হু কিল্ড জিয়া-৪

Sanchoy Biswas
দেলোয়ার হাসান
প্রকাশিত: ১১:০৬ অপরাহ্ন, ১৬ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১২:০৪ পূর্বাহ্ন, ১৭ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আহত মেজর মোজাফফরের বাঁচার জন্য মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করা ব্যতীত কোনো শক্তি ছিল না দেহে। মেজর মান্নানের বাহিনীর বন্দুকের গুলিতে ক্ষত বিক্ষত মেজর মোজাফফরের পৃষ্ঠদেশ। পাহাড়ের গুহায় পড়ে চোখ তুলে তাকিয়ে আছে আকাশের পানে- খোদা সান্নিদ্ধ পাওয়ার জন্য। পাহাড়ের বুকে জন্মানো উঁচূ উঁচূ গাছের ডাল ও সবুজ পাতায় ঢেকে দিয়েছিল আকাশ। পিঠের অসহ্য ব্যথাটা মোজাফফরকে টেনে নিচ্ছিল মৃত্যুর খুব কাছে। ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রুজলের মতো রক্ত নালীর অনুভূতি অনুভব করতে ব্যর্থ হচ্ছিল তার ইন্দ্রিয়। হঠাৎ কানে আসলে কর্নেল মতির কন্ঠ-মাহবুব শুট মি!

মাটিতে পড়ে থাকা মোজাফফরের চোখ চলে গেল শব্দটির দিকে। তখনই দুটি পিস্তলের দুটি গুলি দুদিকে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল দুটি লাশ। বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল মাহাবুব ও কর্নেল মতি নিহত। হত্যাকারীরা তুলে নিল লাশ দুটি।

আরও পড়ুন: “দুই হাত প্রসারিত আবু সাঈদ: জুলাই আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট”

ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রতি মাসেই দেখা সাক্ষাৎ করতো জিয়াউর রহমানের হত্যার অন্যতম ঘাতক মেজর মুজাফফর। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে পাঁচ আগস্ট বাংলাদেশ থেকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে ভারতে পালায় শেখ হাসিনা এবং তার ফ্যাসিবাদীরা। সেই সময়ে তাদের সঙ্গেই ভারতে পালাতে বাধ্য হয় মেজর মোজাফফর। 

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর সবকিছুতেই প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের একজন মেজর মোজাফফর। বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের ছেলে মোজাফফর ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ’৭১এ মুজাফফর মুজিব বাহিনী হয়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। দেশ স্বাধীন হলে সে রক্ষীবাহিনীতে যোগদেয়। সবাই জানেন রক্ষীবাহিনীর সিংহভাগ পারচেজ হতো ভারত থেকে। এই কেনা কাটায় উর্ধতনদের সঙ্গে প্রায়শও অংশ নিতো মুজাফফর। কলকাতা তার পূর্ব থেকেই চেনা জানা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান রক্ষীবাহিনীকে সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণ করেন। মোজাফফর হয়ে যান বাংলাদেশ আর্মির। জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর এই মোজাফফরই প্রথম ল্যান্ডফোনে সংবাদটি জানায় মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে। ঞযব চৎবংরফবহঃ যধং নববহ শরষষবফ. মেজর জেনারেল পরিস্থিতি বুঝে মেজর জেনারেল মঞ্জুর কে নিয়ে পালাতে গিয়ে পিঠে গুলিবিদ্ধ মেজর মুজাফফর হাটহাজারীর জঙ্গলে পালিয়ে থেকে প্রথমে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ও পরে ঢাকায় আর্মির অফিসার, রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং রক্ষীবাহিনীর উপ-পরিচালক কর্নেল আবুল হোসেন সহ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পাহাড়ি যুবক কাঞ্চনের মাধ্যমে ঢাকায় আর্মি হেড কোয়াটারে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিটি মেজর জেনারেল নুরুদ্দিন, মেজর জেনারেল মঈন ইউ প্রমুখের হস্তগত হয়। এবং মোজাফফরকে জীবিত কিংবা মৃত ধরে আনার জন্য যে পুরস্কার ঘোষনার সরকারের যে নির্দেশ রেডিও টিভিতে প্রচারিত হচ্ছিল তা বন্ধ হয়। সেনাবাহিনীতে কর্মরত তার বন্ধুরা মেজর মুজাফফরের জন্য টাকা পাঠায়। ১৯ জুন গভীর রাতে মেজর মুজাফফর বাংলাদেশের রামগড় ও ভারতীয় সীমান্তের বৈষ্ণব ঘাটা দিয়ে সাব্রুমে প্রবেশ করে। এরপর সাব্রুম থেকে বাসে চড়ে আগরতলা পৌঁছায়। আগরতলা যুব কংগ্রেসের সেক্রেটারি জিতু বাবুর সেলটারে থেকেই মেজর মুজাফফর যোগাযোগ করে বাংলাদেশের। তার পরিচিতদের সঙ্গে। পরবর্তীতে মোজাফফরক আগরতলা থেকে কলকাতায় গিয়ে আশ্রয় নেয় রানাঘাটে গুপালচন্দ্র দেবনাথ নামের এক ঠিকাদারের বাসায়। দেবনাথ তার পূর্ব পরিচিত। দেবনাথ কে সবাই চিনে গোপাল দেবনাথ হিসেবে? বাংলাদেশের বরিশালের এই গোপাল চন্দ্র দেবনাথ ছিল চিত্তরঞ্জন সুতারের লোক।

আরও পড়ুন: চরিত্রহীন মধ্যবিত্ত সমাজের আন্দোলন

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যার বিচার প্রসঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বিবৃতি ও কার্যকলাপে হত্যার নায়কদের ষড়যন্ত্রের ঘ্রাণ সংবাদপত্রে স্পষ্ট রূপ ধারন করে। আওয়ামী লীগ সিপিবি বিএনপিসহ প্রায় সব দলের আচরণে পত্রিকাগুলোর পাতায় প্রকাশিত হতে থাকে জিয়াউর রহমান ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের গুপ্ত ঘাতকদের নেপথ্যের স্বপ্ন প্রসারণী কল্পনা। জিয়াউর রহমানসহ জীবন দিতে হয়েছে যাদের এবং এক তরফা বিচারে গলায় ফাঁসির দড়ি পরতে হয় যাঁদের তাঁরা প্রত্যেকেই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা অফিসার। জঘন্যতম এই হত্যাকান্ডের এবং বিচারের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হারায় স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানিদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয় দালাল পরাজিত শক্তি ও ষড়যন্দ্রকারীরা। স্বাধীনতার সূর্য আবার অস্মমিত হয়। যেন মুর্শিদাবাদের নব্য মীর্জাফররা জেগে উঠেছে চট্টগ্রামে। অপরদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রে পাকাপোক্ত হতে থাকে পাকিস্তান এবং ভারতের বাংলাদেশ নীতির পক্ষের শক্তির। বাংলাদেশে তাদের পদলেহনকারীরা। বৃদ্ধ অসতিপর মেরুদন্ডহীন প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাত্তারের অবস্থা হয় ইয়াহিয়া, ফখরুদ্দিনের মতই। ব্যারিস্টার মঈনুলের ভাষায় আর্মি ব্যাকট সরকার। অত্যন্ত কূটকৌশলে চতুর এরশাদ বিএনপিকে রাজপথের আন্দোলনে নামিয়ে দিতে সক্ষম হয় জিয়াউর রহমান হত্যার বিচারের নামে গঠিত কোর্ট মার্শালের পক্ষে। অপরদিকে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ও বাম দলগুলো রাস্তায় নামে কোর্ট মার্শালের বিপক্ষে। খেলা জমে উঠে খুনীদের ষড়যন্ত্রকারীদের ডিজাইন করা ছকে। মজার ব্যাপার হলো সরকার, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ কিন্তু সেক্টর কমান্ডার জেনারেল মঞ্জুর হত্যার বিচারের দাবি করলো না। জেনে হোক আর না জেনে হোক আওয়ামী লীগ তাহের হত্যার বিচার চাইলেও মঞ্জুর হত্যার বিচার চায়নি। চায়নি জিয়াউর রহমান হত্যারও। এর কারণ কি? তা খুবই পরিস্কার। 

জুলাই ৮১’র পাঁচ তারিখ সংবাদ, ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত খবরে বলা হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চট্টগ্রামে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের প্রকাশ্য আদালতে বিচারের দাবি জানিয়েছে। খবরে উল্লেখ চার জুলাই অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলী ও সম্পাদক মন্ডলীর যৌথ সভায় প্রস্তাবে বলা হয় রাষ্ট্রপতি হত্যার বিচার গোপনে হলে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ দেখা দেবে। এটা জাতির জন্য কল্যাণ কর হবে না। সভায় অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়ারও দাবি জানান হয়। দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ। 

আওয়ামী লীগ এখানে মঞ্জুর হত্যা নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। কারণ জেনারেল মঞ্জু হত্যার সঙ্গেও এরশাদ জড়িত থাকার অধিক স্বাক্ষী প্রমান ছিল। শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ ছিল এরশাদের পক্ষে। আর এরশাদ আগাগোড়াই জড়িত জিয়াউর রহমান ও মঞ্জুর হত্যা এবং মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ফাঁসির পক্ষে। 

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (হারুন) এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয় রাষ্ট্রপতি হত্যার নায়ক বলে কথিত জেনারেল মঞ্জুরকে গ্রেফতারের পর উদ্দেশ্যমূলক ভাবে হত্যা করা হয়েছে। পার্টির সভাপতি হারুন অর রশীদ বলেন, ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর থেকে শুধু ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য দেশে হত্যা রাজনীতি শুরু হয়েছে। পাক-চীন ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ঠ হয়ে স্বাধীনতার পরাজিত শত্রু ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি হত্যার রাজনীতির ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত। জুলাই ’৮১র ১৬ তারিখ জাসদের সভাপতি মেজর (অবঃ) এম এ জলিল ও সাধারণ সম্পাদক আ স ম রব যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শালে না করে এর বিচার প্রকাশ্য আদালতে ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী করা হোক। এখানে জাসদও কিন্তু মঞ্জুর হত্যার বিষয়ে কোন কথা বলেনি।

যে শেখ হাসিনা জিয়াউর রহমানের আন্তরিকতায় দিল্লির নির্বাসন থেকে দেশে ফিরার সুযোগ পান এবং ফিরে পান ৩২ নম্বর। সেই শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী দলগুলো জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের কোর্ট মার্শালের বৈধতা নিয়ে সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা কোর্ট মার্শালের বিরোধীতায় মাঠে নামে। বিক্ষোভ করে অনশন করে হরতালের ডাক দেয়। কিন্তু জেনারেল মঞ্জুর হত্যার বিচারের কথাটি একবারও বলেনি। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যক্ষ দর্শীয় প্রমান ছিল মঞ্জুর হত্যার। কিন্তু আওয়ামী লীগ কখনই মঞ্জুর হত্যার বিচারের কথা বলেনি। কারণ মঞ্জুর হত্যাও ছিল জিয়াউর রহমান হত্যার ন্যায় পূর্ব পরিকল্পিত। এর সঙ্গেও জড়িত দেশি বিদেশি শক্তি এবং স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ও পরাজিত শত্রুরা।  

যদি জামায়াতের রাজনীতির কথা বলা হয় এবং গোলাম আযমের নাগরিকত্বের। তাও সম্ভব করে দিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান। এই দুজনের হত্যাকান্ডের পর জামাত অখূশি হয়েছে বলে প্রমান মিলেনি। বরং আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলেছে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ে। সভা সমিতিতে বিবৃতিতেও তার প্রমান রয়েছে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি অধ্যাদেশ জারি করে দালাল আইন তুলে নেয়া সরকার। ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল অপর অধ্যাদেশের মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার কারণেই জামায়াত রাজনীতি করার সুযোগ পায়। লন্ডন থেকে ঢাকায় আসে গোলাম আযম। তার আগে ’৭২সালে রাষ্ট্রপতির এক আদেশে ১৯৭২ এর ৮নং আদেশে অধ্যাপক গোলাম আযমসহ ১৫ জনের সম্পত্তি আটক করা হয়। গোলাম আযমসহ ৩৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। কারণ এরা ছিল তাদের বন্ধু। বাঙালীর শত্রু। এদের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের (রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান) নীতি নির্ধারকদের সম্পর্ক ছিল। এখানে আরও উল্লেখ, ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও পাকিস্তান এবং (জামায়াতের বিরোধিতার কারণে) সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি সংবিধান থেকে রহিত করার পর। ক্ষমতায় তখন খন্দকার মোস্তাক সরকার। 

৩০ নভেম্বর ১৯৭৩ বঙ্গবন্ধুর সরকার দালাল আইনে অভিযুক্ত ও আটকদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করে। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বিশেষ ট্রাইবুনাল আদেশে দালালদের বিচারের পদক্ষেপ নেয় সরকার। ১৯ মে ’৭২ তাদের বিচার শুরু হয়। ১৭ এপ্রিল ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ৩৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করে। ৩০ নভেম্বর ১৯৭৩ কিছু সংখ্যক দালালের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুর সরকার। 

এ এল খতিবের বন্ধু দক্ষ কূটনৈতিক গডো বলেছিলেন মুবিজ ভাই ও জিয়াউর রহমান মনে প্রানে খাটি মুসলমান। এদেশের মানুষের প্রতি তাদের ভালোবাসাই তাদেরকে মৃত্যুর কোলে টেনে নেয়। 

মঙ্গলবার, চলবে-