স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষিত মানুষই প্রয়োজন?

Any Akter
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশিত: ৭:২৩ অপরাহ্ন, ১৭ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩২ অপরাহ্ন, ১৭ মার্চ ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সদ্য বিদায় নেওয়া আলোচিত

ও বিতর্কিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের মানুষ ক্রমাগত আশাহত হয়েছে। মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দিনগুলোতে দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা ছিল অন্যরকম। মানুষ মুখিয়ে ছিল অভিনব কিছু দেখবে বলে। রাষ্ট্র পরিচালনায় এদের বছরদেড়েক সময়ের মধ্যে  সংস্কার সংস্কার বলে যে আওয়াজ গণমানুষের কানে বেজে চলেছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সে আওয়াজ যেন বন্যার জলের স্রোতের মতন ভেসে গেছে অনেক দূরে। সে অনভিজ্ঞ সরকার অনেক কিছুতে হাত দিলেও কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি। এমন বান্ধা ও শ্বাসরুদ্ধকর সময়ে যে দুয়েকটা ভালো উদ্যোগ তারা গ্রহণ করেছিল এর মধ্যে দেশের স্কুল-কলেজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিচালনা কমিটির প্রধানের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেঁধে দেওয়া ছিল অন্যতম। এটা করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকেই। কারণ পটপরিবর্তনে অব্যবহিত পরেই দেশব্যাপী স্কুল-কলেজ দখলে নেয়ার এক হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ /এমএ করার 

আরও পড়ুন: জিয়ার ঐতিহ্য: জাতীয়তাবাদ, নেতৃত্ব এবং জনগণের মনোনয়ন

প্রজ্ঞাপন জারি করার পর গ্রামে গঞ্জে, জনমনে একটা স্বস্তির পরিবেশ ফিরে এসেছিল। সরকার সঠিক কাজ করেছে বলে সাধারণ মানুষের মন্তব্যও শোনা গেছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠির শর্তের ফলে শিক্ষক কর্মচারীও তা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিয়েছে। 

২.

আরও পড়ুন: তারুণ্যের ক্ষমতায়নেই বাংলাদেশের টেকসই ভবিষ্যৎ

অতি সম্প্রতি নতুন সরকারের শিক্ষা মন্ত্রী'র এক আকস্মিক   মন্তব্যের জের ধরে সমালোচনার ঝড় যেন স্ফুলিঙ্গের মতন ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী। রাস্তা ঘাটে, হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে সর্বত্র কথা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হবে। অমনি পত্র পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শতশত ট্রল, বাঁকা মন্তব্য, রম্য নাটক, সংসদেও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কড়া বক্তব্য চলমান থাকে। এতে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে মন্ত্রী'র বিরুদ্ধে। কারণ হতে পারে যে, এই মন্ত্রী'র কাছ থেকে গণমানুষের প্রত্যাশা তুলনামূলক ভাবে বেশি। আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে তিনি ছিলেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। তখনকার দিনে দেশের পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো থেকে নকল বন্ধ করার পেছনে তাঁর যাদুকরী পদক্ষেপ, ঝটিকা সফর তথা অভূতপূর্ব শ্রমের কথা এতদিন পরেও মানুষ হয়তো ভুলে যায়নি। তখন মানুষ তাঁর নাম দিয়েছিল হেলিকপ্টার মন্ত্রী। তাছাড়া আজকে যখন দেশের মানুষের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭২%, ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫ কোটির কাছাকাছি আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণ হারে। মন্ত্রী'র নিজের দেশে-বিদেশে উচ্চ শিক্ষাসহ পিএইচডি ডিগ্রিধারী হওয়া ইত্যাদিও মানুষের নজর এড়ায়নি। তিনি শপথ নিয়েই শিক্ষাখাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব তথা প্রাধান্য দেওয়ার আশার বাণী শুনিয়েছেন। সেখানে তাঁর মুখেই যদি সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতায় শিথিলতার বিষয় উত্থাপন করা হয়, তা দেশের  মানুষকে হতাশ করবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাছাড়া  আগের তুলনায় মানুষ এখন অনেক বেশি সমাজ সচেতন  অধিকতর তথ্যবান্ধব ও সমালোচনাপ্রিয় হয়েছে। মানুষ 

তর্কপ্রিয় তো বটেই। 

৩.

এমনিতেই আধুনিক বিশ্বের বহুমাত্রিক প্রযুক্তি নাগালের মধ্যে পাওয়া এবং ব্যবহারের কারণে তা নিম্মমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের  শিক্ষার ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে চলেছে। বিগত কয়েক বছরে গ্রামীণ জনপদে অবস্থিত প্রায় সকল প্রকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি এর প্রভাব পড়েছে। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠ গ্রহণে বা পরীক্ষায় অংশ নিতে অনীহা প্রদর্শন করছে। যদিও বছরান্তে নিয়ম অনুযায়ী ফরম পূরণ করা হচ্ছে, ফি প্রদান করা হচ্ছে। পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তারা বেশিরভাগই ভালো কিছু লিখতে পারছে না। অথচ পাশের হার দেখানো হয়েছে অধিকতর। এটা ছিল আত্মতুষ্টির ফলাফল আর শিক্ষার হার বৃদ্ধির গোপন রহস্য। অন্যদিকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির পদ্ধতিতে  নানা গবেষণা করার কারণে ছাত্র ছাত্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। সংকট দেখা দেয় গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষকের। এমনকি  বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। দেশে এমন নানাবিধ সমস্যা প্রকটভাবে বিরাজমান রয়েছে। অথচ গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বলা যায়, শুধু এমপিও ভূক্তির আশীর্বাদ নিয়েই টিকে আছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ভালো শিক্ষকের আকাল ও  দুঃসময়ের মধ্যে ম্যানেজিং কমিটির চাপে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয়েছে। অনেক সময় যোগ্যতাসম্পন্ন জনপ্রিয় শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তকে চুড়ান্ত করে সরকারি  প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে কমিটি আরও বেশি স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। 

এক্ষেত্রে স্কুল কলেজের উন্নয়ন, শিক্ষার মান, লেখাপড়ার পরিবেশ, বাৎসরিক রেজাল্ট, শ্রেণি কক্ষের অবস্থা, ছাত্র ছাত্রীর উপস্থিতি, অভিভাবক সম্মিলন এসব খেয়াল না করে এধরণের কমিটির নজর থাকে মূলত নিয়োগ প্রক্রিয়ার দিকে। আর নিয়োগ মানে টাকার বিনিময়ে অযোগ্য বেকারকে চেয়ারে বসানো। তখনই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে নিত্য রুজিরোজগারের এক ব্যাংক। অনেক সময় শোনা গেছে, স্হানীয় সংসদ সদস্য একদিন তাঁর নিবেদিতপ্রাণ জনৈক কর্মীকে বলেছেন, 'তোমার জন্য কিছু করতে পারি নি, তোমাকে একটা স্কুল /কলেজ দিয়ে দিচ্ছি। এটা দিয়েই তোমার চলে যাবে'। 

৪.

এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, স্কুল কলেজে কেন সভাপতি এবং এজাতীয় কমিটির প্রয়োজন কী? 

কমিটি না থাকলে কী কোনো  সমস্যা হতে পারে? বাস্তবতা হলো, ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্হানীয় অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত একটা কমিটি রয়েছে। যা মূলত শিক্ষার পরিবেশ এবং অন্যায়, অনিয়ম, অনাচার ইত্যাদি হচ্ছে কিনা তার নজরদারি করাই এ কমিটির কাজ। কিন্তু কালক্রমে তা হয়ে ওঠেছে রাজনৈতিক দলের বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আধিপত্য প্রদর্শনের এক নিরাপদ স্থান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ কমিটির অস্তিত্ব না থাকলেও কিছু যায় আসে না। প্রত্যেক উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে সকল স্তরের জন্যে পৃথক পৃথক সরকারি কর্মকর্তার পদায়ন। প্রতিষ্ঠান সুপারভিশনের দাপ্তরিক দায় মূলত তাঁদের। তাঁরাই ভালো মন্দের রিপোর্টিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। তথাপি এ কমিটির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে সর্বময় ক্ষমতা। এখানে লাগাম টেনে ধরতে পারলে বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন আশা করা যায়। অন্যথায় মাঠ পর্যায়ের গতানুগতিক ধারার শিক্ষা কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো ছাপ পড়বে না।

কমিটির সভাপতি পদের জন্য অবশ্যই উচ্চ শিক্ষিত, গ্রহণযোগ্য, সৎ সাহসী মানুষ প্রয়োজন। তিনি  হতে পারেন একই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্র, চাকরিরত বা অবসরপ্রাপ্ত উচ্চ পদস্থ সরকারি, বেসরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, 

শিল্পপতি ইত্যাদি পদাধিকারী। অর্থাৎ সমাজসেবা যার ব্রত। তবে তাকে অবশ্যই শিক্ষকগণের চেয়ে কম ডিগ্রিধারী হলে বিবেচনায় আনা যাবে না। কারণ এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। উচ্চশিক্ষিত প্রাক্তন ছাত্ররা তার নিজের স্মৃতি- জাগানিয়া,নস্টালজিক প্রতিষ্ঠানের অমঙ্গল কখনো করতে পারে না। তাই সভাপতি হওয়ার জন্যে এদের অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। 

৫.

যতদূর জানা যায়, সরকার ম্যানেজিং কমিটির জন্যে শিক্ষাগত যোগ্যতার শৈথিল্যের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বা আরও পরিশীলিত কোনো আদেশ দানের অপেক্ষায় আছে। আসল কথা হলো, 

সভাপতি পদের জন্যে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বহাল রাখা হচ্ছে। দিনেরশেষে তা-ই যেন হয়। তবে তা যেন শতভাগ রাজনৈতিক বিবেচনায় না করা হয়। বরঞ্চ দলমতের উর্ধ্বে উঠে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে অন্তত একজন সজ্জন, বিদ্যানের হাতে দেওয়া হয়। ভাবতে হবে, গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে আসার এটাই উপযুক্ত সময়। নতুন সরকারের কাছে দেশের জনগণ এমনটাই প্রত্যাশা করবে।


লেখক : হোসেন আবদুল মান্নান, গল্পকার, কলামিস্ট।