জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

জিএম কাদেরের উত্তরার বাসভবনে হামলা-ভাঙচুর

Shahrier Islam Pallab
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: ৭:৪৫ অপরাহ্ন, ১২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৭:৪৬ অপরাহ্ন, ১২ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীর উত্তরায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের বাসভবনে হামলার ঘটনায় জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে জাতীয় পার্টি। এ সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেয়া না হলে দেশজুড়ে বৃহত্তর কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে দলটি। গতকাল সোমবার জি এম কাদেরের বাসভবনে হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ আল্টিমেটাম দিয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। 

সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, এটি শুধু হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা নয়, বরং দলীয় চেয়ারম্যানকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। দেশে বারবার ‘মব কালচারের’ পুনরাবৃত্তি ঘটলেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান জাতীয় পার্টির মহাসচিব। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হবে। এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে জিডি ও মামলা দায়ের করা হবে বলেও জানানো হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং পুলিশ মামলা গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন শামীম হায়দার পাটোয়ারী। এছাড়াও হামলার প্রতিবাদে বাদ আসর বিক্ষোভ মিছিল করেছে দলটির নেতাকর্মীরা। হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁরা জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। গতকাল সোমবার বিকালে রাজধানীর জাতীয় পার্টির (জাপা) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এ প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের বাসায় হামলার ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেছেন, সরকারকে দেখাতে হবে তারা মবকে নিয়ন্ত্রণ করে, মব তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে না। এ ধরনের হামলার মাধ্যমে সরকারের দুর্বলতাই প্রকাশ পাচ্ছে। এভাবে ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বর্তমান সরকার বেশিদিন দেশ পরিচালনা করতে পারবে না। সোমবার রাজধানীতে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন সকালে উত্তরায় দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের বাসায় হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের প্রতিবাদে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

আরও পড়ুন: ঢাকা থেকে সৌদিগামী ৫১ ফ্লাইট বাতিল, বিপাকে ৫ হাজারের বেশি যাত্রী

হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, আজকের এই কাপুরুষোচিত হামলার আমরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমরা মনে করি, এই হামলার মাধ্যমে বর্তমান সরকার তাদের দুর্বলতাই দৃশ্যমান করছে। সরকারকে দেখাতে হবে, তারা মবকে নিয়ন্ত্রণ করে; মব সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে না। সরকারের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা মনে করি, এই সরকারও বেশিদিন দেশ চালাতে পারবে না। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে সব দলকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ কামনা করেন। শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, আমরা আশা করব, বর্তমান সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনা করবে। রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে একজন অত্যন্ত বিদগ্ধ ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা রাষ্ট্রপতিকে বলব, আপনি সব রাজনৈতিক দলকে ডাকুন, তাদের অভিমত শুনুন এবং সমস্যার সমাধান করুন। আপনি সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি। আপনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, শুধু সরকারের রাষ্ট্রপতি নন। সরকারের গত এক মাসের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে জাতীয় পার্টির মহাসচিব অভিযোগ করে বলেন, এ সময়ের মধ্যে দেশের কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি। কোনো সংস্কারও দৃশ্যমান হয়নি। উল্টো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক দফায় বেড়েছে। সার, গ্যাস ও তেল সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি, গত এক মাসে দেশে কোনো সংস্কার হয়নি। দেশের কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি। দ্রব্যমূল্য হু হু করে বাড়ছে। সার পাওয়া যাচ্ছিল না, গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল না, তেল পাওয়া যাচ্ছিল না। বক্তব্যের শেষ দিকে জি এম কাদেরের বাসায় হামলার ঘটনাকে ন্যক্কারজনক উল্লেখ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান শামীম হায়দার পাটোয়ারী। একই সঙ্গে স্বল্প সময়ের নোটিশে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানান তিনি। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনের সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এরআগে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা কিংবা তাঁর বাসভবনে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁরা এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান। একইসঙ্গে হামলার সুষ্ঠু তদন্ত, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তোলেন। তাঁদের ভাষ্য, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি বলে জানিয়েছেন জাপার নেতারা। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী জাতীয় পাটির নেতারা বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো ধরনের হামলা, ভয়ভীতি কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করা উচিত নয়। তাঁরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। এরআগে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে (জিএম কাদের) গ্রেফতারের দাবিতে তার উত্তরার বাসার সামনে ‘স্বৈরাচার বিরোধী সাধারণ জনগণ’—এর ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ওই মিছিল থেকে এসময় বাসায় হামলা করা হয় বলে অভিযোগ উঠে। গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে এই বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের উত্তরার বাসভবনে দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল সোমবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে এ ঘটনা ঘটে। হামলার সময় জিএম কাদের বাসায় ছিলেন। তবে এতে কেউ আহত হননি বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির দপ্তর সম্পাদক মাহমুদ আলম। তিনি বলেন, হঠাৎ একটি ব্যানার নিয়ে এসে একদল দুষ্কৃতকারী পার্টির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। কিন্তু, প্রবেশ করতে না পারে দরজা-জানালায় ইট-পাথর নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালায়। পরে স্লোগান দিয়ে তারা চলে যায়। এ ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানান মাহমুদ আলম। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘স্বৈরাচার বিরোধী সাধারণ জনগণ’—এর ব্যানারে একদল লোক সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জিএম কাদেরের উত্তরা বাসভবনের সামনে উপস্থিত হয়। এ সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে অভিযোগে তুলে জিএম কাদেরকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করে তারা। পরে জিএম কাদেরর বাসভবনের দরজা-জানালা লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়ে।

সরেজমিনে জানা গেছে, ‘স্বৈরাচারবিরোধী সাধারণ জনগণ’-এর ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে অংশ নেন স্থানীয় ছাত্র-জনতা ও সাধারণ নাগরিকরা। বিক্ষোভকারীরা জিএম কাদেরের উত্তরার বাসার সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং তার বিচার দাবি করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি খালিদ মনসুর। তিনি বলেন, বেলা ১১টার দিকে জিএম কাদেদের বাসার সামনে একটি মিছিল হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। বিক্ষোভকারীদের ব্যানারে জি এম কাদেরের প্রতিকৃতির পাশাপাশি লেখা ছিল, জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করে ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ; জি এম কাদেরের গ্রেপ্তার চাই’ এবং ফ্যাসিবাদের ঠিকানা এই বাংলায় হবে না। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে গোপন যোগাযোগ বজায় রাখছে। এ ছাড়া বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টি তৎকালীন সরকারকে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ করেন তারা। বিক্ষোভকারীরা বলেন, নতুন বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া যাবে না। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি এবং ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তুলে তাঁরা জি এম কাদেরকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন: ফের আলোচনায় আইডিয়াল স্কুল

এদিকে জি এম কাদেরের উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের বাসভবনে হামলা চালানোর অভিযোগ করেছে জাতীয় পার্টি। সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার পর এই হামলা চালানো হয় বলে জানান জাপা চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব শৌর্য দীপ্ত সূর্য। তিনি বলেন, উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে ১০০-১৫০ লোক এসে হামলা করে।