শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে রাজনীতিমুক্ত, আচরণবিধি তৈরি হচ্ছে শিক্ষকদের

Any Akter
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৫:৩৫ অপরাহ্ন, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৬:২২ অপরাহ্ন, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • অতিমাত্রায় রাজনীতিতে জড়িয়েপড়া ঠেকাতে পদক্ষেপ
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে ১৫ নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী
  • অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ চালু হচ্ছে

‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে রাজনীতিমুক্ত’ এমন স্লোগানে ঢেলে সাজানো হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের। এখন থেকে শিক্ষকদের মূল পরিচয় শ্রেণিকক্ষে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নয়—শিক্ষাঙ্গনে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা প্রশাসন। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান বাড়াতে সারাদেশে অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন, প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি ক্লাস মনিটরিং এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ চালুর কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া শিক্ষার মানোন্নয়নের ১৫ দফা অনুশাসন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষক রাজনীতিতে লাগাম পরানো যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু তাই নয়, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে। পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষকদের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে পদক ও পুরস্কার এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সেরা শিক্ষকদের পাঠ গ্রহণের সুযোগ দিতে ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর প্রস্তুতি চলছে। যা সাধারণ অভিভাবক ও সচেতন মহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একশ্রেণীর শিক্ষকের অতিরিক্ত রাজনীতি এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে উদাসীনতার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। মন্ত্রণালয়ের এই কঠোর অবস্থানে শিক্ষাঙ্গনে আবার পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরবে এবং শিক্ষকরা ক্লাসে পাঠদানে মনোযোগী হবেন—এমনটাই আশা করছেন অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল।

আরও পড়ুন: আপাতত নিষিদ্ধই থাকছে আওয়ামী লীগ

জানা গেছে, সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দল বা রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারেন না। এমনকি অবসর গ্রহণের তিন বছর পরও তিনি নির্বাচন করতে পারেন না। কিন্তু এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা দেদারসে রাজনীতি-নির্বাচন করে বেড়ান। ব্যবসা থেকে শুরু করে এলাকার গ্রাম্য সালিশ পর্যন্ত তারা করেন। বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত কোনো চাকরি আচরণবিধি না থাকায় এ সুযোগ নিচ্ছেন তারা। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা নামে বেসরকারি হলেও তাদের বেতন ভাতার অংশ সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হয়। তার মানে তাদের চাকরিবিধি ও আচরণ বিধি থাকা উচিত। কিন্তু এত বছরে সেটি হয়নি। এবার সেই আচরণ ও চাকরিবিধি করার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক যেন রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিতে না পারেন সেই প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এমনকি আন্দোলনের চাঁদা তোলা ও তাতে সমর্থনও জানাতে পারবেন না। এমন বিধান করতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে কাজ চলছে। বাস্তবায়নের অগ্রগতিও নিয়মিত জানাতে বলা হয়েছে। তবে শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আচরণবিধি প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। বিদ্যমান একটি খসড়া পরিমার্জনের পর তা চূড়ান্ত বিধিমালায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতে শিক্ষকদের একটি অংশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি তাদের মূল দায়িত্ব পালনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং পাঠদানের প্রতি মনোযোগ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও। এতে শিক্ষকদের অতিমাত্রায় রাজনীতিতে জড়িয়েপড়া ঠেকাতে এবার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য নতুন আচরণবিধি করা হচ্ছে। তাতে শিক্ষকদের রাজনীতিতে জড়ানোর সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ফ্যাশনের ই-সিগারেটে মৃত্যু ঝুঁকিতে যুব সমাজ

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি অতিমাত্রায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহির অভাবে শিক্ষকরা দায়িত্বহীন হয়ে পড়ছেন। এতে শিক্ষায় বিপর্যয় ঘটছে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

বিষয়টি অবগত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতিতে জড়ানো ঠেকাতে আচরণবিধি করার নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা মেনে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আচরণবিধি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি খসড়া পরিমার্জন করে চূড়ান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফলাফল খারাপ হওয়ার জন্য শিক্ষকরা তাদের দায় এড়াতে পারেন না। বিগত দিনে দেখা গেছে শিক্ষকরা ক্লাসরুমে পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগী হয়েছেন বেশি। ফলে সার্বিক ফলাফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকদের রাজনীতিমুক্ত রাখা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার এখন সময়ের দাবি।

মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা অনুশাসন মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে অত্যন্ত দিকনির্দেশনামূলক। তিনি জানান, প্রতিটি উইংকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের এআই প্রশিক্ষণ, অ্যাপভিত্তিক লাইভ মনিটরিং ও জাতীয় শিক্ষা চ্যানেলের প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে চলছে। অনুশাসন বাস্তবায়নের ফোকাল পার্সন ও মাউশির উপপরিচালক (এইচআরএম) মো. শওকত হোসেন মোল্লা বলেন, নির্দেশনাগুলো শতভাগ বাস্তবায়নে নিবিড় তদারকি চলছে। স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আর ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’-এর মতো কারিগরি বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।