হাসপাতালের শিশু রোগীদের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠান ডা. রাজেশ মজুমদার
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. রাজেশ মজুমদারের বিরুদ্ধে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা দিয়ে নির্দিষ্ট বেসরকারি সিটি ক্লিনিকে পাঠানো, প্রাইভেট চেম্বারে রিপোর্ট দেখাতে বাধ্য করা এবং তার পছন্দের ক্লিনিকে পরীক্ষা না করালে ঢাকা রেফার্ড করাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে।
সদর হাসপাতাল ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর এলাকার সন্তান রাজেশ মজুমদার ২০০৬ সালে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে যোগদান করেন। তিনি শিশু রোগ বিষয়ে ডিপ্লোমা (ডিসিএইচ) ডিগ্রিধারী।
আরও পড়ুন: উলিপুর ৩ আসনের মনোনয়ন যাচাই-বাছাই সসম্পূর্ণ
একটানা দীর্ঘদিন শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চাকরি করার পর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি হন। সেখানে কয়েক বছর চাকরি করার পর তিনি পুনরায় শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ফিরে আসেন। দীর্ঘ ১৫ বছর যাবৎ তিনি শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চাকরি করছেন। তিনি সপ্তাহের ৩ দিন ইনডোর ও ২ দিন আউটডোরে রোগী দেখেন। সদর হাসপাতালে চাকরির পাশাপাশি হাসপাতাল সংলগ্ন চৌরঙ্গী মোড়ে অবস্থিত সিটি আধুনিক হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রাইভেট রোগী দেখেন তিনি। হাসপাতালের ডিউটি শেষ করে তিনি তার প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখা শুরু করেন।
ডা. রাজেশ মজুমদার শহরের চৌরঙ্গী এলাকায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে জমি কিনে পাঁচতলা বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেছেন। সেখানে বেসরকারি হাসপাতাল স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে বলেও আলোচনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: এনসিপির মাহবুবের সম্পদ ৯৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা, বছরে আয় ১৫ লাখ
অভিযোগ রয়েছে, সদর হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ডা. রাজেশ মজুমদার হাসপাতালের আউটডোর ও ইনডোরে আসা শিশু রোগীদের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিয়ে শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে অবস্থিত সিটি আধুনিক হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠান। ওই পরীক্ষার রিপোর্ট আবার তার প্রাইভেট চেম্বারে দেখাতে বলা হয়।
সেখানে প্রতিজন রোগীর কাছ থেকে ৭০০ টাকা ভিজিট নেওয়া হয়। এসবের মাধ্যমে তিনি মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্যে জড়িত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তার পছন্দের ক্লিনিকে পরীক্ষা না করালে কিংবা প্রাইভেট চেম্বারে রিপোর্ট না দেখালে ভর্তি রোগীকে ঢাকায় রেফার্ড করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এতে রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, ডা. রাজেশ মজুমদার প্রায়ই সকাল ১০টার পর হাসপাতালে আসেন এবং দুপুর ১টার আগেই চলে যান। মাঝেমধ্যে ডিউটি ফাঁকিও দেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) রাতে তাসনিম নানে নামের এক বছরের এক শিশু ঠান্ডাজনিত জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরদিন রোববার ডা. রাজেশ ভিজিটে গিয়ে শিশুটিকে সিবিসি ও এক্স-রে পরীক্ষা দেন এবং সিটি আধুনিক হাসপাতাল থেকে পরীক্ষা করিয়ে বিকেলে তার প্রাইভেট চেম্বারে রিপোর্ট দেখাতে নির্দেশ দেন।
কিন্তু শিশুটির পরিবার কম খরচে সদর হাসপাতালেই পরীক্ষা করান। পরদিন সোমবার ডা. রাজেশ ভিজিটে গিয়ে বিষয়টি জানতে পেরে শিশুটিকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেন।
শিশুটির মা জুলেখা বেগম বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করিয়েছি বলে ডাক্তার রাজেশ মজুমদার আমাদের ঢাকা নিতে বলেন। এতে আমরা ভয় পেয়ে যাই।”
পরবর্তীতে শিশুটিকে সদর হাসপাতালের সিনিয়র শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মিজানুর রহমানের কাছে নেওয়া হয়। ডা. মিজানুর রহমান শিশুটিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানান, ঢাকায় নেওয়ার প্রয়োজন নেই, শিশুর অবস্থা ভালো আছে। পরদিন মঙ্গলবার ভিজিট শেষে ডা. মিজানুর রহমান শিশুটিকে সুস্থ ঘোষণা করে ছাড়পত্র দেন।
শিশুটির বাবা জহির বয়াতি বলেন, ডা. রাজেশ মজুমদার মেয়েকে ঢাকা নিয়ে যেতে বলায় আমরা ভয় পেয়ে যাই। পরে ডা. মিজানুর রহমান আমাদের আশ্বস্ত করেন ঢাকা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। পরে বুঝতে পারি ডা. রাজেশ মজুমদারের কথামতো সিটি আধুনিক হাসপাতালে পরীক্ষা না করায় এবং তার প্রাইভেট চেম্বারে গিয়ে রিপোর্ট না দেখানোয় তিনি রাগ করে আমার মেয়েকে ঢাকা নিয়ে যেতে বলেছেন। এটা আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে।
ডা. রাজেশ মজুমদারের প্রাইভেট চেম্বারের সাইনবোর্ডে নিজেকে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, কনসালটেন্ট, পেডিয়াট্রিক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ বর্তমানে তিনি শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে কর্মরত। বিষয়টি নিয়েও বিভ্রান্তির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. রাজেশ মজুমদার বলেন, রোগীরা অনেক কথাই বলে। যাকে মনে হয় ঢাকায় নিলে ভালো হবে, তাকেই পরামর্শ দিই। যেসব পরীক্ষা হাসপাতালে হয় না, সেগুলো বাইরে করতে বলি। আমি সরকারি নিয়ম মেনেই চাকরি করি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সত্য নয়।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, “যদি কেউ রোগীদের পছন্দের ক্লিনিকে পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্য করে বা অকারণে রেফার্ড করে, সেটা অপরাধ। সরকারি হাসপাতালে যেসব পরীক্ষা হয়, সেগুলো অবশ্যই এখানেই করাতে হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের প্রমাণ পেলে তাকে শোকজ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”





