৩ লাখ মানুষের ২ চিকিৎসক
তাহিরপুরে জনবল সংকটে ব্যাহত স্বাস্থ্যসেবা
হাওর বেষ্টিত ভাটির জনপদ খ্যাত, সুনামগঞ্জ জেলার অবহেলিত, অনুন্নত, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষাধিক্ষাসহ নাগরিক নানা সুযোগসুবিধা বঞ্চিত তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্খিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলাবাসী।
জানা যায়, উপজেলার বালিজুড়ি, বাদাঘাট, দক্ষিণ শ্রীপুর, উত্তর শ্রীপুর, বড়দল উত্তর, বড়দল দক্ষিণ ও তাহিরপুর সদর এই ৭ ইউনিয়নের ৩ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা চলছে, মাত্র ২ জন চিকিৎসক দিয়ে।
আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় সাংবাদিক পরিচয়ে শ্রমিক নেতাদের মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ
জেলার হাওরাঞ্চলের এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে, প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৬ শতাধিক রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমসিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৭৮ ৩১ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালটি নির্মিত হয়। শুরু থেকেই চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটে ধুকছিল হাসপাতালটি। পরে ২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি নতুন ভবন নির্মাণের মাধ্যমে হাসপাতালটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না দেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটির কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে কিছু সংখ্যক জনবল ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হলেও আজও কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না হাওরের উপজেলা তাহিরপুরবাসী।
আরও পড়ুন: পাচারচক্রের হাত থেকে শিশু উদ্ধার, পাচারকারী নারী গ্রেফতার
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালটিতে অনুমোদিত ১২৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ৬৮টিরও বেশি পদই রয়েছে শূন্য।
এরমধ্যে ১৩ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন, মাত্র ২ জন, বাকি ১১টি পদই রয়েছে শূন্য। আবাসিক চিকিৎসক, মেডিসিন, গাইনি, সার্জারি ও অ্যানেসথেসিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো কার্যত রয়েছে অচল।
২১ জন নার্সের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১০ জন, এরমধ্যে ৩ জন রয়েছেন, শিক্ষা ছুটিতে। ৪ জন মিডওয়াইফারির মধ্যে রয়েছেন মাত্র ১ জন। ল্যাব টেকনিশিয়ান, রেডিওলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টের পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্যই রয়েছে। প্রশাসনিক, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বহু সংখ্যক পদ শূন্য থাকায় হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন গড়ে ৫-৬ শতাধিক শিশু, নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে।
উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের রামজীবনপুর গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী হাবুল মিয়া বলেন, চিকিৎসক সংকট এখানে নিত্যদিনের সমস্যা। গত কয়েক যুগ ধরেই হাসপাতালটিতে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়।
উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের হলহলিয়া থেকে আসা রোগী, রিয়াজ উদ্দিন বলেন, উপজেলার ৭ ইউনিয়নের প্রায় ৪ লক্ষ জনগণের চিকিৎসা সেবার একমাত্র হাসপাতাল এটি। এই হাসপতালে দীর্ঘদিন ধরেই, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলাবাসী। আশা করি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
উপজেলার জ্যৈষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী গোলাম সরোয়ার বলেন, হাসপাতালের জনবল সংকট নিয়ে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর, সাময়িকভাবে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলেও কিছুদিনের মধ্যেই তারা অন্যত্র বদলি হয়ে চলে যান। ফলে এই হাসপাতালটিতে কখনই জনবল ও চিকিৎসক সংকট পূরণ হয় না। আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হওরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের বিষয়টির স্থায়ী সমাধান করবেন।
জানতে চাইলে, তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ আহমেদ বলেন, চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল সংকট এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির জন্য নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে মাত্র ২ জন চিকিৎসক দিয়ে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় শত রোগীর সেবা দিতে গিয়ে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারপরও সবাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে। আমি যোগদানের আগেও এসব সংকট ছিল। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।





