৪ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা

লালমনিরহাটে আগাম শীতের আমেজ, সবজি চাষে ব্যস্ত কৃষক

Sadek Ali
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২:১৯ অপরাহ্ন, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১:৪৬ অপরাহ্ন, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

লালমনিরহাটে বেজে উঠেছে আগাম শীতের পদধ্বনি। ভোরের ঘাসের ডগা আর সবুজ আমন ধানের পাতায় জমছে বিন্দু বিন্দু শিশির। শেষ রাতে হালকা কাঁথা গায়ে জড়াতে হচ্ছে, অনেক বাড়িতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বৈদ্যুতিক পাখা। সন্ধ্যা নামতেই অনুভূত হচ্ছে শীতের হালকা পরশ। অন্যদিকে শীতকালীন খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গাছিরা। গাছ পরিষ্কার করে বাঁধছেন রস সংগ্রহের কলস। প্রকৃতিতে শীতের এমন আগমনী বার্তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উত্তরের সীমান্ত জেলা লালমনিরহাটের মাঠে মাঠে শুরু হয়েছে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের কর্মযজ্ঞ।

কৃষিপ্রধান এ জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রান্তিক কৃষকেরা আগাম সবজি আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কোথাও ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা পরিচর্যা চলছে, কোথাও বেগুন, শিম, লাউ, টমেটো, মুলা ও শাকসবজির ক্ষেত সবুজ হয়ে উঠছে। কৃষকদের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই এসব সবজি বাজারে আসবে। এতে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়, সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে অতিবৃষ্টি, সার ও শ্রমিক সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন চাষিরা।

আরও পড়ুন: ইনানীতে রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর লাপাত্তা রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৪ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জমি থেকে মোট ৭৩ হাজার ৩৭৫ টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে জেলার সবজির বাজারে সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, শিম, লাউ, টমেটো, লালশাক, পুঁইশাক, পালংশাক, ধনেপাতা, গাজর ও মুলাসহ নানা ধরনের শীতকালীন সবজির আবাদ হচ্ছে। বিশেষ করে আগাম সবজি উৎপাদনে অভিজ্ঞ কৃষকেরা মৌসুমের শুরুতেই ফসল বাজারজাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাধারণত আগাম সবজি বাজারে তুলতে পারলে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ কারণে অনেক কৃষক প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি সবজি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

আরও পড়ুন: তুলার গোডাউনে ভয়াবহ আগুন, ক্ষতি ৫০ লাখ টাকা

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, লালমনিরহাটের মাটি ও আবহাওয়া বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন সবজি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। জেলার ৪৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৭টি ইউনিয়নে শীতকালীন সবজি চাষের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় চারটি, আদিতমারীতে চারটি, কালীগঞ্জে তিনটি, হাতীবান্ধায় চারটি এবং পাটগ্রামে দুটি ইউনিয়নে বাণিজ্যিকভাবে আগাম সবজি চাষ করছেন প্রান্তিক কৃষকেরা।

আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের পাঠানঝাড় এলাকার কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, “আমরা অনেক দিন ধরে আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করে আসছি। এবারও আগাম সবজি আবাদ করেছি। সময়মতো ফসল বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যায়। সেই আশাতেই পরিশ্রম করছি। তবে সার, শ্রমিক ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় খরচ নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।”

লালমনিরহাট পৌর এলাকার ভাটিবাড়ী গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “এবার অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে একটি জমিতে দুইবার চারা রোপণ করতে হয়েছে। এতে খরচ বেড়েছে। তার ওপর সার ও শ্রমিক সংকট রয়েছে। বেশি দামে সার কিনে জমিতে দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে আগাম সবজির দাম ভালো পাওয়া যায় বলে লোকসানের আশঙ্কা কাটিয়ে লাভের আশা করছি।

সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের চিনিপাড়া এলাকার কৃষক নাল্টু মিয়া জানান, তিনি আগাম জাতের মুলা চাষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, দিনের বেলায় গরম অনুভূত হলেও শেষ রাতে ঠান্ডা বাড়ছে। ভোরে জমিতে গেলে ঘাস ও সবজির পাতায় শিশির দেখা যায়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুত ফসল বড় হবে এবং বাজারে সবজি সরবরাহ শুরু করা যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

কৃষকদের মতে, আগাম সবজি চাষে লাভের সম্ভাবনা থাকলেও ঝুঁকিও কম নয়। অতিবৃষ্টি, রোগবালাই, পোকামাকড়ের আক্রমণ, সেচের প্রয়োজন এবং বাজারদরের ওঠানামা সরাসরি উৎপাদন ও মুনাফায় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ফসলের শুরুতে দাম ভালো থাকলেও একসঙ্গে বেশি সবজি বাজারে উঠলে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই উৎপাদনের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা পাওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে আগাম শীতকালীন সবজি চাষকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও কর্মচাঞ্চল্য বাড়ছে। জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ ও সেচের কাজে কৃষক পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি দিনমজুরেরাও কাজ করছেন। এতে স্থানীয় পর্যায়ে মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে শ্রমিকের সংকট ও মজুরি বৃদ্ধি কৃষকদের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহ ধরে এ অঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা ২০ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। আগামী কয়েক দিনে সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত কুয়াশার তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তাপমাত্রার এমন পরিবর্তন শীতের আগমনী বার্তা দিলেও সবজি উৎপাদনে এর প্রভাব নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ের আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল আরেফিন বলেন, “দিনে রোদ আর রাতে ঠান্ডার এই আবহাওয়া আগাম সবজি চাষের জন্য উপযোগী। কৃষকেরা আগাম ফসল বাজারে তুলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। তাঁদের চাষাবাদে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, আগাম শীতকালীন সবজির উৎপাদন বাড়াতে উন্নত জাতের বীজ, সুষম সার প্রয়োগ, সময়মতো সেচ, রোগবালাই দমন এবং সঠিক পরিচর্যার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি উৎপাদিত সবজি সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকেরা আরও ভালো দাম পেতে পারেন। কৃষিপণ্য পরিবহনে ব্যয় কমানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগও কৃষকদের লাভ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

সব মিলিয়ে প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে লালমনিরহাটের কৃষকদের মাঠে এখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। বাড়তি উৎপাদন খরচের চাপ থাকলেও আগাম সবজির ভালো দাম পাওয়ার আশায় বুক বেঁধেছেন তাঁরা। অনুকূল আবহাওয়া, কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে চলতি মৌসুমে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ জেলার কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।