আদর্শ বনাম কৌশলের দ্বন্দ্বে এনসিপি
আগামী ১২ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরইমধ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে বল নিজ নিজ কোর্টে আনতে চলছে নানা রকম খেলা। বসে নেই জুলাই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে গড়ে উঠা রাজনৈতিক দল এনসিপিও। ইতোমধ্যে নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যূত্থানের মধ্যদিয়ে গড়ে উঠা নতুন এ দলটির এমন সিদ্ধান্ত কেন্দ্র করে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে অসন্তোষ ও বিভাজন। দলটিতে দেখা দিয়েছে আদর্শ ও কৌশলের দ্বন্দ্ব। অসন্তোষ-দ্বন্দ্ব থেকে এরই মধ্যে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন অন্তত ১৫ জন নেতা। দলটির নেতাদের একাংশ মনে করছে, নিজেদের মধ্যমপন্থার নতুন দলটির দেশের মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলা ও নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার ভালো একটি উপলক্ষ ছিল সংসদ নির্বাচন। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ব্যাপক হতাশ।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এনসিপির যাত্রার শুরুতে নিজেদের একটি মধ্যপন্থি ও নাগরিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করলেও সাম্প্রতিক ‘জোট’ রাজনীতির মাধ্যমে দলটি ক্রমশ ডানপন্থি রাজনৈতিক ধারার দিকে ঝুঁকে পড়ছে, এমন আশঙ্কা থেকেই এ ক্ষোভের জন্ম। পদত্যাগী নেতাদের অভিযোগ, আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে এসে এনসিপি এখন এমন একটি রাজনৈতিক পথে হাঁটছে, যা দলের প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষিত দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শুধু তাই নয়, দলের নেতৃত্ব জোট গঠনের বিষয়ে তৃণমূল কিংবা মধ্যম সারির নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। বরং শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা দলীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থি। তাদের মতে, ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে জোটের আদলে সমঝোতা এনসিপির নাগরিক ও মধ্যমপন্থি ভোটব্যাংকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা দাবি করছেন, এ সমঝোতা একটি বাস্তববাদী রাজনৈতিক কৌশল। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বৃহত্তর ঐক্য ছাড়া নির্বাচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব নয়। দলটির নেতারা বলছেন, এনসিপি এখনো মধ্যমপন্থি রাজনীতিতেই বিশ্বাসী। জোট বা সমঝোতা মানেই আদর্শ বিসর্জন নয়।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে গুলি করে হত্যা
ধারণা করা হচ্ছে, এই জোট এনসিপির জন্য স্বল্পমেয়াদে নির্বাচনি সুবিধা আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দলটির আদর্শিক পরিচয় ও সমর্থক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নতুন ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে এনসিপির যে আলাদা আকর্ষণ ছিল, তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভোট সামনে রেখে সৃষ্ট এই অস্থিরতা আগামী দিনে এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনি প্রস্তুতির ওপর কী প্রভাব ফেলে—সেদিকেই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের দৃষ্টি।
এ বিষয়ে কথা হয় এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন এর সঙ্গে। তিনি বলেন, কে দলে থাকবে বা কে চলে যাবে এটা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। স্বাভাবিকভাবে এক ধরনের টেনশন দলের মধ্যে বিরাজ করছে। আমার পদত্যাগ না করার কারণ হচ্ছে, এনসিপি তো রাজনৈতিক দল। একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্য দিয়ে দল তো আর নাই হয়ে যায় না। মধ্যমপন্থার রাজনীতি বিশ্বাস করে আমি এখানে এসেছি। সুতরাং, আমাদের যারা অর্ডিয়েন্স তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য এবং আমাদের যারা নেতাকর্মী হতাশ হয়ে গেছে, তাদের জন্য দলে থাকতে হবে। তিনি বলেন, তৃণমূলেও অনেকে হতাশ, অনেকে ছেড়ে দিতে চায়। সেই জায়গা থেকে দল ছেড়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। আমি আমার জায়গা থেকে প্রতিবাদ জানিয়েছি যে আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো না। হয়তো পরিস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কিন্তু দল মধ্যমপন্থার রাজনীতিই করবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জোট গঠন সঠিক নাকি ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা যারা পদত্যাগ করেছে তারা সঠিক- এটি এখনই বলা যাবে না। ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এখনো নির্বাচন হয়নি। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত অনেক ধরনের ঘটনা ঘটবে। তার মাধ্যমে হয়তো আমরা সেই বার্তা পাবো।
আরও পড়ুন: আইনশৃঙ্খলা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে নির্বাচন কমিশন
এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন যারা: জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর আগের দিন সন্ধ্যায় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তাসনিম জারা। তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ছিলেন। এর আগে ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সমর্থন জানিয়ে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব মীর আরশাদুল হক। সাইফুল্লাহ, তাজনূভা জাবীন, যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক আজাদ খান ভাসানী, দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক ওয়াহিদুজ্জামান, সদস্য আসিফ নেহাল (আসিফ মোস্তফা জামাল), মীর হাবীব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, আল-আমিন টুটুল, যুগ্ম সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন, আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা প্রমুখ। তবে নেতাদের পদত্যাগে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই বলে জানিয়েছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন। তিনি বলেন, তারা দল ছেড়ে যাওয়ায় দলীয়ভাবে আমরা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি না। তবে তারা থাকলে ভালো হতো। আমাদের অনুরোধ থাকবে তাদের প্রতি তারা যেন এসে আবার দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে। তিনি বলেন, যেহেতু জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনে জোট হয়েছে, এই জোট নির্বাচন পর্যন্ত তো আছেই। এরপর দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এই জোট সামনে কতদিন থাকবে। নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে যে জোটের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু থাকবে। দলের ১৫ নেতার পদত্যাগে দলীয় ইমেজ সংকট দেখা দিয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা পদত্যাগ করলে দলের কিছুটা ক্ষতি হয়, এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। তারা থাকলে ভালো হতো, তবে দলীয়ভাবে কোনো সংকট নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হক বলেন, একটা চ্যালেঞ্জ আছে। এমনিতেই একটি ডানপন্থি অ্যালায়েন্সের সঙ্গে এনসিপি নির্বাচনি সমঝোতা করেছে। এনসিপির গণতান্ত্রিক অংশের নেতারা যদি দল থেকে সরে যায় তাহলে এনসিপির ডান দিকে হেলে পড়ার একটা ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে তৃণমূলে অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে শিকার করেছেন ফরিদুল হক। তিনি বলেন, পুরো ঘটনাটি নিয়ে তৃণমূলে হতাশা ও অসন্তোষ আছে। তৃণমূলকে আমরা প্রস্তুত করছিলাম স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার জন্য। প্রার্থী তৈরি করা, প্রার্থী বাছাই করা, সাংগঠনিক কার্যক্রমসহ সব মিলিয়ে। এখন যেটা হয়েছে বেশিরভাগ আসনে নির্বাচনের সময় নির্বাচনহীন থাকা। এটা রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য খুবই জটিল পরিস্থিতি। তিনি আরও বলেন, নতুন সংগঠন, আমাদের নেতাকর্মীরা খুব অল্প সময়ে লয়াল হয়ে উঠেছে, তা হয় না। আমরা তো ক্যাডারভিত্তিক দল নই। সেই জায়গা থেকে দলের জন্য ঝুঁকি ও ধাক্কা। স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলে অসন্তোষ আছে। সবগুলো আসনে নির্বাচন করলে আমরা নেতাকর্মীরা অন্তত অ্যাক্টিভ থাকতে পারতাম। এলাকায় আমাদের দল-মার্কাকে পরিচিত করাতে পারতাম। এই সিদ্ধান্তের পরে দল তো ঝুঁকির মুখে পড়েছেই।





