শরীয়তপুরে কাবিখা–কাবিটা প্রকল্পে হরিলুট, প্রশ্ন করায় সাংবাদিককে কর্মকর্তার হুমকি

Sanchoy Biswas
মিরাজ পালোয়ান, শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:০৭ অপরাহ্ন, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩২ অপরাহ্ন, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

গ্রামীণ সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকারের কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) প্রকল্পে হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি বা আংশিক সমাপ্ত না করেই পুরো বিল প্রদান করেছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় এক ইউপি সদস্য জানিয়েছেন, প্রতি এক লাখ টাকায় ২০–৩০ হাজার টাকা বিভিন্ন অযুহাতে পিআইও ও তার অফিসের লোকজন কমিশন হিসেবে কেটে রাখে। আমরা পুরো কাজ করতে টাকা পাবো কই? বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করায় গণমাধ্যমকর্মীদের গালাগাল করে বিভিন্ন হুমকি প্রদান করেছেন শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী উজ্জ্বল মণ্ডল।

এমন ঘটনার পরে স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর ভেদরগঞ্জের সব ইউনিয়নে গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকার কাবিখা প্রকল্পের আওতায় ৮৩ দশমিক ৫৩ টন গম, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৯ লাখ ২৩ হাজার ৫৫০ টাকা; কাবিখা প্রকল্পের আওতায় ৮৩ দশমিক ৫৩ টন চাল, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৯ লাখ ২৩ হাজার ৫৫০ টাকা; এবং কাবিটা প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি ৪০ লাখ ৫১ হাজার ৩৯ টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের যোগসাজশে কাবিখা ও কাবিটার কাজ আংশিক বা পুরো সম্পন্ন না করেই বিল প্রদান করেছেন পিআইও। যেসব সড়কে প্রকল্পের আওতায় সংস্কার হওয়ার কথা, তার আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউই জানেন না যে সড়কটি সংস্কার হয়েছে। অথচ কাগজপত্রে সড়ক হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করায় ভেদরগঞ্জ উপজেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী উজ্জ্বল মণ্ডল গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে হুমকি প্রদান করেন।

আরও পড়ুন: দর্শনার কুন্দিপুরে গৃহবধূ ও যুবককে চুল কেটে জুতার মালা পরিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন

কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্প নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্যকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, প্রতি এক লাখ টাকার কাজে পিআইও, উপসহকারী কর্মকর্তাসহ অন্যান্যদের ৩০ হাজার টাকাই কমিশন দিতে হয়। বাকি ৭০ হাজার টাকায় কী কাজ করব বলেন? এর বেশি কোনো তথ্য দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উত্তর তারাবুনিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গায়েনবাড়ির মসজিদ থেকে উত্তর দিকের দোকান পর্যন্ত মাটির রাস্তা নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করার জন্য বরাদ্দ হয় ২ লাখ ২৭ হাজার টাকা মূল্যের গম। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস জানায়, সংশ্লিষ্ট সড়কটির কাজ সম্পন্ন হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিল প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এ বছর তো দূরের কথা, গত পাঁচ বছরেও এই সড়কে এক কোদাল মাটিও সরকার বা কোনো মেম্বার–চেয়ারম্যান ফেলায়নি। তাহলে সড়ক নির্মাণ হলো কীভাবে? প্রতিনিয়ত রাস্তা ভাঙছে আর সরকার প্রকল্পের নাম করে কাজ না করেই বিল উঠায়—এ তো হরিলুটের চেয়ে বড় কিছু। আমাদের ভাষা জানা নাই, এর প্রতিবাদ করার।

আরও পড়ুন: কাপাসিয়ায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল

দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আফা মোল্লা বাজারের ট্রলার ঘাট থেকে দক্ষিণে গিয়াস উদ্দিন প্রধানিয়ার বাড়ি পর্যন্ত মাটির রাস্তা নির্মাণের জন্য বরাদ্দ হয় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার গম। কিন্তু স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এ বছর এই সড়কে কেউ মাটি ফেলেনি। শুধু একদিন ২ জন শ্রমিক এসে রাস্তার পাশের ঘাস পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে। ঘাস পরিষ্কার করতে গিয়ে উঁচু–নিচু সড়ককে সমান্তরাল করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু একদিনে মাত্র ২ জন শ্রমিক কতটুকু কাজ করতে পারে? এরপর এই সড়কে আর কেউ কাজ করেনি। এখন শুনছি, এই রাস্তা নাকি পুনর্নির্মাণ হয়েছে। যদি হয়ে থাকে, তবে তা কাগজে হয়েছে, বাস্তবে হয়নি। প্রকল্পের সভাপতি স্থানীয় চেয়ারম্যান সেকান্দর খান। তিনি জানান, কাজ শেষ করে ইতোমধ্যে তিনি বিল তুলে নিয়েছেন এবং কাজটি অফিসের নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে বলে দাবি করেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা নয়, অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন চেয়ারম্যান সেকান্দর খান। এছাড়াও বাকি সব ইউনিয়নের প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট সড়ক পরিদর্শনে একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কাজ হয়েছে আংশিক, কোথাও হয়নি কোনো কাজই।

গত মঙ্গলবার সকালে গায়েনবাড়ি এলাকার মানিক গায়েন বলেন, গত ৩–৪ বছরে এই সড়কে কোনো কাজ হয়নি। এক কোদাল মাটিও কাটা হয়নি। আমি সব সময় এই সড়কের কাছে থাকি, আমার দুই চোখে আমি দেখিনি যে এই সড়কে কাজ হয়েছে। এখন আপনারা বলছেন, কাজ হয়ে গেছে। কাজটা হলো কখন? গত ৩–৪ বছর ধরে সড়কের একই অবস্থা। বৃষ্টি–বাদলে আমাদের নৌকা দিয়ে চলাফেরা করা লাগে। এ বছরও নৌকা লাগবে। অনেকে বর্ষার জন্য নৌকা বানাতে দিয়েছেন। সড়ক হলে তো আর নৌকা বানাতে দিত না।

আফা মোল্লা বাজার এলাকার আব্দুস সালাম নামে একজন গত মঙ্গলবার জানান, আমি পেশায় একজন অটোচালক। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করি। যদি কেউ সড়কে কাজ করত, তাহলে আমি দেখতে পেতাম। যদি গভীর রাতেও কেউ কাজ করে থাকেন, তাহলে তারও কোনো প্রমাণ সড়কে দেখা যায়নি। কাগজপত্রে অনেক কিছুই হয়, বাস্তবতা ভিন্ন জিনিস।

গত মঙ্গলবার দুপুরে পুরো বিষয়টি জানার জন্য ভেদরগঞ্জ উপজেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখায় গেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে অফিসে পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী উজ্জ্বল মণ্ডলের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বিল প্রদানের নিয়ম আছে বিধায় আমরা বিল প্রদান করেছি। যদি কেউ বিল নিয়ে কাজ না করেন, তাহলে লাল তালিকা করে টাকা ফেরত আনবে সরকার। কাজ না করে বিল দেওয়া যায়—এমন প্রমাণপত্র চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন উজ্জ্বল মণ্ডল। তিনি পুরো বিষয়টির বক্তব্য না দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে অফিস থেকে চলে যান। এসময় তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে তাদের ছবি তুলে রাখেন।

এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হাসান আহমেদ মোবাইলে কল দিলে বলেন, আমি একসঙ্গে দুইটি উপজেলার দায়িত্বে থাকায় প্রকল্পের কাজসমূহ সঠিকভাবে তদারকি করা সম্ভব হয়নি। যদি কাজ না করে কেউ বিল নিয়ে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

বিষয়টি নিয়ে ভেদরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হাফিজুল হক বলেন, অভিযোগের বিষয়গুলো আমি শুনেছি। যারা কাজ না করে বিল নিয়ে গেছে, তাদের বিষয়ে আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।