অবক্ষয়ের ছায়ায় প্রবৃদ্ধির আলো: দ্বিমুখী বাস্তবতা

Any Akter
এম. এ. মতিন
প্রকাশিত: ১২:৫৮ অপরাহ্ন, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১:৫৮ অপরাহ্ন, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যে পথ অতিক্রম করেছে, তা নিঃসন্দেহে অসাধারণ। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য ও ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান থেকে উঠে এসে বাংলাদেশ আজ একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ, কৃষকের স্থিতিস্থাপকতা এবং সাধারণ মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম দেশের অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। রপ্তানি, অবকাঠামো, শিক্ষা, নারীর কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার মান এবং দারিদ্র্য হ্রাস—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবেও উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে:

আরও পড়ুন: বয়স্ক ভাতা: প্রবীণদের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনছে?

অর্থনীতি যদি এত দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থা কেন একই গতিতে শক্তিশালী হতে পারল না?

এটি কোনো একক সরকারের ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়। কোনো একজন নেতাকে দোষারোপ করেও এর পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের সমস্যাটি আরও গভীরে প্রোথিত।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ: মরীচিকার পেছনে এক লক্ষ্যহীন যাত্রা

সমস্যাটি মূলত কাঠামোগত।

বাংলাদেশে মেধাবী মানুষের অভাব নেই। অভাব নেই দক্ষ প্রশাসক, উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ কিংবা দেশপ্রেমিক নাগরিকের। ঘাটতি হলো এমন একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার, যেখানে যোগ্যতা ধারাবাহিকভাবে নেতৃত্বে উঠে আসবে, সততা সুরক্ষিত থাকবে এবং রাষ্ট্রক্ষমতা কার্যকর জবাবদিহির মধ্যে থাকবে।

এই ব্যবধানই বাংলাদেশের নেতৃত্বের সংকটের প্রকৃত রূপ।

নেতৃত্ব মানে শুধু একজন নেতা নয়ঃ-

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেতৃত্বকে প্রায়ই ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে দেখা হয়। একজন শক্তিশালী নেতা, একজন জনপ্রিয় নেতা কিংবা একজন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম নেতা—এই ধারণাই যেন নেতৃত্বের প্রধান মানদণ্ড।

কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ব্যক্তিত্বের চেয়ে প্রতিষ্ঠান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো রাষ্ট্র যদি একজন ব্যক্তির প্রজ্ঞা, সদিচ্ছা বা রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে সেই রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব অনিশ্চিত হয়ে যায়। কারণ ব্যক্তি পরিবর্তিত হন, সরকার পরিবর্তিত হয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে।

একজন নেতার প্রকৃত সাফল্য তিনি কতটা ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে পেরেছেন, তা নয়। বরং তিনি এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পেরেছেন কি না, যা তাঁর অনুপস্থিতিতেও সঠিকভাবে কাজ করবে—সেটিই নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা।

একটি কার্যকর রাষ্ট্রের ভিত্তি তিনটি বিষয়ে দাঁড়িয়ে থাকে: আইন ও নিয়মভিত্তিক প্রশাসন, স্বচ্ছতার সঙ্গে কার্যকর জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা।

এই ভিত্তিগুলো দুর্বল হলে প্রশাসন ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেন্দ্রীভূত হয় এবং কর্মকর্তারা পেশাগত বিচারের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রত্যাশার দিকে বেশি তাকাতে শুরু করেন।

ফলে নেতৃত্ব হয়ে ওঠে অনেক সময় দৃশ্যমানতা ও রাজনৈতিক টিকে থাকার প্রতিযোগিতা—দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র নির্মাণের প্রকল্প নয়।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সুশাসনের বিকল্প নয়ঃ-

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য বাস্তব। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিজে থেকেই শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরি করে না। অর্থনীতি যত বড় হয়, রাষ্ট্রের দায়িত্বও তত জটিল হয়। শক্তিশালী আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ করব্যবস্থা, স্বচ্ছ সরকারি ক্রয়, নির্ভরযোগ্য বিচারব্যবস্থা, কার্যকর স্থানীয় সরকার এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন তখন অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ এখন আর সেই দেশ নয়, যার রাষ্ট্রব্যবস্থা শুধু দরিদ্র ও প্রধানত গ্রামীণ অর্থনীতি পরিচালনার জন্য তৈরি হয়েছিল। এটি দ্রুত নগরায়িত, শিল্পায়িত, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা একটি রাষ্ট্র। সুতরাং উন্নয়নের ধারণাকেও বদলাতে হবে।

শুধু নতুন সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণই উন্নয়ন নয়। এসব সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ, অর্থায়ন এবং জবাবদিহিও উন্নয়নের অংশ।

আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক পরিচালনা, প্রশাসনিক বিলম্ব, সরকারি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব—এসব সমস্যা অর্থনৈতিক সক্ষমতার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকেই বেশি প্রকাশ করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যায়, তাহলে একসময় সেই ব্যবধানই প্রবৃদ্ধির জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।

ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণঃ-

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন।

কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ কখনো কখনো দ্রুত ফল দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ স্বাধীন মতামত, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এবং জবাবদিহিকে দুর্বল করে।

যখন সরকারি প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন প্রতিষ্ঠানটির পেশাগত সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্মকর্তারা তখন অনেক সময় আইন ও বিধির চেয়ে রাজনৈতিক নির্দেশনাকে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য হন।

এখানেই রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার পরিবর্তিত হবে; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়।

বিচার বিভাগ, নির্বাচন প্রতিষ্ঠান, সিভিল সার্ভিস, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ, দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকারকে এমন সক্ষমতা দিতে হবে, যাতে তারা আইন অনুযায়ী স্বাধীন ও পেশাদারভাবে কাজ করতে পারে।

শক্তিশালী নেতৃত্বের অর্থ দুর্বল প্রতিষ্ঠান নয়। বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই শক্তিশালী নেতৃত্বের ভিত্তি।

প্রণোদনার সংকটঃ-

শাসনব্যবস্থার মান নির্ভর করে রাষ্ট্র কোন আচরণকে পুরস্কৃত করে তার ওপর। যদি যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্যবান হয়, তাহলে মেধা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে। যদি কর্মদক্ষতার সঙ্গে পদোন্নতির সম্পর্ক না থাকে, তাহলে দক্ষতা কমে যায়। যদি ব্যর্থতার কোনো পরিণতি না থাকে, তাহলে দায়িত্ববোধও দুর্বল হয়।

এখানে দুর্নীতি শুধু অর্থের লেনদেন নয়। আরও গভীর একটি সমস্যা হলো প্রণোদনার দুর্নীতি—যেখানে জনস্বার্থ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়। বাংলাদেশের প্রশাসনে এমন একটি সংস্কৃতি দরকার যেখানে দক্ষতা পুরস্কৃত হবে, সৎ কর্মকর্তারা সুরক্ষা পাবেন, নতুন ধারণা উৎসাহিত হবে এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতার জবাবদিহি থাকবে।

সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা পরিমাপযোগ্য সূচকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত। একই সঙ্গে তাদের আধুনিক জননীতি, ডিজিটাল শাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নৈতিকতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রশিক্ষিত করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও দ্রুত নগরায়ণের যুগে পুরনো প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে নতুন বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দল সংস্কার ছাড়া জাতীয় নেতৃত্বের সংস্কার অসম্ভবঃ-

রাজনৈতিক দলগুলোই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রধান প্রতিষ্ঠান। কিন্তু রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে অসভ্য, অযোগ্য, নীতিহীন, মিথ্যাবাদী প্রতারক   অসৎ, অদক্ষ,রাজনৈতিক ব্যাবসায়ী,রাজনৈতিক দস্যু, দুর্নীতি, অপরাধী,চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী,দখলবাজ, তেলবাজ, প্রকৃত দেশ পরিচালনার অযোগ্য লোকদের জয়জয়াকার ! যাদের অভিধানে আদর্শ,রাজনৈতিক জ্ঞান,নীতি নৈতিকতার বালাই নাই বাংলাদেশে তারাই অধিকাংশ দলের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে! গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতা দুর্বল হলে জাতীয় নেতৃত্বও দুর্বল হয়ে পড়ে।

যোগ্য মেধাবী মানুষজনদের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ, স্বচ্ছ প্রার্থী নির্বাচন, নেতৃত্ব নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং দলের আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যদি স্থায়ী শত্রুতায় পরিণত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু, আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিচার সংস্কার, প্রশাসনিক দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মতো বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য থাকা দরকার।

প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি রাষ্ট্রের নীতি ও প্রতিষ্ঠান নতুন করে রাজনৈতিকীকরণের শিকার হয়, তাহলে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

রাষ্ট্র সংস্কারের এখনই সময়ঃ-

সংস্কারের প্রথম ধাপ হওয়া উচিত দৃশ্যমান ও বাস্তব।

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। দরপত্র, চুক্তি, প্রকল্প ব্যয়, ঠিকাদার এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা যেতে পারে। ভূমি, কর, লাইসেন্স, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সরকারি অভিযোগ ব্যবস্থাকে সহজ ও সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে।

তবে প্রযুক্তিকে জাদুর সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে জবাবদিহি, তথ্য সুরক্ষা এবং স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

বিচারব্যবস্থায় মামলা ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে হবে। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা শুধু বিচারপ্রার্থীর অধিকার ক্ষুণ্ন করে না; এটি ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ব্যাংকিং খাতে পেশাদার পরিচালনা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ এবং খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি।

একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত ক্ষমতা দিতে হবে। ঢাকা কিংবা অন্যান্য বড় শহরকে কেন্দ্র থেকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

নাগরিকদেরও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার হতে হবে সুশাসন শুধু সরকারের কাজ নয়। নাগরিকদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ দরকার।

স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নাগরিক অধিকার, সংবিধান, বাজেট, স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক নাগরিক শিক্ষা চালু করা উচিত। সরকারি প্রকল্পের ব্যয়, সময়সীমা, ঠিকাদার এবং অগ্রগতি জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত। জনশুনানি, নাগরিক মূল্যায়ন এবং কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা প্রশাসনের ওপর জননজরদারি বাড়াতে পারে।

সচেতন নাগরিক রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়; বরং সচেতন নাগরিকই রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী সুরক্ষা। জনগণের আস্থা চাওয়া যায়, কিন্তু আদায় করা যায় না। তা অর্জন করতে হয় স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার, দক্ষতা এবং ধারাবাহিক সেবার মাধ্যমে।

সংস্কারের একটি বাস্তব রূপরেখাঃ-

বাংলাদেশের সংস্কারকে তিনটি পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। প্রথম দুই বছরে ডিজিটাল সরকারি সেবা, স্বচ্ছ সরকারি ক্রয়, প্রকল্প পর্যবেক্ষণ, দ্রুত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সিভিল সার্ভিসের কর্মদক্ষতা, আর্থিক খাতের শাসন, বিচারব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গভীর সংস্কার করতে হবে।

ছয় থেকে দশ বছরের মধ্যে মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব উন্নয়ন, রাজনৈতিক সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উন্নত ডিজিটাল শাসন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনাকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিতে হবে।

সংস্কারের অগ্রগতি নিয়মিত পরিমাপ করতে হবে।

পরিমাপ ছাড়া সংস্কার বক্তৃতায় পরিণত হয়; জবাবদিহি ছাড়া নীতি কেবল আকাঙ্ক্ষা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের সামনে এখন যে সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, দুর্যোগ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা দেশকে এগিয়ে নিয়েছে। সুতরাং প্রশ্নটি বাংলাদেশ এগোতে পারবে কি না—তা নয়।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ তার অর্জিত অগ্রগতিকে টেকসই করার মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারবে কি না।

আমাদের এমন নেতা দরকার, যারা ব্যক্তিগত ক্ষমতার উত্তরাধিকার নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান রেখে যেতে চান। এমন প্রশাসন দরকার, যেখানে আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা মূল্যায়িত হবে। এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি দরকার, যেখানে ক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি ক্ষমতার জবাবদিহিও স্বীকৃত হবে। বাংলাদেশকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রচিন্তার দিকে অগ্রসর হতে হবে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সুশাসন ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। অবকাঠামো জবাবদিহি ছাড়া জনআস্থা তৈরি করতে পারে না। রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া স্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু কে দেশ পরিচালনা করবে, তার ওপর নির্ভর করবে না। ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি দিয়ে, যার কাঠামোর মধ্যে নেতৃত্ব পরিচালিত হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ—প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ধারাকে অব্যাহত রাখা, অথবা সাহসী ও পরিকল্পিত সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়ে তোলা।

দ্বিতীয় পথটি কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহস, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, জাতীয় ঐকমত্য এবং সরকার পরিবর্তনের পরও সংস্কারের ধারাবাহিকতা। কিন্তু একটি সক্ষম, জবাবদিহিমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি অর্থনৈতিক রূপান্তর সম্পন্ন করেছে। এই রূপান্তরই অর্থনৈতিক সাফল্যকে দীর্ঘস্থায়ী সমৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতে পরিণত করতে পারে—যে ভবিষ্যতের জন্য ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছিল।