রাজনৈতিক চরিত্রে মৌলিক আচরণ মরীচিকা

Sanchoy Biswas
মো. ওবায়দুল ইসলাম (রবি)
প্রকাশিত: ৭:৪০ অপরাহ্ন, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৪:০৮ পূর্বাহ্ন, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

পৃথিবীর বিশাল ভূখণ্ডে মানুষসহ অসংখ্য প্রাণীর বসবাস। প্রত্যেক প্রাণীরই রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, আচরণ, জীবনধারা এবং টিকে থাকার কৌশল। প্রকৃতি তাদের প্রত্যেককে দিয়েছে আলাদা আলাদা ভূমিকা। কেউ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, কেউ আবর্জনা পরিষ্কার করে, কেউ মৃত প্রাণীর দেহ অপসারণ করে, আবার কেউ খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর হিসেবে কাজ করে। প্রাণিজগতের এই স্বাভাবিক আচরণগুলো কখনো কখনো মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক আচরণের সঙ্গে তুলনা করার মতো উপাদানও তৈরি করে।

মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয়। মানুষের রয়েছে বিবেক, বুদ্ধি, নৈতিকতা, বিচারবোধ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার ক্ষমতা। নীতি, চরিত্র, মানবিকতা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, পৃষ্ঠপোষকতা, পরাধীনতা কিংবা আত্মত্যাগের মতো অসংখ্য শব্দ মানুষের আচরণ ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, মানুষের আচরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেক সময় প্রাণিজগতের উপমাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। কারণ মানুষ তার জ্ঞান-বুদ্ধির সর্বোচ্চ ব্যবহার করেও কখনো কখনো এমন আচরণ করে, যা কোনো কোনো প্রাণীর স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকেও ছাড়িয়ে যায়।

আরও পড়ুন: টাঙ্গুয়ার হাওরে আইনি বিধিনিষেধ ও পরিবেশের কাঠগড়ায় ভাসমান থিয়েটার

একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সভ্যতা শুধু তার সংবিধান, আইন, প্রতিষ্ঠান কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না। রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আচরণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মতের ভিন্নতাকে গ্রহণ করার মানসিকতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাও রাষ্ট্রের সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক। একই ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক আচরণে যে পার্থক্য দেখা যায়, তার পেছনে রয়েছে নেতৃত্বের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা।

একটি দেশের আয়-ব্যয়, অর্থনীতি, উন্নয়ন পরিকল্পনা, বৈদেশিক সম্পর্ক কিংবা সামাজিক স্থিতিশীলতার সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আচরণ ও সিদ্ধান্তের ওপর। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশই পুরোপুরি বিচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে না। রাষ্ট্রগুলো অর্থনীতি, বাণিজ্য, কূটনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও নানা ক্ষেত্রে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু শক্তি বা সম্পদ নয়, আচরণ, ভাষা, কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং অন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন: বিরল মৃত্তিকার ধাতু: একবিংশ শতাব্দীর নতুন তেল, প্রযুক্তির শক্তি ও ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎ

দেশের উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। সেই যোগাযোগের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পেশাদারিত্ব, দূরদর্শিতা ও আচরণের ওপর। রাষ্ট্রীয় অতিথি বা বিদেশি প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাতে পোশাক-পরিচ্ছদ, আনুষ্ঠানিকতা কিংবা পারিবারিক মর্যাদা হয়তো সাময়িকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের প্রকৃত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চরিত্র প্রকাশ পায় তার আচরণ, ভাষা, সিদ্ধান্ত এবং পরিস্থিতি সামলানোর সক্ষমতায়।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, উন্নয়নের শীর্ষে অবস্থান, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা রেমিট্যান্স প্রবাহ কোনো দেশের একমাত্র সাফল্যের মানদণ্ড নয়। একটি রাষ্ট্র কতটা মানবিক, কতটা ন্যায়ভিত্তিক এবং তার নাগরিকদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, সেটিও রাষ্ট্রের চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। অথচ ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতিযোগিতায় অনেক সময় রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির কাছে জনগণের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা নৈতিকতার প্রশ্নগুলো গৌণ হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক ক্ষমতার এই প্রতিযোগিতা শুধু জাতীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়। পৌর কাউন্সিলর, ইউপি সদস্য, ইউপি চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, সিটি মেয়র থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যন্ত জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যেকের দায়িত্বের সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা জড়িয়ে থাকে। তাদের বলা হয় দেশ ও সমাজ গড়ার কারিগর। তারা আইন প্রণয়ন করেন, নীতি নির্ধারণ করেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু আইন প্রণয়ন ও আইন বাস্তবায়নের মধ্যে যখন বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়, তখন রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয় প্রভাব বিস্তার, স্বজনপ্রীতি, পৃষ্ঠপোষকতা এবং ব্যক্তিস্বার্থকে রাষ্ট্রীয় বা জনস্বার্থের ওপর স্থান দেওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে। তখন রাজনীতি হয়ে ওঠে জনসেবার পরিবর্তে ক্ষমতা ধরে রাখার একটি কৌশল। যে রাজনীতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে, সেই রাজনীতিই যখন মানুষের কণ্ঠ রোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন জাগে, রাজনীতির মূল চরিত্র কোথায় হারিয়ে গেল?

বহুদলীয় রাষ্ট্রে নৈতিকতা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কথা পাঠ্যপুস্তকে যতটা সুন্দরভাবে লেখা যায়, বাস্তব রাজনৈতিক আচরণে তার প্রতিফলন সবসময় ততটা দেখা যায় না। অথচ প্রকৃতির দিকে তাকালে আমরা অন্যরকম একটি শিক্ষা পাই।

কাককে আমরা সাধারণত নোংরা ও বিরক্তিকর পাখি হিসেবে দেখি। কিন্তু শহর ও জনবসতির পরিবেশে কাক নানা ধরনের উচ্ছিষ্ট ও আবর্জনা খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কারে ভূমিকা রাখে। শকুনকে ঘিরেও মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। কিন্তু মৃত প্রাণীর দেহ খেয়ে শকুন প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতা ও রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ যেসব প্রাণীকে মানুষ অবজ্ঞার চোখে দেখে, তাদেরও প্রকৃতিতে নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে।

প্রশ্ন হলো, মানুষের তৈরি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেই দায়িত্ববোধ কোথায়?

মানুষের রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নিজেদের জনগণের প্রতিনিধি বলে দাবি করে। নির্বাচনের সময় জনগণের কাছে গিয়ে উন্নয়ন, অধিকার, নিরাপত্তা ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে অনেক ক্ষেত্রেই সেই জনগণই রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যায়। ভোটারের অধিকার যেন শুধু ভোট দেওয়ার দিনটিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপর তাদের মতামত, অভিযোগ কিংবা প্রত্যাশা কতটা গুরুত্ব পায়, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

এই বাস্তবতার মধ্যেই হয়তো জন্ম নেয় সেই তীব্র আত্মস্বীকারোক্তি- “কুকুর হয়ে বসে ছিলাম কুকুরের বাড়িতে।”

কুকুর তার মালিকের বাড়িতে প্রভুর আনুগত্য করে। কিন্তু প্রাণিজগতের এই আচরণ তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তির অংশ। সেখানে কোনো সংবিধান নেই, নির্বাচন নেই, জনগণের ম্যান্ডেট নেই, ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু মানুষের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যখন আনুগত্য যুক্তির জায়গা দখল করে নেয়, তখন বিষয়টি আর স্বাভাবিক প্রাণীপ্রবৃত্তির পর্যায়ে থাকে না। সেখানে প্রশ্ন আসে নৈতিকতা, বিবেক ও দায়িত্ববোধের।

রাজনৈতিক চরিত্রের সবচেয়ে বড় সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন ব্যক্তি বা দল নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী নীতি পরিবর্তন করতে থাকে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যে নীতিকে সঠিক বলা হয়, বিরোধী অবস্থানে গিয়ে সেই নীতিকেই অন্যায় বলা হয়। ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে বক্তব্য বদলায়, অবস্থান বদলায়, সম্পর্ক বদলায়, এমনকি কখনো কখনো রাজনৈতিক দর্শনের ভাষাও বদলে যায়। যেন গিরগিটির মতো রাজনৈতিক চরিত্রও পরিস্থিতির সঙ্গে রং বদলায়।

প্রাণিজগতের হায়নাকে সাধারণত হিংস্র ও সুযোগসন্ধানী প্রাণী হিসেবে দেখা হয়। তারা দলবদ্ধভাবে শিকার করে এবং কখনো অন্য প্রাণীর শিকার থেকেও খাদ্য সংগ্রহ করে। কিন্তু হায়নারও নিজস্ব সামাজিক কাঠামো আছে। তারা নিজেদের দলের মধ্যে নির্দিষ্ট আচরণবিধি মেনে চলে। অথচ মানুষের রাজনৈতিক সমাজে কখনো কখনো এমন প্রতিযোগিতা দেখা যায়, যেখানে ক্ষমতা, পদ ও সম্পদের জন্য রাজনৈতিক সহযোদ্ধারাও পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। ফলে প্রাণীর আচরণের সঙ্গে মানুষের রাজনৈতিক আচরণের তুলনা করতে গেলেও শেষ পর্যন্ত মানুষই অনেক বেশি জটিল ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন গবেষণা, রাজনৈতিক পরিকল্পনা কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতির সব আলোচনা তখনই অর্থবহ, যখন তার কেন্দ্রে থাকে মানুষ। নাগরিকের কণ্ঠ যদি দুর্বল হয়ে যায়, প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নত হয়, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ যদি ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার চাপে পড়ে, আর ভোটারের অংশগ্রহণ যদি কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে উন্নয়নের দৃশ্যমান অবকাঠামো থাকলেও রাজনৈতিক সভ্যতার প্রশ্ন থেকেই যায়।

রাজনীতি মূলত মানুষের জন্য। ক্ষমতা মানুষের ওপর প্রয়োগ করার জন্য নয়, মানুষের সেবা করার জন্য। জনপ্রতিনিধিত্ব কোনো ব্যক্তিগত মর্যাদার সনদ নয়, এটি জনগণের দেওয়া একটি দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে আচরণ, নৈতিকতা, সহনশীলতা ও জবাবদিহি না থাকলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক কাঠামো যতই শক্তিশালী হোক, তার ভেতরের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রাণীরা প্রকৃতির নিয়মে চলে। মানুষ চলে বিবেক, আইন ও নৈতিকতার ভিত্তিতে চলার কথা। তাই কোনো প্রাণীর আচরণ যদি তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তির মধ্যেও দায়িত্বের পরিচয় বহন করে, অথচ মানুষের রাজনৈতিক আচরণে সেই ন্যূনতম দায়িত্ববোধটুকুও খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে প্রশ্নটি আসলে প্রাণীদের নিয়ে নয়, প্রশ্নটি মানুষকে নিয়েই।

আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারব, যেখানে ক্ষমতার আগে থাকবে দায়িত্ব, দলের আগে থাকবে রাষ্ট্র, ব্যক্তির আগে থাকবে জনগণ এবং আনুগত্যের আগে থাকবে বিবেক?

নাকি শেষ পর্যন্ত ইতিহাস আমাদের নিয়েই সেই কথাটিই বলবে- “কুকুর হয়ে বসে ছিলাম কুকুরের বাড়িতে; শুধু কুকুর বদলায়নি, বদলে গেছে মানুষের রাজনৈতিক চরিত্র।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও লেখক