দেশকে সত্যিকারের উদ্যোক্তা বান্ধব হতে হবে

Sanchoy Biswas
এম এফ ইসলাম মিলন
প্রকাশিত: ৪:৩৩ অপরাহ্ন, ২৬ মে ২০২৬ | আপডেট: ৫:৪৯ অপরাহ্ন, ২৬ মে ২০২৬
ছবিঃ এম এফ ইসলাম মিলন, ব্যবসায়ী ও কলামিস্ট
ছবিঃ এম এফ ইসলাম মিলন, ব্যবসায়ী ও কলামিস্ট

বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন ও সম্ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে। তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রযুক্তির বিস্তার, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং নতুন নতুন ব্যবসায়িক ধারণা দেশের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এখনও একজন নতুন উদ্যোক্তাকে ব্যবসা শুরু করতে গেলে নানা ধরনের জটিলতা, প্রশাসনিক ধীরগতি, অর্থায়নের সংকট, অযাচিত হয়রানি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায় কিংবা টিকে থাকার সংগ্রামে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থেই বাংলাদেশকে একটি সত্যিকারের উদ্যোক্তা বান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।

বর্তমান বিশ্বে যে দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, তাদের উন্নয়নের পেছনে উদ্যোক্তাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। ক্ষুদ্র উদ্যোগ একসময় বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, উৎপাদন বাড়ায় এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।বাংলাদেশেও যদি তরুণদের চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং চাকরিদাতা হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে উদ্যোক্তা সংস্কৃতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

আরও পড়ুন: তারেক রহমানের নতুন সংগ্রামের ডাক ও আগামীর বাংলাদেশ

প্রথমত, উদ্যোক্তা বান্ধব পরিবেশ মানেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। দেশে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। একজন সফল উদ্যোক্তা শুধু নিজের জীবনই পরিবর্তন করেন না, বরং আরও অনেক মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা করেন। ফলে বেকারত্ব কমে এবং দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল হয়।

দ্বিতীয়ত, সহজ ও বাস্তবসম্মত অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের দেশে নতুন উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ নিতে গেলে জামানত, জটিল কাগজপত্র, উচ্চ সুদ এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে হতাশ হয়ে পড়েন। অনেক সময় মেধাবী ও উদ্ভাবনী তরুণরা শুধু মূলধনের অভাবে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেন না। তাই স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি সহায়তা বাড়াতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও বিশেষ প্রণোদনা ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই সুখী! আপনিই কি কেবল অসুখী?

তৃতীয়ত, প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানি কমাতে হবে। একটি ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, ভ্যাট নিবন্ধন কিংবা অন্যান্য অনুমোদন নিতে গিয়ে অনেক উদ্যোক্তাকে অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির শিকার হতে হয়। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সময়মতো সহযোগিতা না পাওয়া, অকারণ ফাইল জট, ঘুরে ঘুরে সেবা নিতে বাধ্য হওয়া কিংবা নানা ধরনের অনৈতিক চাপ নতুন উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে আরও হয়রানির মুখোমুখি হন। একটি ব্যবসাবান্ধব রাষ্ট্রে এই ধরনের পরিস্থিতি কখনোই কাম্য হতে পারে না। তাই দ্রুত, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং কার্যকর “ওয়ান স্টপ সার্ভিস” বাস্তবায়ন করতে হবে।

চতুর্থত, উদ্যোক্তাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র ত্রুটি বা সাময়িক সীমাবদ্ধতাকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবসা ধ্বংসের পরিবেশ তৈরি করা একটি সুস্থ অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। গঠনমূলক সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে সত্যনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল এবং জনস্বার্থকেন্দ্রিক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু অসাধু মহল ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল না হলে সাংবাদিকতার আড়ালে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর কিংবা অতিরঞ্জিত তথ্য প্রচার করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে। এর ফলে শুধু উদ্যোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং প্রতিষ্ঠানে শত শত বিনিয়োগকারী সহ কর্মরত বহু মানুষের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়ে।

একজন উদ্যোক্তা নিজের শ্রম, সময়, মেধা ও পুঁজি বিনিয়োগ করে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাই অসত্য তথ্য বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেওয়া মানে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করা। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা অবশ্যই রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে অপসাংবাদিকতা, চাঁদাবাজি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। গণমাধ্যম হবে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম নয়।

পঞ্চমত, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। অনলাইন ব্যবসা, ই-কমার্স, অ্যাপভিত্তিক সেবা, ফ্রিল্যান্সিং এবং ডিজিটাল মার্কেটিং নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের তরুণরা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। তাই প্রযুক্তি শিক্ষা, স্টার্টআপ ইনকিউবেশন, আইটি প্রশিক্ষণ এবং উদ্ভাবনী প্রকল্পে সরকারি সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।

এছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থাতেও বাস্তবমুখী পরিবর্তন আনা জরুরি। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা মানসিকতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা শিক্ষা চালু করা গেলে তরুণরা ছোটবেলা থেকেই উদ্যোগ গ্রহণে আগ্রহী হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আগামী অধ্যায় নির্ভর করবে উদ্যোক্তাদের ওপর। কারণ শুধু চাকরির ওপর নির্ভর করে একটি দেশের বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নতুন নতুন শিল্প, ব্যবসা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং উদ্ভাবনী চিন্তা। আর সেটি তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্র নীতিগতভাবে উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াবে এবং নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সহযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

সর্বোপরি বলা যায়, একটি সত্যিকারের উদ্যোক্তা বান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা এখন শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। উদ্যোক্তাদের হয়রানি নয়, তাদের জন্য নিরাপত্তা, সম্মান, ন্যায়সঙ্গত সহযোগিতা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। 

কারণ আজকের ক্ষুদ্র উদ্যোগই আগামী দিনের বড় শিল্প, আর আজকের তরুণ উদ্যোক্তারাই হতে পারেন আগামীর বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি।

এম এফ ইসলাম মিলন, ব্যবসায়ী ও কলামিস্ট