ছুটি শুরুর আগেই থমকে যাচ্ছে হাইওয়ে: ঘরমুখো মানুষের সামনে ভয়াবহ যানজটের আশঙ্কা

ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। তবে ঈদের সরকারি ছুটি কার্যকর হওয়ার আগেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মহাসড়কে ভয়াবহ যানজটের চিত্র দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং যমুনাসেতু-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট ও ধীরগতির কারণে যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ঈদের মূল যাত্রার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

ইতোমধ্যে হাইওয়ে পুলিশ সারা দেশে ৯৪টি ঝুঁকিপূর্ণ যানজটপ্রবণ স্পট চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে ২৫টি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২৫টি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২১টি, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৭টি এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ৮টি স্পট রয়েছে। এসব এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, মোবাইল টিম ও সার্বক্ষণিক নজরদারির পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে এখনো স্বস্তি ফেরেনি।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকে ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের পদোন্নতি বাণিজ্যের মহোৎসবে ক্ষোভ

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ১২ কিলোমিটার স্থবিরতা

সবচেয়ে নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে বিশ্বরোড অংশে। বিশ্বরোড মোড় থেকে আশুগঞ্জ গোলচত্বর পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের। দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি—সব মিলিয়ে পুরো মহাসড়ক যেন এক অচল করিডোরে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন: পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণে কাজ করবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

সড়ক নির্মাণ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত ৫১ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০১৭ সালে। পরে ২০২০ সালে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এফকনস ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড কাজ শুরু করলেও আশুগঞ্জ থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার অংশের কাজ আট বছরেও শেষ হয়নি। ফলে প্রতিদিনই এই অংশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

সিলেটগামী দিগন্ত পরিবহনের বাসচালক আব্দুল্লাহ বলেন, “ঢাকা থেকে ভৈরব পর্যন্ত আসতে দুই ঘণ্টা লাগে। কিন্তু আশুগঞ্জ থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত মাত্র ১১ কিলোমিটার যেতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় চলে যায়। এই অংশের কথা মনে পড়লে দূরপাল্লার গাড়ি চালাতেই ভয় লাগে।”

একজন প্রাইভেটকার চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মহাসড়ক নয়, যেন ভোগান্তির নরক। তিন ঘণ্টা ধরে একটু একটু করে এগোচ্ছি। সিএনজি, ইজিবাইক আর ভটভটির দাপটে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।”

সিলেটগামী আরেক যাত্রী বলেন, “ভৈরব পর্যন্ত কোনো জ্যাম ছিল না। কিন্তু আশুগঞ্জে ঢোকার পর সাড়ে তিন ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছে। মানুষের সময়ের কোনো মূল্য আছে কি না, সেটাই প্রশ্ন।”

উন্নয়নকাজই এখন বড় ভোগান্তির কারণ

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়নকাজের ধীরগতি এখন জনগণের জন্য নতুন দুর্ভোগ তৈরি করেছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান থাকলেও বিভিন্ন স্থানে নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা, বিকল্প লেন সংকুচিত হওয়া এবং অপরিকল্পিত যান চলাচলের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে।

নরসিংদী ও রূপগঞ্জ অংশেও খানাখন্দ, বাজার এবং স্থানীয় ছোট যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের কারণে ধীরগতি তৈরি হচ্ছে। ঈদের সময় এসব এলাকায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে দীর্ঘস্থায়ী যানজটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি মো. শামীম শেখ বাংলাবাজার পত্রিকা কে  বলেন, ভুলতা-গাউছিয়া সড়কের ভাঙনের কারণে বিপুলসংখ্যক যানবাহন এশিয়ান হাইওয়েতে উঠে আসে। এতে মদনপুর, কাঁচপুরসহ আশপাশে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। তবে এশিয়ান হাইওয়ের কাজ ঈদের আগে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাড়ছে চাপ: 

দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম করিডোর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সাধারণ সময়ে প্রতিদিন ১৮ থেকে ২২ হাজার যানবাহন চলাচল করলেও ঈদের সময় তা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ করে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার, দাউদকান্দি, মেঘনা-গোমতী সেতু এলাকা এবং ফেনীর কয়েকটি অংশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ।

বৃষ্টির কারণে সড়কের বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে কোরবানির পশুবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার বাস এবং ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় ধীরগতি তৈরি হচ্ছে। টোল আদায়ে সামান্য ধীরগতিও দীর্ঘ লাইনে রূপ নিচ্ছে।

সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ পার্কিং, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল এবং বাজারকেন্দ্রিক চাপ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তবে এসব অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলে ঈদযাত্রায় ভোগান্তি আরও বাড়বে।

যমুনাসেতুর ‘বটলনেক’ বড় শঙ্কা: 

উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম এখন যমুনাসেতু। জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের প্রশস্ত মহাসড়ক থাকলেও এলেঙ্গা থেকে যমুনাসেতু পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার অংশে উন্নয়নকাজ অসমাপ্ত। ফলে এই অংশেই তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ ‘বটলনেক’।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ফোর লেনের দ্রুতগতির বিপুলসংখ্যক যানবাহনের চাপ যমুনাসেতুর সীমিত ধারণক্ষমতা নিতে পারছে না। এর ফলে সেতুর প্রবেশমুখে দীর্ঘ যানজট তৈরি হচ্ছে, যা কখনো কখনো ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

পরিবহনসংশ্লিষ্টরা জানান, টাঙ্গাইল অংশে ১৩টি নির্দিষ্ট স্পট সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে—যমুনাসেতু গোলচত্বর, এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড, ঘারিন্দা ওভারব্রিজ, করটিয়া বাইপাস, মির্জাপুরের হাটুভাঙ্গা ও পাকুল্ল্যা এলাকা।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, যত্রতত্র পার্কিং, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং মহাসড়কে ছোট যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ পরিস্থিতি আরও জটিল করছে। কোনো গাড়ি বিকল হলেই কয়েক কিলোমিটার এলাকায় যান চলাচল অচল হয়ে যায়।

প্রশাসনের আশ্বাস, বাস্তবে স্বস্তি নেই: 

যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে যানজট না হওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, বাস্তব চিত্রে এখনো মিলছে না সেই প্রতিফলন। টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার বলেছেন, কোরবানির পশুবাহী ট্রাক, পণ্যবাহী যান ও যাত্রীবাহী বাসের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। মহাসড়কের পাশে কোনো অস্থায়ী পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদ উপলক্ষে ২৪ ঘণ্টা টোল আদায় চালু থাকবে। দুই প্রান্তে মোট ১৮টি বুথ দিয়ে যানবাহন পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা বুথও থাকবে। তবু কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, ফোর লেনের বাড়তি চাপ সেতুর বর্তমান কাঠামো নিতে পারছে না।

অন্যদিকে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর জানিয়েছে, মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত এবং খানাখন্দ ভরাটের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।

সমন্বয়হীনতা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনাই মূল সংকট: 

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন বা সাময়িক মেরামত দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং কঠোর মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা ছাড়া ঈদযাত্রার ভোগান্তি কমবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পাঞ্চলে একযোগে ছুটি ঘোষণা করলে লাখো মানুষ একই সময়ে ঢাকা ছাড়তে চায়। ফলে গাজীপুর, চন্দ্রা, কাঁচপুর, এলেঙ্গা ও মাওয়া অংশে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। ধাপে ধাপে ছুটি কার্যকর না হলে মহাসড়ক অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া মহাসড়কের পাশে পশুর হাট, অবৈধ পার্কিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং থ্রি-হুইলারের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও স্পষ্ট।

রেল ও নৌপথে স্বস্তির আশা: 

সড়কপথে উদ্বেগ বাড়লেও রেল ও নৌপথে তুলনামূলক স্বস্তির আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ রেলওয়ে ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত কোচ ও ইঞ্জিন প্রস্তুত করছে। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে জানিয়েছে, প্রায় ৯০টি ইঞ্জিন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিশেষ ট্রেন পরিচালনা ও স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে।

অন্যদিকে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে যাত্রীচাপ কমে গেছে। ফলে সদরঘাট ও বিভিন্ন লঞ্চরুটে অতীতের মতো অতিরিক্ত ভিড় হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন লঞ্চমালিকরা।

গণমানুষের প্রশ্ন: উন্নয়ন কার জন্য?

একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকা মানুষ—এই বৈপরীত্য এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। উন্নয়নকাজের দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদারকি এবং সমন্বয়হীনতার দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হচ্ছে।

ঈদকে সামনে রেখে সরকার ও প্রশাসনের আশ্বাস থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এখনই কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এবারের ঈদযাত্রা ভয়াবহ ভোগান্তিতে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং যমুনাসেতু-টাঙ্গাইল মহাসড়ক হয়ে উঠতে পারে যাত্রীদের জন্য দুর্ভোগের দীর্ঘ করিডোর। জনগণের প্রত্যাশা—ঘোষণায় নয়, বাস্তব ব্যবস্থাপনাতেই মিলুক স্বস্তির ঈদযাত্রা।