খননের অভাবে ১১০ খাল মরা
সিরাজগঞ্জের নদ-নদী ও খাল-বিলগুলো দখল, দূষণ এবং খননের অভাবে মরা খালে পরিণত হয়েছে। কোথাও উৎসমুখে বাঁধ, কোথাও তীর দখল, ক্রমাগত কমছে নদীর প্রশস্ততা ও গভীরতা, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, কমছে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। এতে শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্যই নয়, হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতি। জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় নদ-নদী ও খাল-বিলের এমন চিত্র।
জেলা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের খরস্রোতা বড়াল নদী যা কাটাখালী নামে পরিচিত। এ নদী দিয়ে একসময় চলাচল করত বড় বড় নৌকা, লঞ্চ ও জাহাজ। যমুনা নদীর সদর বাঐতারা সুইচ গেট থেকে উৎপত্তি হয়ে পৌর এলাকার রহমতগঞ্জ পতিতমুখে ৯ কি,মিটারের নদী দখলে এখন সরু হয়ে খালে রুপান্তরিত। নদীর তলদেশজুড়ে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বিগত সময়ে পৌর কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় এই খালের উপর কোটি কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করলেও কোনো সুফল হয়নি।
আরও পড়ুন: শেরপুরে অবৈধ মজুদের জন্য ৮৩৫ লিটার ডিজেল জব্দ, ১ লাখ টাকা জরিমানা
এমন চিত্র - যমুনা, ইছামতী, বাঙ্গালী, করতোয়া, ফুলজোড়, বেসানী,ভাদাই, মানস, হুরাসাগর, কালুদাহা, জলজপিয়া, গোহালা, বান্নী, দুর্গাদহ, বড়াল, স্বরসতী, কাটাগাং, বিল সুর্য, কুঠিবাড়ি, আড়দহ, ঝবঝবে, কবিলয়া, মুক্তাহার, শালিখা ও বানিয়াজানসহ ২৭টি নদ-নদীর। কোথাও উৎসমুখে দেওয়া হয়েছে বাঁধ, কোথাও করা হয়েছে নদীর তীর দখল। আবার অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন। ফলে নদ নদী হচ্ছে খাল বিল আর খাল বিল হচ্ছে নালা বা ড্রেন। এসব কারণে ক্রমাগত কমছে নদীর প্রশস্ততা ও গভীরতা। ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির প্রবাহ, কমে যাচ্ছে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল।
জেলা প্রশাসন কার্যালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা যায়, জেলার ৯ টি উপজেলার উপর দিয়ে প্রায় ২৭ টি নদ-নদী বিভিন্ন নামে প্রবাহিত হয়েছে। এসকল নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০৫ কিলোমিটার। অপরদিকে, খাল বিলের সংখ্যা মোট ৩০৩ টি। এর মধ্যে খননের অভাবে ১১০ টি মৃত বা মরা খালে পরিনত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ৩ মে থেকে ধান-চাল-গম সংগ্রহ শুরু করবে সরকার, লক্ষ্যমাত্রা ১৮ লাখ টন
সিরাজগঞ্জ সদর কয়েল গাঁতি, শিবনাথপুর ও জগত গাঁতির মরা খাল পাড়ের আব্বাস উদ্দীন, গোলাম রসুল, আমিনুল ইসলাম, সোলেমানসহ শত শত কৃষক বলেন, এক সময় এসব খালে বারো মাসেই পানি থাকতো। সেই পানি সেচ দিয়ে জমিতে আবাদ বসত করতাম। দেশীয় প্রজাতির হরেক রকমের মাছ ধরতাম। খালের পানিতে গোসলসহ নিত্যদিনের কাজ করা হতো।
ফুলজোড় নদীর পাড়ের নলকা এলাকার সতীশ হাওলাদার বলেন, একসময় এই নদীতে মাছ ধরে আমাদের জীবিকা চলত। এখন নদী মৃত প্রায় হয়ে গেছে। পানি নেই বললেই চলে। দ্রুত খনন না করলে নদী পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।
হুরাসাগর নদী তীর এলাকার কোনা গাঁতির স্থানীয় বাসিন্দা ষাটোর্ধ বৃদ্ধ কলিমউদ্দিন বলেন, আগে আমাদের এই নদীতে অনেক পানি থাকত। গা-গোসল, ধোয়া-কাচার কাজ করতাম, এখন একটুও পানি থাকে না। যে যেমন পারছে, দখল করে আবাদ বসত করছে।
বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রফিক মোল্লা বলেন, নদী পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রথমেই উৎসমুখে নির্মিত বাঁধ অপসারণ করতে হবে। নদ নদী ও খাল বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হলে উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু খনন করলেই হবে না। দখলমুক্ত ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেই সাথে যমুনা নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালি উত্তোলন বন্ধ করতে হবে।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার খাল খনন কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু করেছে। খাল বিল ও নদ নদীগুলো পুনরুদ্ধারে খননের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করলে কৃষিবিপ্লবসহ জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।
দখল ও দুষণ কথাটি ঠিক না দাবী করে জেলা প্রশাসক মো আমিনুল ইসলাম বলেন, মৃত খালগুলো পতিত থাকায় স্থানীয় ভাবে কেউ না কেউ চাষাবাদ করছে। সরকারের প্রয়োজনে আমরা যে কোনো সময় কাজ করতে পারি।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহিষ্ণুতা অর্জনে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সারা দেশে খাল খনন ও পুন খনন কার্যক্রম গ্রহণের আলোকে জেলার সকল উপজেলা হতে প্রেরিত খাল সমুহের হাল নাগাদ তথ্য নদ নদী ও খাল বিলের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।





