, যাতে সাধারণ কর্মকর্তাদের চেয়ে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তারাই বেশি লাভবান হন। উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদে সুপারনিউমারারি পদোন্নতির কোনো নিয়ম বা নজির না থাকলেও তিনি সেই পদেও পদোন্নতি দিয়েছেন। এছাড়া এমডি হয়ে ব্যাংকের প্রচলিত নিয়মানুযায়ী ডিএমডি-১ কে হেড অব এইচআর না দিয়ে, নিজের অনৈতিক বাণিজ্যের পথ সুগম করতে নিজ অঞ্চলের ডিএমডি-৩ রূবানা পারভীনকে হেড অব এইচআর বানান। ডিএমডি-৩ রূবানা পারভীন যেন এক অলৌকিক শক্তির অধিকারী; গত ৬ আগস্ট পর্যন্ত নিজের ফেসবুক আইডিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি রেখেও তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ডিএমডি হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে যান।

ব্যাংক লুট ও অর্থ পাচারের মূল হোতা ছিলেন শেখ হাসিনার আস্থাভাজন চৌধুরী জাফরুল্লাহ শরাফাতের ভাই চৌধুরী নাফিজ শরাফাত। পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও এই আলোচিত ব্যবসায়ী বিভিন্ন খাতে একটি সুবিধাভোগী চক্র তৈরি করেছিলেন। সেই সুবিধাভোগীদেরই একজন হলেন অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি ও বর্তমান এমডি আনোয়ারুল ইসলাম।

বিস্তর অভিযোগ কাঁধে নিয়ে কোন কৌশলে অগ্রণী ব্যাংকের মতো একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ আনোয়ারুল বাগিয়ে নিলেন, তা নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় বিস্ময়ের শেষ নেই। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক খাতে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত চৌধুরী নাফিজ শরাফতের সঙ্গে মিলেমিশে দুর্নীতি করেছেন আনোয়ারুল ইসলাম। আওয়ামী লীগের শাসনামলে সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী নাফিজ শরাফতের লা মেরিডিয়ান হোটেল, বেস্ট হোল্ডিংসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিচালক পদেও ছিলেন তিনি।

অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন গ্রুপকে অর্থ পাচারে সহায়তাকারী এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র পলাতক গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম। অথচ সংস্কারের এই সময়ে এসেও তিনি কীভাবে এমডির পদ বাগিয়ে নিলেন এবং এখনো বহাল তবিয়তে আছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন দুর্নীতিগ্রস্ত এমডিকে বহাল রেখে কীভাবে ব্যাংকের সংস্কার সম্ভব—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বর্তমানে এমডি মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম নিজের পদ টিকিয়ে রাখতে সরকারের আইন উপদেষ্টা, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টার দপ্তরে দৌড়ঝাঁপ করছেন বলে জানা গেছে।

সদ্য সমাপ্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) পদোন্নতিতে মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম এবং তার সিন্ডিকেটের সদস্য জিএম শামসুল আলম, আতিকুর রহমান সিদ্দিকী, জালাল উদ্দিন ও আফজাল হোসেনের যোগসাজশে ১০৩ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯ জন খুলনা বিভাগের এবং ১৮ জন বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের। এমডি তার নিজ দপ্তরের দুজনকে কম যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দিয়ে আকর্ষণীয় স্থানে পদায়ন করেছেন। এমনকি হোটেল শেরাটন শাখা থেকে নিজ বিভাগের লোককে এনে তার দপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে। তার এই পদোন্নতি বাণিজ্যের কারণে অন্যান্য অঞ্চলের যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তারা চরমভাবে বঞ্চিত হয়েছেন। বর্তমানে ব্যাংকের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন এমডির নিজ এলাকা খুলনা বিভাগের লোকজন। অগ্রণী ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই চরম বৈষম্য ও অনিয়মের অবসান চান।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনের অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে তিনি কানাডায় বাড়ি কিনেছেন। অবৈধভাবে আয়ের ১৮ কোটি টাকা তিনি শ্যালকের নামে লেনদেনও করেছেন।

এমন অবস্থায় অগ্রণী ব্যাংকে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এসবের প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভে নামার ইঙ্গিতও দিয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মতে, দুর্নীতিবাজ ও অনভিজ্ঞ শীর্ষ নির্বাহীদের পদে থাকতে দেওয়া হলে আগামীতে অগ্রণী ব্যাংক ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে।

অভিযোগ রয়েছে— ব্যাংকটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) থাকা অবস্থায় মো. আনোয়ারুল ইসলাম কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত থেকেছেন। তারা বিগত সরকারের উচ্চপদস্থ সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে অবৈধ ঋণ বরাদ্দ, সন্দেহজনক পোস্টিং এবং অন্যান্য দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘন করে কর্পোরেট গ্যারান্টির ভিত্তিতে বড় ঋণ প্রদান এবং অসাধু গ্রাহকদের জাল বন্ধকের মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থার জন্য এমডি ও ডিএমডির অদক্ষতাকে দুষছেন কর্মকর্তারা। সুশাসন না থাকায় এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দূরদর্শিতার অভাবের সুযোগ নিয়ে ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম ব্যাংকে প্রমোশন ও বদলি বাণিজ্য করছেন— এমন অভিযোগও রয়েছে কর্মকর্তাদের।

অভিযোগ রয়েছে— মো. আনোয়ারুল ইসলাম অবৈধভাবে আয় করে কানাডায় বাড়ি কিনেছেন। তিনি অবৈধভাবে আয়ের ১৮ কোটি টাকা তার শ্যালকের নামে লেনদেন করেছেন। গত ৯ মাসে অবৈধভাবে আয় করেছেন অর্ধকোটি টাকা।

চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে তিনজনকে পদোন্নতি দিয়ে অবৈধভাবে আয় করেছেন কোটি টাকা। তার বান্ধবী ফাতিমা অ্যানিকে অবৈধভাবে প্রমোশন দিয়ে বানিয়েছেন এজিএম। বিভিন্ন সময় তার অবৈধ আয় এবং নানা দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত হলেও তিনি থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সুশাসনের অভাবে ধসে পড়ছে অগ্রণী ব্যাংকের সব সূচক। খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা, আমানত কমেছে ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ কমেছে ৩ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় মূলধন ঘাটতিও বেড়েছে। এছাড়া দুই বছর আগে লাখ কোটি টাকার ক্লাবে যোগ দেওয়া অগ্রণী ব্যাংকের আমানত কমে দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার কোটি টাকায়। এমনকি আমানতের অভাবে নতুনভাবে বিনিয়োগও করতে পারছে না ব্যাংকটি।