প্রবাসে দেখা স্বপ্ন, দেশে ফিরে সফলতা
বেকারত্ব ঘোচাতে একসময় পাড়ি জমিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। সেখানে চাকরির ফাঁকে টেলিভিশনে একটি কোয়েল খামারের প্রতিবেদন দেখে জন্ম নেয় নতুন স্বপ্ন। দেশে ফিরে গড়ে তুলবেন আধুনিক কোয়েল খামার। দীর্ঘদিন ধরে লালন করা সেই স্বপ্নই আজ বদলে দিয়েছে তাঁর জীবন। এখন তিনি শুধু সফল উদ্যোক্তাই নন, স্থানীয়দের কাছে পরিচিত 'কোয়েল শামীম' নামে।
কথা বলছি টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কচুয়া (ভাতকুড়া পাড়া) গ্রামের উদ্যোক্তা শামীম আল মামুনের কথা। কোয়েলের বাচ্চা উৎপাদন ও বিক্রি করে তিনি বর্তমানে মাসে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় করছেন। তাঁর খামারকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান, আর অন্যান্য খামারিরাও পাচ্ছেন নতুন অনুপ্রেরণা।
আরও পড়ুন: ডেভিড ইমনসহ ৫ আসামির ১০ দিনের রিমান্ড
শামীম আল মামুন বলেন, ২০০৫ সালে জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে যাই। সেখানে একটি পানির কারখানায় চাকরি করি। একদিন কাজ শেষে টেলিভিশনে কৃষি উন্নয়নবিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে বগুড়ার একটি সফল কোয়েল খামারের প্রতিবেদন দেখা হয়। অনুষ্ঠানটি মনে গভীর ছাপ ফেলে। সেদিনই সিদ্ধান্ত নেই, দেশে ফিরে কোয়েলের খামার দিব। বিদেশে থাকতেই খামারের নাম ঠিক করি "সোনার বাংলা কোয়েল খামার"। কিন্তু বর্তমানে এর নাম ‘সোনার বাংলা সোনালী অ্যান্ড কোয়েল হ্যাচারি’।
তিনি বলেন, ২০১১ সালে ছয় বছরের প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে প্রথমেই বগুড়ায় গিয়ে ওই খামার পরিদর্শন করি। অভিজ্ঞ খামারি জামালের কাছ থেকে হাতে-কলমে পরামর্শ নেই। বিয়ের পর নিজের স্বপ্নের কথা স্ত্রীকে জানালে তিনিও পাশে দাঁড়ান এবং সাহস জোগান। ২০১২ সালের শুরুতে বাড়ির পাশের ২০ শতাংশ জমিতে গড়ে তোলেন কোয়েল খামার। বগুড়া থেকে ৫০০টি কোয়েলের বাচ্চা এনে শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা।
আরও পড়ুন: সিংড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মাছ ব্যবসায়ী নিহত, আহত ১
পরিশ্রম আর পরিকল্পনার ফল মিলতে বেশি সময় লাগেনি। মাত্র তিন বছরের মধ্যে খামারে কোয়েলের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। শামীমের সফলতার কথা ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ খামার দেখতে আসতে শুরু করেন।
তবে ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারিতে বড় ধরনের ধাক্কা খায় তাঁর ব্যবসা। কোয়েল ও ডিম বিক্রি কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েন। অনেক খামারি তখন ব্যবসা গুটিয়ে নিলেও শামীম হাল ছাড়েননি। নতুন সম্ভাবনার খোঁজে ২০২৩ সালে চালু করেন আধুনিক কোয়েল হ্যাচারি।
বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার প্রজননক্ষম মা কোয়েল। প্রতিদিন এসব পাখি থেকে ১০ থেকে ১২ হাজার হ্যাচিং ডিম সংগ্রহ করা হয়। হ্যাচারিতে ১৭ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ কোয়েলের বাচ্চা দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিদের কাছে বিক্রি করেন তিনি। প্রতিটি বাচ্চা ৭ থেকে ৮ টাকায় বিক্রি হয়, যার মধ্যে ২ থেকে ৩ টাকা লাভ থাকে। সব মিলিয়ে মাসিক আয় দাঁড়ায় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকায়।
সম্প্রতি খামারে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচজন শ্রমিক ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ পাখিকে খাবার দিচ্ছেন, কেউ ডিম সংগ্রহ করছেন, আবার কেউ হ্যাচারির কাজ দেখছেন। বিদ্যুৎ চলে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে চালু করা হচ্ছে জেনারেটর, যাতে উৎপাদন ব্যাহত না হয়। পাখির খাদ্য প্রস্তুতের জন্যও খামারে রয়েছে নিজস্ব ফিড তৈরির মেশিন।
শামীম আল মামুন বলেন, এই খামারই এখন আমার জীবন। কাজের মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পাই। প্রতি মাসে ভালো আয় হওয়ায় আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা পাই। আমাকে দেখে সখীপুরে অন্তত ছয়-সাতজন নতুন করে কোয়েলের খামার করেছেন। সারা দেশেও শতাধিক উদ্যোক্তা আমার খামার দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এসে খামার ঘুরে দেখেন এবং পরামর্শ নেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, অল্প পুঁজিতে লাভজনক উদ্যোগ হিসেবে কোয়েল পালন দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। কোয়েলের ডিম ও মাংস পুষ্টিকর এবং এতে কোলেস্টেরলের পরিমাণ তুলনামূলক কম। মুরগির ভ্যাকসিন দিয়েই কোয়েলের চিকিৎসা করা যায়।
তিনি আরও বলেন, কোয়েল একটি পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক পাখি। ডিম থেকে ফোটার ছয় থেকে সাত সপ্তাহের মধ্যেই লেয়ার জাতের কোয়েল ডিম দেওয়া শুরু করে এবং প্রায় ১৮ মাস নিয়মিত ডিম দেয়। অন্যদিকে ব্রয়লার জাতের কোয়েল মাত্র চার সপ্তাহেই বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে। একটি কোয়েল বছরে গড়ে ২৮০ থেকে ৩০০টি ডিম দেয়।
তিনি বলেন, শামীম আল মামুন এ উপজেলার একজন অনুকরণীয় সফল উদ্যোক্তা। তাঁর মতো তরুণদের এগিয়ে এলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।





