একদিনে রাজধানীসহ দুই জেলায় ৬ মরদেহ

Shahrier Islam Pallab
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৯:২০ অপরাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১০:২১ অপরাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। শনিবার একদিনেই রাজধানীর লালবাগ, শাহবাগ ও আদাবর এবং ফরিদপুরের মধুখালী থেকে ছয়জনের মরদেহ বা মরদেহের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে লালবাগে এক আইনজীবী ও শাহবাগে অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দুটি ঘটনায় মধুখালীতে তিনটি কার্টন থেকে এক ব্যক্তির চার টুকরো খণ্ডিত মরদেহ এবং আদাবরের একটি খাল থেকে এক নারীর মাথা ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাগুলোর মধ্যে কয়েকটির ক্ষেত্রে হত্যার আশঙ্কা থাকলেও তদন্ত ও ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ঘটনাকেই চূড়ান্তভাবে হত্যাকাণ্ড বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পৃথক এসব ঘটনা ঘটে। মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআইয়ের সংশ্লিষ্ট দল কাজ করছে।

আরও পড়ুন: ডিভাইসের আসক্তি থেকে শিশু-কিশোরদের মাঠে ফেরাতে হবে: যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

লালবাগে আইনজীবীর মরদেহ: 

রাজধানীর লালবাগের শহীদনগর এলাকায় একটি বাসা থেকে নিম্ন আদালতের আইনজীবী আনোয়ার হোসেনের (৪৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শহীদনগর ৩ নম্বর লেনের ১০/১ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

আরও পড়ুন: নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন ভেটিংয়ে, জুলাই থেকেই নতুন বেতন

লালবাগ থানার ওসি মোহাম্মদ জামিল হোসেন জানান, আনোয়ার গত ১ সেপ্টেম্বর ওই বাসার একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে একাই থাকতেন। সকালে এক প্রতিবেশী কক্ষটির ভেতর থেকে দুর্গন্ধ পান। দরজায় সামান্য ধাক্কা দিলে সেটি খুলে যায়। পরে ভেতরে আনোয়ারের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পুলিশ জানায়, আনোয়ার মেঝেতে বিছানা পেতে ঘুমাতেন। সেখানেই তার মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহে পচন ধরেছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দুই থেকে তিন দিন আগে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

আনোয়ারের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার গোয়ালগাঁও গ্রামে। তার বাবার নাম আবদুল মজিদ। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, আইনজীবী হলেও তিনি নিয়মিত আদালতে যেতেন না। তিনি হতাশায় ভুগতেন এবং মাদকাসক্ত ছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শাহবাগে ফুটপাতে দুই অজ্ঞাত মরদেহ: 

শনিবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও হাইকোর্ট মাজারসংলগ্ন ফুটপাত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের একজনের বয়স আনুমানিক ৬৫ বছর এবং অন্যজনের বয়স প্রায় ৪৫ বছর।

শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান জানান, পথচারীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ দুটি উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে তাদের ভবঘুরে বলে মনে হয়েছে। তবে তাদের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে সিআইডির ফরেনসিক দলকে জানানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

কার্টনে চার টুকরো মরদেহ: 

এর মধ্যে ফরিদপুরের মধুখালীতে উদ্ধার হয়েছে এক ব্যক্তির চার টুকরো খণ্ডিত মরদেহ। শনিবার দুপুরে উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন একটি কাঁচা সড়কের ঢাল থেকে তিনটি কার্টনের ভেতর বস্তাবন্দি অবস্থায় মরদেহের অংশগুলো উদ্ধার করে পুলিশ।

স্থানীয় পথচারীরা সড়কের পাশে তালগাছের গোড়ায় মুখ বাঁধা তিনটি কার্টন পড়ে থাকতে দেখেন। কার্টন থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় তারা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কার্টনগুলো উদ্ধার করে খণ্ডিত মরদেহ দেখতে পায়।

মধুখালী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার এস এম মাসুদুজ্জামান জানান, মরদেহের টুকরোগুলো অর্ধগলিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অন্য কোনো স্থানে ওই ব্যক্তিকে হত্যা করে মরদেহ খণ্ডিত করে সড়কের পাশে ফেলে রাখা হয়েছে।

ঘটনাস্থল থেকে সিআইডি ও পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেছেন। নিহত ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। তার পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক দল মাঠে রয়েছে।

আদাবরের খালে নারীর খণ্ডিত মরদেহ: 

একই দিন বিকেলে রাজধানীর আদাবরের একটি খাল থেকে উদ্ধার হয়েছে এক নারীর খণ্ডিত মরদেহের বিভিন্ন অংশ। আদাবর-১০ এলাকার বালুর মাঠসংলগ্ন খালে শরীরের কয়েকটি অংশ ভাসতে দেখে পথচারীরা পুলিশকে খবর দেন।

পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নারীর মাথা ও একটি হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করে। আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর জানান, খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে।

নিহত নারীর পরিচয় শনাক্ত এবং মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে সিআইডির ফরেনসিক দলকে খবর দেওয়া হয়েছে। কোথায় এবং কীভাবে ওই নারীর মৃত্যু হয়েছে, তাকে হত্যা করে মরদেহের অংশগুলো খালে ফেলা হয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে হত্যার সম্ভাবনা: 

একই দিনে রাজধানী ও ফরিদপুরে মরদেহ উদ্ধার এবং বিশেষ করে দুটি ঘটনায় খণ্ডিত মরদেহ পাওয়ার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। মধুখালীতে কার্টনে করে খণ্ডিত মরদেহ ফেলে রাখা এবং আদাবরের খাল থেকে নারীর মাথা ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ উদ্ধারের ঘটনায় সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে লালবাগ ও শাহবাগের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে সবগুলো ঘটনাকে একই সূত্রে দেখার সুযোগ নেই। পুলিশের তদন্ত, ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষার ফল এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত বিশ্লেষণের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।

পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ এবং কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।