অস্ত্রকাণ্ডে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ
নানা গুঞ্জন, আলোচনা-সমালোচনার পর অস্ত্রকাণ্ডে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন। গতকাল সোমবার দুপুরে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকের দিন থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে।’ এখন থেকে মাদকসহ অন্যান্য সামাজিক সমস্যা নিয়ে পুরোদমে কাজ করবেন বলেও সাংবাদিকদের জানান তিনি।
এর আগে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে দুপুর দেড়টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবে পৌঁছান ইশরাক হোসেন। এ সময় তাঁকে ঘিরে নেতাকর্মীদের স্লোগান দিতেও দেখা যায়।
আরও পড়ুন: দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় নিরলস কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী: আইজিপি
উল্লেখ্য, গত শনিবার অস্ত্র হাতে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের ধাওয়া করার একটি ভিডিও নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন ইশরাক হোসেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ঘটনাটি নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়।
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিস্থিতি দেখতে আকস্মিক পরিদর্শন করছেন, তখন একজন প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আরও পড়ুন: ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই এই দেশের সন্তান : প্রধানমন্ত্রী
পরদিন রোববার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইশরাক হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার পর তিনি একটি পদত্যাগপত্রের খসড়াও প্রস্তুত করেছিলেন। রাত ১০টার দিকে গণমাধ্যমগুলোতে খবর ছড়িয়ে পড়ে, ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এ নিয়ে তোলপাড় তৈরি হলে রাতেই ইশরাক হোসেন তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগসংক্রান্ত খবর অসত্য ও বিভ্রান্তিকর।
এর কয়েক ঘণ্টা পর সোমবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক হোসেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেননি দাবি করে ইশরাক হোসেন বলেছেন, তিনি স্বেচ্ছায় প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সোমবার দুপুরে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেন, অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে তিনি কোনো ভুল করেননি বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘যদি আমার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমি যদি কাউকে আঘাতপ্রাপ্ত করে থাকি বাংলাদেশের যে পর্যায়ের মানুষই হোক, এই অভিযানের মাধ্যমে, সেটার জন্য আগেই আমি দুঃখপ্রকাশ করে নিচ্ছি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমি কোনো ভুল সেদিন করিনি।’
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, নিজের নিরাপত্তার জন্য যতটুকু সময় প্রয়োজন, ততক্ষণই তিনি অস্ত্র হাতে রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে অস্ত্রটি আর দৃশ্যমান ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযান নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ইশরাক। তাঁকে ঘিরে নানা আলোচনা-সমালোচনার কারণে বিএনপি যেন বিব্রত না হয়, সে জন্য তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে গিয়ে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে দাবি করেন।
প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়লেও মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। পদত্যাগ প্রসঙ্গে ইশরাক বলেন, ‘আজকের দিন থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আমি তাঁকে বলেছি, পুরো সময়টাতে ঢাকা-৬ আসন, পার্শ্ববর্তী এলাকা, পরবর্তী সময়ে আরও যদি এলাকা থাকে, সেখানকার মাদক নির্মূল এবং আমাদের জাতীয় জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন এবং তাঁকে এলাকায় কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। ইশরাক হোসেন জানান, নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে প্রথম মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছিলেন। তিনি দেশের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন বলেও উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গত দুই-তিন দিন ধরে ঘটনাটি নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিছু খবর সত্য হলেও কিছু ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ওই দিন কী ঘটেছিল, তা বিস্তারিত তুলে ধরতেই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছেন বলে জানান।
পরিকল্পনা অনুযায়ী গুমটিঘর এলাকায় গিয়েছিলেন উল্লেখ করে ইশরাক বলেন, থানাকে অবহিত করেই তাঁরা সেখানে যান। তাঁর লাইসেন্স করা অস্ত্র সব সময় কোমরে থাকে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে আত্মরক্ষার জন্য তিনি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওর মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে মাদকাসক্তদের হাতে অস্ত্র ছিল না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ঘটনার পর পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যাওয়ার কথাও জানান ইশরাক। রাতে একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়া এবং গণমাধ্যমে বিভিন্ন শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। তাঁর দাবি, ঘটনার দিন প্রধানমন্ত্রী ১৩টি স্থান পরিদর্শন করেছিলেন, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু তাঁকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কারণে প্রধানমন্ত্রীর ওই কর্মকাণ্ডগুলো আড়ালে পড়ে যায়।
পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরেন এবং নিজের পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানান বলে উল্লেখ করেন ইশরাক। তাঁর কারণে প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব যেন ম্লান না হয়, সে কারণেই তিনি পদ ছাড়ার কথা বলেছেন বলে দাবি করেন। তবে মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
এদিকে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে শতভাগ প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তবে মেয়র পদে কে প্রার্থী হবেন, সে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী ও দলের নেতা তারেক রহমান নেবেন বলে জানান সদ্য পদত্যাগ করা এই রাজনীতিক।
ইশরাক বলেন, ২০১৭ সালে মেয়র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। তবে দল অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলেও তাঁকে বিজয়ী করতে শতভাগ প্রস্তুত রয়েছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গত রোববার সরকারসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সূত্রগুলোর দাবি, রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। সেখানেই তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।





